- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ১০, ২০২৫
মগজে ধরেছে পচন, তবু মুখে তালা ! ভারতের মানসিক স্বাস্থ্যে নিঃশব্দ জরুরি অবস্থা
আজ বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। অথচ ভারতে যে ছবি, তাতে আশার আলো নেই, বরং উৎকণ্ঠা আর আশঙ্কার মেঘ ঘনিয়ে আসছে। এ এক নিঃশব্দ ক্ষরণ, যা ধীরে ধীরে গ্রাস করছে আমাদের দেশের ভবিষ্যৎ, তারুণ্য, শিশুকাল, স্বপ্নগুলোকে। প্রশ্ন উঠছে কেন ভারতের মতো দেশে এমন পরিস্থিতি! কারণ হিসাবে উঠে আসছে বহুমাত্রিক দিক। একদিকে সমাজে মানসিক সমস্যা নিয়ে চলমান ট্যাবু, গুরুত্ব না দেওয়া, দারিদ্র, বাস্তুচ্যুতি এবং এক শ্রেণির আসক্তি। ফোনের পর্দা, রিলস, গেম, মাদক, অনলাইন জুয়া—সব মিলিয়ে যেন এক নিঃশব্দ নিউরোলজিক্যাল মহামারির জন্ম হয়েছে, যার নাম আমরা দিতে শিখেছি খুব দেরিতে। কি নিছক একটি ‘ব্যক্তিগত সমস্যা’, না কি তা এখন সমাজের সবচেয়ে ভয়াবহ স্বাস্থ্য-সঙ্কট?
‘সবাই তো করে’, ‘একটু রিল দেখাই বা কী ক্ষতি’—এই স্বাভাবিকীকরণেই আসলে লুকিয়ে আছে ভয়। আজকের ভারতে প্রায় ৫০ কোটিরও বেশি মানুষ কোনো না কোনো আসক্তির শিকার। কেউ মাদক বা অ্যালকোহলে, কেউ বা তামাকজাত দ্রব্যে। কিন্তু নতুন আতঙ্কের নাম আচরণগত আসক্তি— ফোন স্ক্রলিং, ভিডিও গেম, নীল ছবি, অপ্রয়োজনীয় কেনাকাটা কিংবা রাতভর অনলাইন জুয়া। এসব আসক্তি শুধু অভ্যাস নয়, এটি আজ বৈজ্ঞানিকভাবে প্রমাণিত এক মস্তিষ্কজনিত অসুখ, যা মস্তিষ্কের ডোপামিন নিঃসরণের স্বাভাবিক পথে বিঘ্ন ঘটায়। ধীরে ধীরে তৈরি করে এক চক্র—আকর্ষণ, তৃপ্তি, অপরাধবোধ, ফের আকর্ষণ। যে চক্র থেকে বেরনো সহজ নয়।
১৩ বছরের বাচ্চা সিগারেটে আসক্ত। ১৫ বছরেরা মোবাইল গেমের ছদ্মবেশে অনলাইন জুয়ায় মত্ত। ১০ বছরেরা ইনস্টাগ্রামে ‘ট্রেন্ড’ ধরার প্রতিযোগিতায়। অথচ, পরিবারে ও সমাজে এক অদ্ভুত চুপচাপ মানিয়ে নেওয়ার সংস্কৃতি—‘এ তো এখনকার ছেলেমেয়েরা এমনই।’ বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি শুধুমাত্র আচরণগত বদল নয়, বরং নীরব নিউরোলজিক্যাল ধ্বংস। কারণ, এই শিশুদের মস্তিষ্ক এমন এক অভ্যস্ততায় অভ্যস্ত হয়ে উঠছে, যেখানে মনোযোগের স্থায়িত্ব মাত্র ৮–১০ সেকেন্ড। পড়াশোনা, সম্পর্ক, জীবন সবই ক্ষতিগ্রস্ত। পাশাপাশি, মানসিক চাপ, বেকারত্ব, একাকীত্ব, নিরাপত্তাহীনতা, স্বীকৃতির অভাব—এ সবই সমাজে তৈরি করছে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা। সেসব চাপকে তাত্ক্ষণিক কমাতে গিয়ে মানুষ বেছে নিচ্ছে নেশা, আসক্তি। এক সময় সেই শর্টকাট-ই হয়ে দাঁড়ায় প্রধান রাস্তা। অথচ, এমন ‘জরুরি অবস্থা’ মোকাবিলায় দেশে এখনো পর্যন্ত নেই কোনো পূর্ণাঙ্গ, স্কেলযোগ্য ব্যবস্থাপনা। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যবস্থা নেওয়া হয় তখনই, যখন মানুষ তলানিতে গিয়ে ঠেকে— ওভারডোজ, আত্মহত্যার চেষ্টা, বা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি।
দেশে আসক্তি নিরাময় কেন্দ্র বা রিহ্যাব গোনা যায় আঙুলেই। কিন্তু ৫০ কোটি মানুষের জন্য এই সংখ্যা অবিশ্বাস্যভাবে অপ্রতুল। অর্থনৈতিকভাবে হিসেব করলে, ক্যানসার, হৃদরোগ, যকৃতের অসুখ—সবকিছু মিলিয়ে প্রতি বছর স্বাস্থ্যখাতে ক্ষতির পরিমাণ অজস্র কোটি টাকায় পৌঁছয়, যার বড়ো অংশই আসক্তিজনিত। কর্মদক্ষতা কমছে, পড়ুয়ার পড়াশোনা গোলমাল, কর্মক্ষেত্রে লোকজন শারীরিকভাবে উপস্থিত থেকেও মানসিকভাবে অনুপস্থিত। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রথাগত মানসিক চিকিৎসা সবার নাগালে নেই। মনোরোগ চিকিৎসক সংখ্যায় সীমিত, পরিকাঠামো প্রায় নেই বললেই চলে। তাই প্রযুক্তিনির্ভর, আঞ্চলিক ভাষাভিত্তিক সমাধানই ভবিষ্যতের পথ। যেমন, ‘প্রারম্ভ লাইফ’-এর মতো অ্যাপ, যেখানে বাংলা ভাষাতেই সাধারণ মানুষের ভাষায় মানসিক সহায়তা মেলে। এখানে শুধু চূড়ান্ত পর্যায়ের নয়, প্রাথমিক পর্যায়ে হস্তক্ষেপ সম্ভব।
সমস্যা কেবল এটুকুই, তা নয়। ‘এসওএস চিলড্রেন ভিলেজ ইন্ডিয়া’ রিপোর্ট বলছে, দারিদ্র্য, পরিবারিক অস্থিরতা, বা বাস্তুচ্যুতি— এ সমস্ত কারণেই ভারতের লক্ষ লক্ষ শিশু মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। কিন্তু, শিশু কল্যাণ কর্মসূচিতে মানসিক স্বাস্থ্যকে উপেক্ষা করা হয়। ফলত, বহু বাচ্চার সমস্যা তখনই সামনে আসে, যখন তা আত্মহত্যা বা আত্মঘাতী আচরনের মতো ঘাতক রূপ নেয়। ‘ন্যাশনাল মেন্টাল হেলথ সার্ভে’ বলছে, ভারতে সাধারণ মানসিক অসুস্থতার ক্ষেত্রে চিকিৎসা না পাওয়ার হার ৮৫%-এরও বেশি। শহরে এই হার আরো ভয়ানক। প্রায় ৭০% কলেজ পড়ুয়া মাঝারি থেকে গুরুতর উদ্বেগে ভোগে, ৬০% বিষণ্নতায়। অথচ, সহায়তা নেওয়ার ক্ষেত্রে ভয়, লজ্জা আর সামাজিক কলঙ্ক বাধা হয়ে দাঁড়ায়। কেরালা, যে রাজ্যকে স্বাস্থ্য পরিষেবার মানের জন্য প্রশংসা করা হয়, সেখানেও ১৪.৪% প্রাপ্তবয়স্করা জীবনের কোনো না কোনো পর্যায়ে মানসিক অসুস্থতায় আক্রান্ত। জাতীয় গড়ের দ্বিগুণের কাছাকাছি।
ভারতের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুতর সমস্যা, মানসিক যন্ত্রণাকে দুর্বলতা বলে মনে করা। অনেকেই ভাবেন, এটি ‘কর্মফল’, ‘ইচ্ছাশক্তির অভাব’ বা ‘আধ্যাত্মিক দুর্বলতা’। ফলে, চিকিৎসার পরিবর্তে মানুষ যায় পীর-ফকির বা ওঝার কাছে। ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক ও প্রশাসনিক স্তরেও এক ধরনের অবৈজ্ঞানিক মনোভাব প্রবলভাবে লক্ষ্য করা যায়। সরকারি হাসপাতালে পর্যাপ্ত মনোরোগ চিকিৎসক নেই, বাজেট বরাদ্দও নগণ্য। মানসিক স্বাস্থ্যকে ‘কম চাহিদার’ পরিষেবা হিসেবে দেখা হয়। অথচ, বাস্তবতা বলছে, এটাই আগামী দশকের সবচেয়ে বড়ো স্বাস্থ্যচ্যালেঞ্জ।
কি করতে হবে এখনই? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অবিলম্বে মানসিক স্বাস্থ্যকে সামাজিক ও কাঠামোগত সমস্যা হিসেবে দেখতে হবে, শুধুমাত্র ব্যক্তিগত সমস্যা হিসাবে নয়। ভুক্তভোগীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে হবে, যাতে সমাজে সহানুভূতির পরিসর বাড়ে।
প্রাথমিক স্বাস্থ্যব্যবস্থায় মানসিক চিকিৎসা সংযুক্ত করতে হবে, গ্রামে শহরে প্রশিক্ষিত কর্মী নিয়োগ করতে হবে। প্রযুক্তিকে নিয়ন্ত্রণ ও সচেতনভাবে ব্যবহার শেখাতে হবে, বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে। স্কুল, কলেজ ও কর্মস্থলে আবেগগত শিক্ষা বাধ্যতামূলক করতে হবে। সমবেদনা ও সহমর্মিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে পরিবার ও সমাজে। এমনই এক উদ্যোগ নিয়ে দিল্লি থেকে কেরালা পর্যন্ত বাইক যাত্রায় বেরিয়েছেন এক শিক্ষক, যিনি পথে পথে স্কুল, কলেজ ও কমিউনিটিতে সংলাপের মাধ্যমে মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে সচেতনতা বাড়াচ্ছেন। আজ এমন পরিস্থিতে, সোচ্চারে জানান দেবার সময় এসেছে মানসিক স্বাস্থ্য কোনো বিলাসিতা নয়, কোনো চারিত্রিক দুর্বলতা নয় বরং এটি মৌলিক অধিকার। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবসে এই শপথ গ্রহণ করি সকলে।
❤ Support Us






