- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মাঝেও দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যে জোর! যৌথ টাস্ক ফোর্স গঠনের উদ্যোগ ভারত-বাংলাদেশের
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সহ একাধিক দাবি ঘিরে দিল্লি ও ঢাকার মধ্যে কূটনৈতিক চাপানউতোর অব্যাহত। এ আবহেও দু–দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে স্বাভাবিক রাখা, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা চলছে। এ লক্ষ্যেই ভারত ও বাংলাদেশ একটি যৌথ টাস্ক ফোর্স গঠনের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। সরকারি স্তরের পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ বাড়িয়ে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে থাকা বিভিন্ন বাধা দূর করার লক্ষ্যেই প্রস্তাবিত এ উদ্যোগ।
ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের উপ-হাইকমিশনার পবনকুমার তুলসীদাস বাধে জানিয়েছেন, টাস্ক ফোর্স গঠনের প্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নিয়ে যেতে দু–দেশের সরকারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও আলোচনা চালাচ্ছে ভারতীয় হাইকমিশন। বাংলাদেশের ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (এফবিসিসিআই)-এর সঙ্গে বৈঠকে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করেন তিনি। ঢাকার গুলশানে এফবিসিসিআইয়ের দফতরে সংগঠনের প্রশাসক মো. ফজলুল হকের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন বাধে। সেখানেই দুই দেশের বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি দীর্ঘদিনের কিছু বাণিজ্যিক বাধা দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা উঠে আসে। বৈঠকের পর ভারতের উপ-হাইকমিশনার জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত যৌথ টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে দু–দেশের ব্যবসায়ী মহল এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ করা সম্ভব হবে। তার ফলে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্রও খুলে যেতে পারে।
টাস্ক ফোর্স গঠনের উদ্যোগকে কার্যকর করতে বাংলাদেশের বেসরকারি ক্ষেত্রের সহযোগিতা চেয়েছেন ভারতের উপ-হাইকমিশনার। বিশেষ করে এফবিসিসিআইয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহলকে এ প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ভাবে যুক্ত হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। ভারতীয় হাইকমিশনের সঙ্গে বাংলাদেশের বেসরকারি ক্ষেত্রের নিয়মিত যোগাযোগ থাকলে প্রস্তাবিত উদ্যোগ বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফজলুল হকের বক্তব্যেও একই সুর। তাঁর কথায়, একটি যৌথ টাস্ক ফোর্স ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য বাড়ানোর পাশাপাশি পারস্পরিক সহযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করতে কার্যকর ভূমিকা নিতে পারে। দুই দেশের ব্যবসায়ী এবং শিল্পোদ্যোগীদের সম্ভাবনাময় ও উদীয়মান ক্ষেত্রে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর মতে, বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নতুন ক্ষেত্র চিহ্নিত করে সেগুলিতে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলের যৌথ উদ্যোগ প্রয়োজন।
বৈঠকে বিশেষ গুরুত্ব পায় বাণিজ্যের ক্ষেত্রে থাকা শুল্ক ও অশুল্ক বাধা। বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মহলের অভিযোগ, ভারতের বাজারে পণ্য পাঠানোর ক্ষেত্রে শুল্ক ছাড়াও একাধিক প্রশাসনিক ও পরিকাঠামোগত বাধার মুখে পড়তে হয় তাঁদের। পণ্য পরীক্ষা, শংসাপত্রের প্রয়োজনীয়তা, শুল্ক দফতরের প্রক্রিয়া, বন্দর ব্যবহারের বিধিনিষেধ, লাইসেন্স সংক্রান্ত নিয়ম এবং বেশি লজিস্টিক খরচ— এই সব বিষয় নিয়েই দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা ও সরকারি আধিকারিকেরা এর আগে জানিয়েছিলেন, এ ধরনের অশুল্ক বাধাগুলি অনেক ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের সম্ভাবনাকে সীমিত করছে। বিশেষত সীমান্ত দিয়ে পণ্য পরিবহণের ক্ষেত্রে প্রশাসনিক জটিলতা এবং পরিকাঠামোগত সমস্যার কারণে ব্যবসার খরচ বেড়ে যায় বলে তাঁদের দাবি। ফলে শুধু শুল্ক কমানো নয়, বাণিজ্যের সঙ্গে যুক্ত অন্যান্য প্রক্রিয়াকেও সরল করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছে ব্যবসায়ী মহলের একাংশ।
২০২৫ সালে ভারতের তরফে নেওয়া কিছু বাণিজ্যিক বিধিনিষেধের ফলে বাংলাদেশ থেকে ভারতে তৈরি পোশাক, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক, আসবাবপত্র-সহ বিভিন্ন পণ্যের প্রবেশ নির্দিষ্ট স্থলবন্দরের মধ্যে সীমাবদ্ধ করা হয়েছিল। সে সিদ্ধান্তের প্রভাব নিয়েও দু–দেশের ব্যবসায়ী মহলে আলোচনা হয়েছে। ফলে নতুন টাস্ক ফোর্সের সামনে অন্যতম বড়ো কাজ হতে পারে এ ধরনের বাণিজ্যিক বাধাগুলি নিয়ে আলোচনা করে সমাধানের পথ খোঁজা। এর মধ্যেই ভারতীয় শিল্পমহলের সঙ্গে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী সংগঠনের যোগাযোগও বাড়ছে। অর্থাৎ, সরকারি স্তরে প্রস্তাবিত যৌথ টাস্ক ফোর্সের পাশাপাশি ব্যবসায়ী মহলের সরাসরি যোগাযোগকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দুই দেশের শিল্প ও বাণিজ্য সংগঠনগুলির মধ্যে নিয়মিত আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে সরকারের কাছে সেগুলি তুলে ধরার পরিকল্পনাও রয়েছে।
গত আগস্টে ঢাকায় ভারত ও বাংলাদেশের বণিকসভাগুলির প্রতিনিধিদের মধ্যে বৈঠক হয়েছিল। সেখানে ভারতের তরফে কনফেডারেশন অফ ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রি বা সিআইআই এবং বাংলাদেশের তরফে ফেডারেশন অফ বাংলাদেশ চেম্বার্স অফ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি বা এফবিসিসিআইয়ের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর পাশাপাশি দুই দেশের ব্যবসায়ীদের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনা হয়। সেই বৈঠকেই ব্যবসা ও বিনিয়োগের পথে থাকা সমস্যাগুলি চিহ্নিত করে তার সমাধানের লক্ষ্যে একটি ব্যবসায়ী-থেকে-ব্যবসায়ী বা ‘বিজনেস-টু-বিজনেস’ টাস্ক ফোর্স গঠনের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। গত শুক্রবারও এফবিসিসিআই এবং সিআইআইয়ের মধ্যে বৈঠকে বাণিজ্য ও বিনিয়োগের পথে থাকা বাধাগুলি চিহ্নিত করার জন্য ব্যবসায়ী-থেকে-ব্যবসায়ী টাস্ক ফোর্স গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয় বলে জানা যাচ্ছে।
শুক্রবারের বৈঠকের পরে ফজলুল হক জানিয়েছিলেন, পরিকাঠামো ক্ষেত্রে বেসরকারি এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের বিষয়ে ভারতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে বাংলাদেশের শক্তি ক্ষেত্রে, বিশেষত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংক্রান্ত সমস্যার মধ্যে, শুধু শক্তি ক্ষেত্রেই নয়— অন্য সম্ভাবনাময় ক্ষেত্রেও বিদেশি বিনিয়োগ প্রয়োজন বলে তিনি জানিয়েছিলেন। ভারতীয় শিল্পমহলের তরফেও বাংলাদেশের বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আগ্রহের কথা জানানো হয়েছে। সিআইআইয়ের ডিরেক্টর জেনারেল চন্দ্রজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, বাংলাদেশের পরিকাঠামো, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং উদীয়মান বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভারতীয় সংস্থাগুলি বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহী। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যের পাশাপাশি বিনিয়োগের সম্পর্কও সম্প্রসারণের সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে।
বৈঠকে ভারত-বাংলাদেশের বাণিজ্যিক যোগাযোগ আরও শক্তিশালী করার বিষয়টিও আলোচনায় আসে। প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ভৌগোলিক নৈকট্য এবং দীর্ঘ সীমান্ত থাকা সত্ত্বেও বাণিজ্যিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে নানা জটিলতাও রয়েছে। সে বাধা কাটিয়ে সীমান্তপারের বাণিজ্যকে আরও সহজ করার জন্য সরকারি এবং বেসরকারি— দুই স্তরেই সমন্বয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। এদিন ভিসা নিয়েও আলোচনা করেছেন ভারতীয় উপ-হাইকমিশনার। তাঁর বক্তব্য, বাংলাদেশি নাগরিকদের ভারতে যাওয়ার ক্ষেত্রে ভিসা প্রক্রিয়া বিভিন্ন পর্যায়ে সহজ করা হয়েছে। বর্তমানে ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন প্রতিদিন প্রায় ৫,০০০টি ভিসা দিচ্ছে বলেও জানান তিনি। দুই দেশের মানুষের যাতায়াত সহজ হলে ব্যবসা, বিনিয়োগ এবং অন্যান্য বাণিজ্যিক যোগাযোগও আরও বাড়বে বলে মনে করছে সংশ্লিষ্ট মহল।
প্রসঙ্গত, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবি নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের বিএনপি সরকারের একাধিক মন্ত্রী ও নেতা ভারতের কাছে বার বার দাবি জানাচ্ছেন। দিল্লি-ঢাকার সম্পর্কে সেই বিষয়টি নিয়ে চাপানউতোরের মধ্যেই চলতি বছর ব্রিকসের আউটরিচ সেশনে যোগ দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিল ভারত। তবে সে আমন্ত্রণে সাড়া দেননি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের তরফে বলা হয়েছিল, প্রধানমন্ত্রী হিসাবে নয়, বিমস্টেকের চেয়ারম্যান হিসাবে তাঁকে ওই অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের তরফে ওই অনুষ্ঠানে কোনো প্রতিনিধি দলও পাঠানো হয়নি। কূটনৈতিক সম্পর্কের এই টানাপড়েনের মধ্যেই বাণিজ্যিক ক্ষেত্রে যোগাযোগ বজায় রাখার বার্তা দিচ্ছে দুই দেশ। কারণ, রাজনৈতিক সম্পর্কের ওঠানামার সরাসরি প্রভাব যাতে দু–দেশের ব্যবসা-বাণিজ্যে না পড়ে, সেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের বক্তব্য। সেই সূত্রেই যৌথ টাস্ক ফোর্স গঠনের প্রস্তাবটি নতুন করে সামনে এসেছে। ফলে, দিল্লি ও ঢাকার রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে নানা টানাপড়েন থাকলেও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যোগাযোগের দরজা খোলা রাখার চেষ্টা স্পষ্ট। এক দিকে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণের দাবি নিয়ে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কে বিতর্ক চলছে, অন্য দিকে ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে সেই সম্পর্ককে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হতে দিতে চাইছে না দুই দেশই।
❤ Support Us







