Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • ডিসেম্বর ১২, ২০২৫

বাতাসে বিষ, দিল্লিকে পিছনে ফেলে দেশের অন্যতম দূষিত শহর কলকাতা! সংসদে ‘বৈশ্বিক দূষণ র‌্যাঙ্কিং’ মানতে নারাজ কেন্দ্র

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
বাতাসে বিষ, দিল্লিকে পিছনে ফেলে দেশের অন্যতম দূষিত শহর কলকাতা! সংসদে ‘বৈশ্বিক দূষণ র‌্যাঙ্কিং’ মানতে নারাজ কেন্দ্র

শীতের আবেশে মোড়া শহর, ব্যস্ত রাস্তা, আসন্ন উৎসবের আলোকোজ্জ্বল মরশুম— সব কিছুর আড়ালে ধীরে ধীরে শ্বাসরোধ হয়ে আসছে কলকাতার বুক। গত এক সপ্তাহে ধারাবাহিকভাবে দিল্লিকে পিছনে ফেলে দেশের মধ্যে সবচেয়ে বিষাক্ত বাতাসের বোঝা কাঁধে নিয়ে হাঁপাতে হয়েছে শহরবাসীকে। শীতের পর্দা নামতেই যেন শহরটিকে গিলে নিতে উঠে এসেছে ধুলো, ধোঁয়া আর অদৃশ্য ক্ষুদ্র বিষকণা। দূষণের পরিমাপক ‘একিউআই’ যেখানে ‘গুরুতর’-এর গণ্ডি ছুঁয়েছে বারবার, কোথাও কোথাও তা গিয়ে ঠেকেছে ‘বিপজ্জনক’ পর্যায়ে— এমন আশঙ্কার ছবি বাংলার ইতিহাসে বিরল।

একিউআই.ইন-এর তথ্য বলছে, গত সাত দিনে কলকাতা শহরের দূষণ বারবার ওঠানামা করেছে। কখনো ১৮৪, আবার কখনো তা হু-হু করে চড়ে গেছে ৪৩৯–এ। ১১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায়, সূচকে দেখা গেল মহানগরীর বায়ুর মান ৪৩৯। আর সে দিন গভীর রাতে মাত্র কয়েক মিনিটের ব্যবধানে তা গিয়ে ঠেকল ৫৫৮–এ। অর্থাৎ কলকাতার বাতাস তখন বিপদ সীমা অতিক্রম করে গেছে। দিল্লির সঙ্গে তুলনা করলে ছবিটা আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। দিল্লিতে দূষণের মাত্রা ওঠানামা করলেও সেখানকার সর্বোচ্চ একিউআই—গ ৪৭৭, কোনো অবস্থাতেই কলকাতার ৫৫৮–এর কাছে পৌঁছতে পারেনি। যে দিল্লির শীতকালীন ‘স্মগ’ দেশজুড়ে পরিচিত, কলকাতা সেই শহরকেও পেছনে ঠেলে এ বার দূষণের এক অচেনা দুনিয়ায় ঢুকে পড়েছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কলকাতার বায়ুর আজকের অবস্থায় এক দিন শ্বাস নেওয়াই শরীরে এমন প্রভাব ফেলে, যা ১১টি সিগারেট ধূমপানের সমান ক্ষতিকর। শুধু ২৪ ঘণ্টার হিসেবেই ক্ষতির মাত্রাটি এমন ভয়াবহ, যা এক সপ্তাহে দাঁড়ায় প্রায় ৭৮টি সিগারেটের সমান, আর মাসের হিসেবে যা ৩৩০–এর গণ্ডিও পেরিয়ে যায়। কলকাতার মতো ঘনবসতিপূর্ণ শহরে এ ধরনের বায়ুমান যে জনস্বাস্থ্যের ক্ষেত্রে ব্যাপক বিপদ ডেকে আনতে পারে, তা নিয়ে আর সংশয় নেই। ইতিমধ্যে, কলকাতার বিভিন্ন হাসপাতালে ইতিমধ্যেই শ্বাসকষ্টের রোগীর ভিড় বাড়তে শুরু করেছে। চিকিৎসকদের মতে, এই দূষণের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো, এতে কেবল চোখ জ্বালা, গলা শুকিয়ে যাওয়া বা শ্বাসকষ্ট হয় না— দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতিটা আরও গভীর। শ্বাসনালির প্রদাহ ক্রমশ বাড়তে থাকে, ফুসফুসের ক্ষমতা কমে যায়, হাঁপানি বাড়ে, হঠাৎ করে শ্বাস আটকে আসার মতো অবস্থাও তৈরি হয়। এসব ক্ষতি নীরবে শুরু হয়, তবে প্রভাবটা ধীরে ধীরে ভয়াবহ হয়ে ওঠে।

‘সিএমএরআই’ কলকাতার পালমোনোলজিস্ট ডাঃ অরূপ হালদার জানালেন, ‘বায়ুদূষণ শুধু জনস্বাস্থ্যের সমস্যা বলে মনে করার কোনো কারণ নেই। এটি গর্ভের শিশুর ওপরেও তীব্র প্রভাব ফেলে। দীর্ঘমেয়াদী দূষণের প্রভাবে গর্ভবতী মহিলাদের ক্ষেত্রে কম ওজনের বা অপরিণত শিশুর জন্মের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়। এবং এমন শিশুরা জন্মের পর সারা জীবন নানা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বেড়ে ওঠে।’ মানুষের অস্বস্তি ও স্বাস্থ্যের সমস্যা ছাড়াও পরিবেশের উপর দূষণের প্রভাবও ক্রমেই গুরুতর হচ্ছে। শীতের আগমনে বাতাসের গতি কমে গেলে দূষণের কণা জমে থাকে মাটির খুব কাছে। হাওয়া উপরে উঠতে পারে না, ফলে সূর্যের আলো ঢুকেও বাতাস পরিষ্কার করতে পারে না। সে কণা জমে শহরকে ঢেকে রাখে ধোঁয়ার চাদরে। পরিবেশবিদদের মতে, কোনো বড়ো ধরনের আবহাওয়াগত পরিবর্তন না ঘটলে কলকাতার দূষণ দ্রুত কমার সম্ভাবনাও কম।

এমনই এক শ্বাসরোধকারী সময়ে সংসদে কেন্দ্র জানিয়েছে, দেশের দূষণ পরিস্থিতি নিয়ে যেসব আন্তর্জাতিক সূচক প্রায়ই আলোচিত হয়— যেমন ‘আইকিউএয়ার’–এর র‌্যাঙ্কিং, ‘হু’–র ডেটাবেস, ‘এনভায়রনমেন্টাল পারফরম্যান্স ইনডেক্স’ বা ‘গ্লোবাল বার্ডেন অব ডিজিজ’— সেগুলোর কোনোটিরই না কি সরকারি স্বীকৃতি নেই। কেন্দ্রীয় পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী কিরিতি বর্ধন সিং বলেছেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার বায়ুগুণ নির্দেশিকাও বাধ্যতামূলক নয়। ‘হু’ কেবল পরামর্শ দেয়, কোনো দেশ তার ভৌগোলিক ও পরিবেশগত বাস্তবতার উপর ভিত্তি করে নিজস্ব মানদণ্ড তৈরি করবে। ভারতও সে পথেই হেঁটেছে। দেশের ১২টি দূষকের জন্য ‘ন্যাশনাল অ্যাম্বিয়েন্ট এয়ার কোয়ালিটি স্ট্যান্ডার্ডস’স্থির করা হয়েছে, যা এখনো কার্যকর।অন্যদিকে কেন্দ্রীয় পরিবেশমন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদব জানিয়েছেন, দিল্লির দূষণে এ বছর গত কয়েক বছরের তুলনায় কিছুটা উন্নতি হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ‘গুড’ এবং ‘মডারেট’ একিউআই–র দিনসংখ্যা বেড়েছে, গড় একিউআই কমেছে, এমনকি ২০২৫ সালে এখনো পর্যন্ত কোনো দিন ‘সিভিয়ার প্লাস’ বিভাগে পড়েনি। যদিও বিরোধীদের অভিযোগ, সরকার ভুল তথ্য দিয়ে মানুষকে বিভ্রান্ত করছে। বায়ুদূষণ যে কীভাবে জনজীবন ব্যহত করছে তা রাজধানীর রাস্তায় বেরোলেই টের পাওয়া যাচ্ছে।

কেন্দ্রের দাবি দিল্লির জন্য স্বস্তির ‘প্রলেপ’ দেওয়ার চেষ্টা করছে বটে, কিন্তু এ মুহূর্তে তিলোত্তমা কলকাতা দেশের মধ্যে সবচেয়ে দূষিত বাতাসে আচ্ছন্ন।প্রশ্ন উঠছে, কলকাতার এই ভয়াবহ পরিস্থিতি মোকাবিলায় রাজ্য সরকারের জরুরি পদক্ষেপ কোথায়? পশ্চিমবঙ্গ দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক বিবৃতি দেয়নি। আলোচনার প্রেক্ষিতও তৈরি হয়নি কোথাও। গবেষকরা মনে করছেন, অনিয়ন্ত্রিত যানবাহনের ধোঁয়া, নির্মাণস্থলের ধুলো, ছোটো শিল্পকারখানার নির্গমন, এবং আবর্জনা পোড়ানো— সব মিলিয়েই এই বিপদের আগুনকে উসকে দিচ্ছে। নাগরিগ সমাজের প্রশ্ন, এ শহরকে কি তবে পরিস্থিতির ভয়াবহতা, তা নিয়ে আলোচনা, যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস পাওয়ার জন্যও আরো অপেক্ষা করতে হবে? শীতের শেষ পর্যন্ত কি শহরবাসীকে এই ‘বিষাক্ত শ্বাস’ নিয়েই টিকে থাকতে হবে? না কি দ্রুত কোনো কড়া পদক্ষেপের মাধ্যমে দূষণের লাগাম টেনে ধরতে, রাজ্য প্রশাসন ও পরিবেশ রক্ষাকারী সংস্থাগুলি এবার সত্যিই নড়েচড়ে বসবে? কলকাতা আজ এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে প্রতিটি শ্বাস ভাবিয়ে তুলছে মহানগরের বাসিন্দাদের।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!