Advertisement
  • এই মুহূর্তে বৈষয়িক
  • আগস্ট ১, ২০২৫

রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ, কূটনৈতিক ভারসাম্যের কোন অঙ্ক দিল্লির ?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
রাশিয়া থেকে তেল আমদানি বন্ধ, কূটনৈতিক ভারসাম্যের কোন অঙ্ক দিল্লির ?

সস্তা তেল আর রফতানি করছে না রাশিয়া, উল্টে বাড়ছে আমেরিকার চোখ রাঙানি। জোড়া চাপের মুখে, রাশিয়ার থেকে অপরিশোধিত তেল কেনা আপাতত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত তেল পরিশোধন সংস্থাগুলি। মস্কোর সাথে তেলবাণিজ্যে অর্থনীতির হিসেবে টান পড়েছে আগের লাভের অঙ্কে। পাশাপাশি, বিষফোঁড়ার মতো হাজির পশ্চিমের ভূ-রাজনীতি, বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্ক হুঁশিয়ারিতে কূটনৈতিক চাপে পড়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য হয়েছে নয়াদিল্লি।

সূত্রের খবর, গত এক সপ্তাহে রাশিয়া থেকে একফোঁটা তেলও কেনেনি ভারতের প্রধান চারটি রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন, হিন্দুস্তান পেট্রোলিয়াম, ভারত পেট্রোলিয়াম এবং ম্যাঙ্গালোর রিফাইনারি অ্যান্ড পেট্রোকেমিক্যালস। তার পরিবর্তে সংযুক্ত আরব আমিরাতের মুরবান ক্রুড এবং পশ্চিম আফ্রিকার তেল আমদানির দিকে ঝুঁকেছে তারা। বোঝাই যাচ্ছে, রাশিয়ার উপর নির্ভরশীতলা কমিয়ে, আমদানির উৎস বহুমুখীকরণের দিকে ভারতের ঝোঁক বাড়ছে। যদিও এ পর্যন্ত ভারত সরকার বা সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলির তরফে এ বিষয়ে কোনো বিবৃতি দেওয়া হয়নি। কিন্তু সিদ্ধান্তটা যে নিতান্তই তাৎক্ষণিক নয়, তা স্পষ্ট হয়েছে ঘটনাপ্রবাহে।

২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর রাশিয়ার উপর একের পর এক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে আমেরিকা। তখন রাশিয়া বিকল্প বাজার খুঁজতে ভারতের দিকে হাত বাড়ায়। তেল বিক্রিতে বিপুল ছাড় দিতে শুরু করে পুতিনের দেশ। সস্তার সেই তেল তখন ভারতের জ্বালানি ক্ষেত্রে খানিকটা অক্সিজেন জুগিয়েছিল। ২০২১-এর তুলনায় মাত্র ১% থেকে তেল আমদানির হার ৩৫%-এ পৌঁছে যায়। কিন্তু বর্তমানে সেই ছাড় অনেকটাই হ্রাস পেয়েছে। ২০২২ সালের তুলনায় এই মূহূর্তে ছাড় সর্বনিম্ন। এমত অবস্থায় রাশিয়ান তেল কেনার অর্থনৈতিক যুক্তি অনেকটাই ক্ষীণ হয়ে পড়েছে নয়াদিল্লির জন্য। এমনটাই মনে করছেন তেল শিল্পের সঙ্গে যুক্ত বিশ্লেষকরা। যদিও, ২০২৫ সালের প্রথমার্ধে ভারতের দৈনিক রাশিয়ান তেল আমদানি দাঁড়ায় গড়ে ১৮ লক্ষ ব্যারেলে। এর মধ্যে প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করেছে বেসরকারি রিফাইনারি সংস্থা , রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজ এবং রোসনেফ্ট-অধীনস্থ নাইয়ারা এনার্জি। বাকি অংশ কিনেছে রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলি।

অন্যদিকে, অর্থনৈতিক ভাটার বাস্তবতার সঙ্গে জুড়ে গিয়েছে আন্তর্জাতিক রাজনীতির মোচড়। ১৪ জুলাই ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন, রাশিয়া যদি ইউক্রেনের সঙ্গে ‘শান্তিচুক্তি’ না করে, তবে যেসব দেশ রাশিয়া থেকে তেল কিনছে, তাদের পণ্যের উপর ১০০% আমদানি শুল্ক বসানো হবে। এখানেই শেষ নয়। গত ২৮ জুলাই ট্রাম্প ঘোষণা করেন, রাশিয়ার পণ্য আমদানির উপর ‘সেকেন্ডারি স্যাংশন’ কার্যকর করার সময়সীমা কমিয়ে ৫০ দিন থেকে ১০-১২ দিন করা হয়েছে। তার ঠিক দু-দিন পর, ৩০ জুলাই মার্কিন প্রেসিডেন্ট জানিয়ে দেন, ১ অগস্ট থেকে ভারতের পণ্যের উপর চাপানো হবে ২৫% আমদানি শুল্ক। স্পষ্ট ভাষায় ট্রাম্প বলেন, ‘ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে তেল ও অস্ত্র কিনলে ভবিষ্যতে তাদের আরো বড়ো শাস্তির মুখে পড়তে হবে।’ শুধু তো তেল নয়, রাশিয়া ভারতের অস্ত্র সরবরাহকারী প্রধান দেশ। যুদ্ধবিমান থেকে ট্যাঙ্ক, ক্ষেপণাস্ত্র থেকে গোলাবারুদ—দীর্ঘদিন ধরেই ভারতীয় সামরিক বাহিনীর এক বড়ো অংশ নির্ভর করে রুশ অস্ত্রের উপর। যদিও গত কয়েক বছরে আমেরিকা ও ইউরোপ থেকে অস্ত্র কেনা কিছুটা বেড়েছে, তবুও সামরিক ক্ষেত্রে রাশিয়া এখনো গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। এই দ্বিমুখী সম্পর্কই মার্কিন প্রশাসনের অস্বস্তির কেন্দ্রে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ভারত ও রাশিয়ার বাণিজ্যিক ঘনিষ্ঠতা ‘অগ্রহণযোগ্য’। শুধু তাই নয়, তিনি আরেকধাপ এগিয়ে, ব্যঙ্গ করে বলেছেন, ‘রুশ ও ভারতীয় অর্থনীতি মৃতপ্রায়!’

প্রসঙ্গত, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে ভারত-রাশিয়া দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছুঁয়েছে ৬.৮ হাজার কোটি ডলারে। তার মধ্যে মাত্র ৪৯০ কোটি ডলারের পণ্য রফতানি হয়েছে রাশিয়ায়, বাকি ৬.৩ হাজার কোটি ডলারের পণ্য এসেছে রাশিয়া থেকে, বেশির ভাগই তেল ও অস্ত্র। এই বিপুল বাণিজ্য ঘাটতি সত্ত্বেও দুই দেশের সম্পর্ক ছিল দৃঢ়। ভারত শুরু থেকেই বলে এসেছে, একতরফা মার্কিন নিষেধাজ্ঞা মানে না তারা। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত এবং ট্রাম্পের লাগাতার হুঁশিয়ারিতে এখন কার্যত ব্যাকফুটে নয়াদিল্লি। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির কর্তারা আশঙ্কা করছেন, নিষেধাজ্ঞা আরো কড়া হলে তহবিল সংগ্রহ, বিমা কিংবা আন্তর্জাতিক অর্থ লেনদেনেও সমস্যা দেখা দিতে পারে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ভারতের ভূ-কৌশলগত ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে আমেরিকা। কিছু কূটনৈতিক বিশ্লেষক জানাচ্ছেন, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে হতাশ ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই পাকিস্তানের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তিতে এগিয়ে গিয়েছে। ‘বন্ধু’ মোদিকে খোঁচা দিয়ে ট্রাম্প বলেছেন, ‘ভবিষ্যতে হয়তো পাকিস্তান তেল বিক্রি করবে ভারতকে!’ তবে, এই মুহূর্তে ভারতের অবস্থান স্পষ্ট, জাতীয় স্বার্থ সুরক্ষিত রাখাই প্রধান লক্ষ্য। কেন্দ্র জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক চাপ থাকলেও দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত স্বার্থ বজায় রাখার পথেই হাঁটবে তারা। রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলির পিছু হটা তাই শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক ব্যালান্সের একটা কৌশলও বটে। সরকার হয়তো এখনই মুখ খুলছে না, কিন্তু সিদ্ধান্ত যে ভবিষ্যতের বড়ো কোনো বার্তার ইঙ্গিত বহন করে, তাতে সংশয় নেই ওয়াকিবহাল মহলের।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!