Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ২৪, ২০২৫

মার্কিন শুল্কের চাপে দিশেহারা কাশ্মীরের কার্পেট শিল্প। খানদানি কাজ ছেড়ে অনেকেই এখন ডাল লেকের চাওয়ালা

মার্কিন শুল্কের চাপে দিশেহারা কাশ্মীরের কার্পেট শিল্প। খানদানি কাজ ছেড়ে অনেকেই এখন ডাল লেকের চাওয়ালা

কাশ্মীরের পাহাড়ি হাওয়ায় আজও ভেসে থাকে গালিচার সূক্ষ্ম নকশার কথা। একটা সময় ছিল, শ্রীনগরের প্রতিটি গলিতে গুনগুন করত তাঁতের সুর। আজ সেই সুর ক্রমেই নিঃশব্দ হয়ে যাচ্ছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কে নাজেহাল কাশ্মীরের ঐতিহ্যবাহী কার্পেট শিল্প দমবন্ধ অবস্থায় টিকে আছে মৃত্যুর অপেক্ষায়।

ডাল লেকের পাড়ে আজ চা বিক্রি করেন ৪৯ বছরের গুলজার আহমদ ভাট। তিনি ছিলেন নামকরা কার্পেট বুননশিল্পী। ৩৫ বছর কাটিয়েছেন তাঁতের পাশে। কিন্তু এখন হাতে আর সুতো ওঠে না, চায়ের কেটলি হাতেই দিন কাটে তাঁর। পৌঢ়ের চোখে ক্লান্তি আর গলায় ক্ষোভ। দ্বিধা জড়ানো গলায় বলেন, ‘আমেরিকার শুল্ক বাড়ার পর থেকে সংসার চালানো অসম্ভব হয়ে গেছে। ছেলেমেয়ের স্কুল ফি দিতে পারিনি, ওষুধও কেনাও দুষ্কর।’ গত আগস্টে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্ক দ্বিগুণ করে ৫০ শতাংশ করে দেন। তার জেরেই দিশেহারা হয়ে পড়েছে ভারতের হস্তশিল্প রপ্তানিকারকরা। শিল্পমহলের হিসেব বলছে, ভারতের হস্তনির্মিত কার্পেটের প্রায় ৬০ শতাংশই রপ্তানি হয় যুক্তরাষ্ট্রে। ফলে এক ধাক্কায় বড়ো বাজারটাই যেন মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

কাশ্মীরের হস্তশিল্প শিল্পের সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৪ লক্ষ মানুষ। তাদের অধিকাংশই এখন অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখোমুখি। পারস্য ঘরানার টাফটেড ও নটেড কার্পেটের জন্য সারা দুনিয়ায় খ্যাত এই শিল্প এখন রাজ্যের মতোই ক্ষয়িষ্ণু। বাণিজ্য মন্ত্রকের পরিসংখ্যান জানাচ্ছে, গত সেপ্টেম্বরে ভারতের কার্পেট ও হস্তশিল্প রপ্তানি আগের বছরের তুলনায় ১৬ শতাংশ কমেছে। বহু ছোটো শিল্পপতি বাধ্য হয়েছেন কর্মী ছাঁটাই করতে, কেউ কেউ স্থগিত রেখেছেন সম্প্রসারণের পরিকল্পনাও। এম অ্যান্ড কে এক্সপোর্টসের কর্ণধার মুজতবা কাদরি যিনি মূলত আমেরিকাতেই শাল ও গালিচা রপ্তানি করেন বলছেন, ‘ব্যবসা থমকে গেছে,” জানাচ্ছেন এম অ্যান্ড কে এক্সপোর্টসের কর্ণধার মুজতবা কাদরি, যিনি মূলত আমেরিকাতেই শাল ও গালিচা রপ্তানি করেন। শুল্ক এত বেড়েছে যে অর্ডার ধরা যাচ্ছে না। অনেক কারিগর পেশা বদলে ফেলছেন। এতে শুধু রোজগার নয়, হারিয়ে যাচ্ছে প্রজন্মের পর প্রজন্মের বহমান ঐহিত্য, কারিগরি দক্ষতা।’

কেন্দ্রীয় বাণিজ্য মন্ত্রকের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, কেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত রপ্তানিকারকদের আর্থিক প্রণোদনা দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে এবং নতুন বাজার খুঁজে বের করার চেষ্টাও চলছে। তবে স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘এ প্রক্রিয়ায় যা সময় লাগবে, ততদিনে অনেকেই শেষ হয়ে যাবেন।’ অক্টোবর থেকে ডিসেম্বর, এই সময়টাই কাশ্মীরি কার্পেট রপ্তানির পিক সিজন। সেই মৌসুমেই এখন অর্ডার আটকে আছে, পণ্য রপ্তানি করতে না পাড়ায় পড়ে আছে গুদামে। ফলে পুরো বছরের ব্যবসা যেন থমকে গেছে। শ্রীনগরের হাব্বা কাদল এলাকার তৃতীয় প্রজন্মের কার্পেট প্রস্তুতকারক মোহাম্মদ ইয়াকুব বাফান্দা হতাশ কণ্ঠে বলেন, ‘আমার বাবার সময় ১০০টা তাঁত ছিল, এখন ২০টাও নেই। আগে ৩০০ জন কারিগর কাজ করত, আজ হাতে গোনা ৪-৫ জন।’ নির্লিপ্ত গলায় তিনি জানান, ‘বাফান্দার গুদামে এখন ৪০ থেকে ৫০টি প্রস্তুত গালিচা জমে আছে—কিন্তু কোনো ক্রেতা নেই। যদি ৫০ শতাংশ কর চালু থাকে, এই শিল্প অচিরেই শেষ হয়ে যাবে।’


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!