Advertisement
  • এই মুহূর্তে বৈষয়িক
  • নভেম্বর ২৮, ২০২৫

অনুমানকে নস্যাৎ করে ভারতের অর্থনীতিতে জোয়ার! জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮.২%

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অনুমানকে নস্যাৎ করে ভারতের অর্থনীতিতে জোয়ার! জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৮.২%

আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা, মার্কিন শুল্কের চাপ এবং অভ্যন্তরীণ মূল্যস্ফীতি মাথায় নিয়েও দুর্দার ছুটছে ভারতীয় অর্থনীতি। চলতি অর্থবর্ষের দ্বিতীয় ত্রৈমাসিক, অর্থাৎ জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর সে দৌড়কে এবার আরো দ্রুত করে দিল। সরকারি পরিসংখ্যান দফতর-এর সদ্য প্রকাশিত তথ্য বলছে, এই ৩ মাসে দেশের মোট উৎপাদন বৃদ্ধির হার দাঁড়িয়েছে ৮.২ শতাংশে, যা গত ছয় ত্রৈমাসিকের মধ্যে সর্বোচ্চ। আগের ৩ মাসে বৃদ্ধি ছিল ৭.৮ শতাংশ। গত বছরের একই সময়ে তা নেমে এসেছিল ৫.৬ শতাংশে। ফলে এ বারকার উত্থান যে গগনচুম্বি, তা বলাই বাহুল্য। অর্থনীতি বিশেষজ্ঞদের মতে, জিএসটি-হার শিথিল হওয়ার পরে উৎসবের মরসুমে চাহিদা বাড়ার আশায় কারখানাগুলি বাড়তি উৎপাদনে ঝুঁকেছে। সে আসার ঢেউই শেষ পর্যন্ত জিডিপির অঙ্ককে অক্সিজেন জুগিয়েছে।

যে বৃদ্ধির হার এবার দেখা গেল, তা বিশেষজ্ঞদের অনুমানের চেয়ে যথেষ্ট বেশি। ব্লুমবার্গের অর্থবিশেষজ্ঞরা জুলাই–সেপ্টেম্বরে ৭.৪ শতাংশ বৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছিলেন। কিন্তু শুক্রবারের সরকারি রিপোর্ট দেখিয়ে দিল বাস্তবে উত্থানের ঢেউ আরো উঁচুতে উঠেছে। গত বছরের একই সময়ে যেখানে বৃদ্ধি থেমে গিয়েছিল ৫.৬ শতাংশে, সেখানে এ বারকার অঙ্ক ৮.২। প্রথম ত্রৈমাসিকের ৭.৮ শতাংশ বৃদ্ধিকেও পেছনে ফেলে আরো উপরে উঠেছে দেশীয় অর্থনীতির সূচক। বিশেষজ্ঞদের একাংশ মনে করছেন, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিকে নিয়ন্ত্রণে রাখা এবং উৎপাদন শিল্পে দ্রুত সম্প্রসারণ, দুটি বিষয়ই এই উত্তরণের প্রধান চালিকাশক্তি।

তবে জিডিপির উত্থানের রিপোর্ট প্রকাশের ঠিক আগেই আন্তর্জাতিক অর্থভান্ডার-এর এক মূল্যায়ন নয়াদিল্লিকে কিছুটা বিচলিত করে তোলে। ভারতের জাতীয় হিসাব-নিকাশের গুণমান নিয়ে মন্তব্য করে তারা ডেটাকে দেয় ‘সি’ গ্রেড—৪ স্তরের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন। তাদের দাবি, ভারতীয় জাতীয় পরিসংখ্যান সংগ্রহ পদ্ধতিতে কিছু মৌলিক দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু শুক্রবারের পরিসংখ্যান প্রকাশিত হতেই স্পষ্ট হয়ে গেল যে, উৎপাদন ও ভোগের ঢেউ তৈরি হয়েছে, তা কোনো পদ্ধতিগত দুর্বলতায় আটকে রাখার মতো নয়। অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন আগে বলেছিলেন, জিএসটি-পরিবর্তনের পরে সাধারণ মানুষের হাতে বাড়তি ২ লক্ষ কোটি টাকা ফিরে আসবে। সেই বাড়তি ক্রয়সামর্থ্য যে বাজারে চাহিদা বাড়িয়েছে বলে মত একাংশের।

উৎপাদন শিল্পে প্রবল গতি এ বারকার বৃদ্ধির সবচেয়ে বড়ো কারণ বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। গত বছরের তুলনায় এক লাফে প্রায় চারগুণে পৌঁছে গিয়েছে এই খাতের অগ্রগতি, আর তার প্রভাব সরাসরি পড়েছে সামগ্রিক জিডিপিতে। তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নির্মাণ শিল্পের দৌড়। বৃহত্তর অর্থনীতিতে পরিকাঠামো-নির্ভর এই খাতের সম্প্রসারণ দেশের পুঁজিবিনিয়োগকে আরো মজবুত করেছে। পরিষেবা খাতও পিছিয়ে নেই; বরং আর্থিক, রিয়েল এস্টেট ও পেশাগত পরিষেবার অভাবনীয় ১০ শতাংশেরও বেশি বৃদ্ধি পুরো ত্রৈমাসিকের ফলাফলে উল্লেখযোগ্য অনুদান জুগিয়েছে। গ্রামীণ অর্থনীতির ধারাবাহিক উন্নতি, সরকারের পুঁজি ব্যয়ের বৃদ্ধি এবং মার্কিন শুল্ক এড়াতে রফতানির নতুন প্রবণতা, সব মিলিয়েই এ বারকার প্রবৃদ্ধির ভিত্তি আরো জোরদার হয়েছে।

অর্থনীতির গতিময়তার আসল ইঞ্জিন যে ভোগ ব্যয়, তা এই রিপোর্ট আরও স্পষ্ট করে দিয়েছে। পরিবারের ব্যয়বৃদ্ধি বা ব্যক্তিগত ভোগ ব্যয় জুলাই–সেপ্টেম্বরে বেড়েছে প্রায় ৮ শতাংশ। বিশ্লেষকদের মতে, জিডিপির মোট বৃদ্ধির প্রায় ৬০ শতাংশই এসেছে এই ভোগের দৌড় থেকে। বাজারে এই সক্রিয়তা উৎপাদনকে চাঙ্গা করেছে, আর উৎপাদনের ঝাঁপ অর্থনীতিকে ফিরিয়ে এনেছে আরও প্রাণবন্ত ছন্দে। জিডিপি ও জিভিএর সংখ্যাতেও সেই ছন্দ স্পষ্ট। দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকে বাস্তব জিডিপি দাঁড়িয়েছে ৪৮.৬৩ লক্ষ কোটি টাকা, নামমাত্র জিডিপি পৌঁছেছে ৮৫.২৫ লক্ষ কোটিতে। অর্থনীতির প্রকৃত উৎপাদনী শক্তি সূচক জিভিএ-তেও উল্লেখযোগ্য উত্থান দেখা গিয়েছে। প্রথম ছয় মাসের সামগ্রিক বৃদ্ধি ৮ শতাংশে পৌঁছনো দেশীয় অর্থনীতির পুনরুত্থানের লড়াইকে আরো জোরালো করেছে। রিজার্ভ ব্যাঙ্ক দ্বিতীয় ত্রৈমাসিকের বৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দিয়েছিল। কিন্তু সরকারি রিপোর্ট দেখাল ৮.২ শতাংশের দুর্দান্ত অগ্রগতি, যা শুধু প্রত্যাশাকেই ছাপিয়ে গেল না, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের অনুমানকেও অতিক্রম করল স্পষ্ট ব্যবধানে।

তবে এই সব উজ্জ্বল সংখ্যার মাঝেও অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করছেন একটি দিকেই, কৃষিক্ষেত্রের মন্থর গতি। বৃষ্টির অনিশ্চয়তা এবং উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির কারণে কৃষি খাতের উন্নতি খুবই সীমিত। এই খাত যদি শক্তিশালী না হয়, তবে সামগ্রিক বৃদ্ধির ভিত কিছুটা হলেও নড়বড়ে হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের অনিশ্চয়তা ও রফতানির চাপও নজরে রাখতে হবে। তবু, সব মিলিয়ে ভারতীয় অর্থনীতির এ বারকার প্রতিচ্ছবি উজ্জ্বল। উৎপাদন শিল্পের নবজাগরণ, পরিষেবা খাতের আস্থাজাগানো উত্থান এবং ভোগ ব্যয়ের পুনরুদ্ধার— এই তিন স্তম্ভই বলে দিচ্ছে, ভারতের অর্থনৈতিক রথ আপাতত শক্ত ছন্দেই এগোচ্ছে। আগামীতে বহির্বিশ্বের বাজার ও অভ্যন্তরীণ কৃষিক্ষেত্র কেমন আচরণ করে, তা-ই ঠিক করবে এই রথ আরও কত দূর, কত দ্রুত এগোতে পারে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!