- এই মুহূর্তে বৈষয়িক
- ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫
ব্যবসার ময়দানে ‘হিউম্যান টাচ’, নেতাজি ইন্ডোরে রুটি-রুজি রক্ষার বার্তা মুখ্যমন্ত্রীর
নেতাজি ইন্ডোর স্টেডিয়ামের সভাঘর বুধবার সকাল থেকেই ছিল জমজমাট। ছোটো দোকানদার থেকে বড়ো শিল্পগোষ্ঠীর প্রতিনিধি— রাজ্যের নানা প্রান্ত থেকে আসা ব্যবসায়ীদের ভিড়ে যেন স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল বাংলার বাণিজ্য মানচিত্র। সে মঞ্চ থেকেই রাজ্যের শিল্প ও অর্থনীতির ভবিষ্যৎ দিশা নিয়ে একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা করলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বারবারই তাঁর বক্তব্যে উঠে এল একটাই কথা— ব্যবসায়ীরাই বাংলার অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তাঁদের সমস্যার সমাধান করাই সরকারের অগ্রাধিকার।
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের কেন্দ্রে ছিল ব্যবসায়ীদের দীর্ঘদিনের অভিযোগ— সরকারি কাজ শেষ করেও সময়মতো টাকা না পাওয়া। সেই সমস্যার অবসানে চালু হল ‘ওয়েস্ট বেঙ্গল ট্রেডস পোর্টাল’। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানান, কাজ শেষের তথ্য পোর্টালে আপলোড করা মাত্রই তার সঙ্গে যুক্ত ৭২টি ব্যাঙ্ক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীকে অর্থ মিটিয়ে দেবে। পরে সরকার ওই অর্থের দায় নেবে। এর ফলে ছোটো ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের উপর যে আর্থিক চাপ তৈরি হয়, তা অনেকটাই কমবে বলেই আশা রাজ্য সরকারের। পাশাপাশি, ওই পোর্টালের মাধ্যমেই অভিযোগ জানানো যাবে এবং দ্রুত পদক্ষেপ করা হবে বলেও আশ্বাস দেন মুখ্যমন্ত্রী।
শুধু পেমেন্ট সমস্যা নয়, রাজ্যের বাণিজ্য ও রপ্তানিকে আরও গতি দিতে একাধিক পরিকাঠামোগত উদ্যোগের কথাও ঘোষণা করেন মুখ্যমন্ত্রী। জানান, কলকাতা ও শিলিগুড়িতে ট্রেড ও এক্সপোর্ট ফেসিলিটেশন সেন্টার তৈরি করা হবে। এই কেন্দ্রগুলিকে ঘিরেই গড়ে উঠবে নতুন বিজনেস হাব। আগামী দিনে পণ্যের প্যাকেজিং ও ব্র্যান্ডিংয়ের উপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হবে, যাতে বাংলার পণ্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও নিজেদের জায়গা পাকা করতে পারে। ব্যবসায়ীদের সমস্যা দ্রুত মেটাতে আগামী ১৫ দিনের মধ্যে একটি ওয়েলফেয়ার বোর্ড গঠনের নির্দেশও দেন তিনি, যেখানে রাজ্যের প্রতিটি জেলার ব্যবসায়ী সংগঠনকে যুক্ত করা হবে। প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রসঙ্গেও এ দিন স্পষ্ট অবস্থান নেন মুখ্যমন্ত্রী। তাঁর কথায়, এআই ও আধুনিক প্রযুক্তির অগ্রগতি অস্বীকার করার উপায় নেই, তবে সেই অগ্রগতির দৌড়ে মানুষের রুজি-রোজগার যেন হারিয়ে না যায়, সে বিষয়ে রাজ্য সরকার সতর্ক। ‘এআই অপারেশন করছে, সেটা মানছি। কিন্তু হিউম্যান টাচও দরকার’, বলেন মমতা। তাঁর বক্তব্যে বারবারই ফিরে আসে মানুষের জীবিকা ও ‘পেটের খিদে’-র কথা।
রাজ্যের অর্থনৈতিক শক্তির খতিয়ান তুলে ধরে এদিন মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘বেঙ্গল ইজ দ্য কমার্শিয়াল গেটওয়ে অব ইন্ডিয়া।’ তাঁর দাবি অনুযায়ী, রাজ্যে ৬ টি ইকোনমিক করিডর তৈরি হচ্ছে, যা চালু হলে যোগাযোগ ব্যবস্থা যেমন বদলাবে, তেমনই তার চারপাশে গড়ে উঠবে নতুন শিল্প ও ব্যবসা। পরিসংখ্যান দিয়ে তিনি জানান, রাজ্যের এমএসএমই সেক্টরে রয়েছে প্রায় ৯৩ লক্ষ ইউনিট, যেখানে কাজ করেন প্রায় ১ কোটি ৩০ লক্ষ মানুষ। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে লক্ষাধিক স্বনির্ভর গোষ্ঠী। রপ্তানি বাণিজ্য ইতিমধ্যেই ১ লক্ষ ১৫ হাজার কোটি টাকার গণ্ডি পেরিয়েছে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। মঞ্চ থেকেই কেন্দ্রের বিরুদ্ধে বঞ্চনার অভিযোগ তুলতেও ছাড়েননি তিনি। বলেন, রাজ্যের প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা এখনও কেন্দ্রের কাছে বকেয়া রয়েছে। নোটবন্দি প্রসঙ্গে কটাক্ষ করে মুখ্যমন্ত্রীর মন্তব্য, নোটবন্দি করে দেশের অর্থনীতি চাঙ্গা হয়নি, মানুষের হাতে টাকা থাকলেই বাজার সচল হয়। নিজের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, তাঁর নিজের কাছেও কোনো ডেবিট বা ক্রেডিট কার্ড নেই।
ব্যবসায়ীর বাম আমলের বনধ সংস্কৃতির কথাও উঠে আসে মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যে। তিনি বলেন, এক সময়ে বনধে রাজ্যে লক্ষ লক্ষ কর্মদিবস নষ্ট হত। তাঁর সরকারের আমলে সে সংস্কৃতি বন্ধ হয়েছে বলেই দাবি করেন তিনি। বহু বঞ্চনার মধ্যেও রাজ্যে ৪০ শতাংশ বেকারত্ব কমেছে বলেও দাবি করেন মমতা, যা নীতি আয়োগের রিপোর্টেও উল্লেখ রয়েছে বলে জানান। উদ্যোক্তাদের মতে, এ দিনের সম্মেলনে ছোট, মাঝারি ও বরো মিলিয়ে প্রায় ১২ হাজার ব্যবসায়ী উপস্থিত ছিলেন। যদিও অনুষ্ঠানের শুরুতেই গ্যালারির একাংশে মাইকের বিভ্রাট দেখা দিলে কিছুটা অস্বস্তি তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রী সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রী ইন্দ্রনীল সেনকে বিষয়টি দেখার নির্দেশ দেন। নিরাপত্তা সংক্রান্ত কড়াকড়ি নিয়েও বিতর্ক হয়। সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের জলের বোতল ও ব্যাগ নিয়ে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, যদিও পুলিশের দাবি ছিল, এটি শুধুমাত্র নিরাপত্তার কারণেই।
❤ Support Us





