- এই মুহূর্তে বৈষয়িক
- জুলাই ৩১, ২০২৫
ট্রাম্পের শুল্ক ঘোষণার আঘাতে ভারতের শেয়ারবাজারে রক্তক্ষরণ, মাত্র ১৫ মিনিটে উধাও ৫ লক্ষ কোটি টাকা
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হঠাৎ শুল্ক ঘোষণার পরিণতি কী ভয়াবহ হতে পারে, তা বৃহস্পতিবার সকালে টের পেল ভারতের শেয়ার বাজার। সকাল ৯টা বাজতেই বাজার খুললেই মাত্র ১৫ মিনিটের মধ্যেই বাজার থেকে মুছে গেল বিনিয়োগকারীদের ৫ লক্ষ কোটির বেশি টাকা। এক লপ্তে তলিয়ে গেল বিনিয়োগকারীদের আস্থা। আজ সেনসেক্স দিনের শুরুতেই পড়ে যায় ৭৮৬ পয়েন্ট। নেমে আসে ৮০,৬৯৫-এর ঘরে। নিফ্টি পড়ে ২১২ পয়েন্টের বেশি। সকাল ৯টা ১৫ মিনিটেই বিএসই-র তালিকাভুক্ত সংস্থাগুলির বাজার মূলধন কমে দাঁড়ায় প্রায় ৪৫৩ লক্ষ কোটি। ক্ষতির অঙ্ক দাঁড়ায় ৫.৫ লক্ষ কোটির আশেপাশে। বিএসই-তে তালিকাভুক্ত শীর্ষ ৩০টি কোম্পানির মধ্যে ২৬টির শেয়ার পড়েছে। টাটা মোটরস, রিলায়েন্স, মহীন্দ্রা অ্যান্ড মহীন্দ্রা, ভারতী এয়ারটেলের শেয়ার এক ধাক্কায় গড়ে ২ শতাংশ পড়ে যায়। বিপরীতে কিছু সংস্থা ইতিবাচক থেকেছে, যার মধ্যে জোমাটোর শেয়ারে সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধির নজির দেখা গিয়েছে। হিন্দুস্তান ইউনিলিভার, ইটারনাল এবং পাওয়ারগ্রিড স্থিতিশীল অবস্থায় আছে।
শুধু বড়ো কোম্পানিই নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্মলক্যাপ আর মিডক্যাপ শেয়ারগুলিও। বিএসই স্মলক্যাপ সূচক পড়ে যায় ৪০০ পয়েন্টের বেশি। নিফ্টি স্মলক্যাপ নামে ৬০০ পয়েন্ট। বিএসই মিডক্যাপ সূচক কমে ৩০০ পয়েন্ট। ফেজ থ্রি লিমিটেডের শেয়ারে পতন ১০ শতাংশ। প্রিমিয়ার অ্যানার্জি লিমিটেডের-এর মতো মিডক্যাপ সংস্থার শেয়ারও পড়েছে ৩.৫ শতাংশ। বৃহস্পতিবার বিএসই-তে মোট ৩,০৮৫টি শেয়ারে লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ৮৮৭টি শেয়ারের দাম বেড়েছে, কিন্তু ২,০৩৩টির দাম কমেছে। ১৬৫টি শেয়ার আগের দামে অপরিবর্তিত থেকেছে। ৬১টি শেয়ার পৌঁছেছে আপার সার্কিটে এবং সমসংখ্যক শেয়ার লোয়ার সার্কিটে এসে থেমেছে। ৫১টি স্টক পড়েছে তাদের ৫২ সপ্তাহের সর্বনিম্ন পর্যায়ে, বিপরীতে ৩৬টি উঠেছে সর্বোচ্চ পর্যায়ে। এই ঘোষণার রেশ পড়েছে প্রতিটি সেক্টরে। নিফ্টি ব্যাঙ্ক সূচক নেমেছে প্রায় ৩০০ পয়েন্ট, নিফ্টি আইটি পড়েছে ২১৫ পয়েন্ট, এফএমসিজি-তে পতন ৩০০ পয়েন্টের বেশি। ফার্মাসিউটিক্যাল খাতেও পতন ১.৫ শতাংশ, সূচক নেমে এসেছে ২২,৭২৪-এ।
ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন, ১ অগস্ট থেকে ভারতের সমস্ত রফতানিপণ্যের উপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করা হবে। এর সঙ্গেই রাশিয়ার কাছ থেকে তেল এবং অস্ত্র কেনার জন্য ভারতকে দিতে হবে ‘অতিরিক্ত জরিমানা’। সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘ভারত আমাদের বন্ধু, কিন্তু তাদের শুল্ক খুবই বেশি। যখন সবাই চাইছে রাশিয়া ইউক্রেনে হামলা থামাক, তখন ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র কেনে! এটা চলতে পারে না।’ ভারতের পক্ষ থেকে পাল্টা প্রতিক্রিয়া আসে। সরকার জানায়, ‘আমাদের কৃষক, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের স্বার্থ সুরক্ষায় সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের স্বার্থে সব রকম আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্তই যথোপযুক্ত বিচার করে নেওয়া হবে। ইউকে-র সঙ্গে সাম্প্রতিক চুক্তির ক্ষেত্রেও সেটাই হয়েছে।’ মার্কিন প্রেসিডেন্টের অনড় ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই শেয়ার বাজারে শুরু হয় ব্যাপক বিক্রি। একের পর এক সেক্টর লাল চিহ্নে। সবচেয়ে বেশি ধাক্কা খায় তেল ও গ্যাস সংস্থাগুলি। ইন্ডিয়ান অয়েল, বিপিসিএল, ওএনজিসি, মহানগর গ্যাস এবং গুজরাট গ্যাসের শেয়ারগুলি মুহূর্তে মুখ থুবড়ে পড়ে। বৈশ্বিক চাহিদা কমে যাওয়ার আশঙ্কায় এই শেয়ারগুলিতে ব্যাপক বিক্রয় চাপ তৈরি হয়। ট্রাম্পের ঘোষণার জেরে বুধবারই বিদেশি লগ্নিকারীরা ভারতীয় বাজার থেকে ৮৫০ কোটি টাকার শেয়ার বিক্রি করে বেরিয়ে যান। তারা হয়তো আগেভাগেই আঁচ করতে পেরেছিলেন আসন্ন ধাক্কার ইঙ্গিত।
বাজার বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, ট্রাম্পের ঘোষণার ধাক্কা সবচেয়ে বেশি লাগবে রফতানিমুখী শিল্পগুলিতে, যেমন টেক্সটাইল, ফার্মা, অটো কম্পোনেন্টস এবং সামুদ্রিক খাদ্য রফতানি। এবং এ ধাক্কা শুধু এক-দুদিনের নয়, ভবিষ্যতের বাণিজ্য-নীতি, রফতানি ও বৈদেশিক সম্পর্কের উপর দীর্ঘমেয়াদী প্রভাব পড়তে চলেছে। ইতিমধ্যে নিফ্টি ফার্মা সূচক প্রায় ১.৫ শতাংশ পড়েছে। বড়ো পতন হয়েছে নিফ্টি রিয়েলটি ও পিএসইউ ব্যাঙ্ক সূচকেও। কোটাক মাহিন্দ্রা অ্যাসেট ম্যানেজমেন্ট-এর ম্যানেজিং ডিরেক্টর নীলেশ শাহ বলেছেন, ‘বাজারে এত বৃহৎ ধাক্কা আশা করেনি। আমরা ধরেই নিয়েছিলাম ভারত ও আমেরিকার কৌশলগত স্বার্থের কারণেই একটা বাণিজ্য চুক্তি হবে। এখন দেখা যাচ্ছে সেই রাস্তা কঠিন হতে চলেছে।’এ দিন নিফ্টি টানা দ্বিতীয় দিন ২৪,৮০০-র ওপর থাকলেও ২৪,৯০০ পার করতে পারেনি। গিফট নিফ্টি সকালেই ১৯০ পয়েন্ট পড়ে ছিল। ডলার-রুপি বিনিময় হার বেড়ে পৌঁছেছে ৮৮-তে। তবে বাজার এখনো অনিশ্চয়তার মেঘে ঢাকা। বিনিয়োগকারীদের চোখ এখন আগামী বাণিজ্যিক সিদ্ধান্ত, রফতানি খাতের নীতিনির্ধারণ ও মার্কিন প্রতিক্রিয়ার দিকে।
❤ Support Us





