- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুলাই ২৮, ২০২৫
রাশিয়া-ভারত গ্যাস করিডরে মধ্যস্থতাকারী হতে চায় ইরান
আন্তর্জাতিক কূটনীতি ও জ্বালানি বাণিজ্যের মানচিত্রে ব্যাপক পরিবর্তনের ইঙ্গিত। ইরান-রাশিয়া-ভারত জ্বালানি অক্ষ গঠনের প্রস্তাব নিয়ে সরগরম তেহরান। এক ইরানি বিশেষজ্ঞের ‘গেম-চেঞ্জিং’ পরিকল্পনা ঘিরে শুরু হয়েছে রাজনৈতিক চর্চা। লক্ষ্য— প্রাকৃতিক গ্যাসের ভূ-রাজনীতি থেকে পশ্চিমা দখলদারিত্ব সরিয়ে এশিয়ায় নতুন শক্তির মেরুকরণ।
ইরানি অর্থনৈতিক বিশ্লেষক সৈয়দ আলি মরতাজাভির প্রস্তাব, রাশিয়ার গ্যাস ভারতের ঘরে পৌঁছবে ইরানের ভূখণ্ড হয়ে, সরাসরি সমুদ্রতলের পাইপলাইনের মাধ্যমে। তাঁর দাবি, ‘এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ইরান আর নিষ্ক্রিয় পর্যবেক্ষক নয়, বরং হয়ে উঠবে দক্ষিণ এশিয়ার গ্যাস ব্যবসার আঞ্চলিক ঘাঁটি। আর এই ত্রিপাক্ষিক গাঁটছড়া কেবল অর্থনৈতিক নয়, কৌশলগত নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’ মরতাজাভি জানিয়েছেন, রাশিয়া এই মূহূর্তে বিশ্বের বৃহত্তম প্রাকৃতিক গ্যাস মজুদের অধিকারী দেশ। আর ভারত, এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ গ্যাস আমদানিকারী দেশ। দুয়ের মাঝে ভৌগোলিক অবস্থানগত সুবিধা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ইরান। ভৌগলিক অবস্থানকেই কাজে লাগাতে হবে বলেই তাঁর মত। ‘ইরান যদি রাশিয়া ও ভারতের মধ্যে একটি গ্যাস করিডর গড়ে তোলে, তাহলে ৩টি দেশের মধ্যে তৈরি হবে পারস্পরিক নির্ভরশীলতা। এই নির্ভরতা হবে এমন এক কূটনৈতিক ঢাল, যার ফলে কোনো পক্ষই আর অপ্রয়োজনে উত্তেজনা ছড়াতে চাইবে না।’ জোরালো সওয়াল মরতাজাভির।
মরতাজাভির আরো দাবি, ইরানের জাতীয় গ্যাস পাইপলাইনের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক, দক্ষিণের কৌশলগত বন্দর, গ্যাস-চালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আন্তর্জাতিক জলে প্রবেশের সুযোগ—সবমিলিয়ে এই প্রকল্পের জন্য আদর্শ অবকাঠামো তৈরি আছে তেহরানে। তাঁর প্রস্তাব, রাশিয়া ও তুর্কমেনিস্তান থেকে ইরানে আসা গ্যাস ব্যবহার করে ইরান নিজেই তা রূপান্তর করতে পারে বিদ্যুৎ বা তরল প্রাকৃতিক গ্যাসে। পেট্রোকেমিক্যাল শিল্পেও বাড়ানো যেতে পারে ব্যবহার। এর ফলে তৈরি হবে নতুন কর্মসংস্থান, বাড়বে রফতানি, দেশের অর্থনীতিতে ঢুকবে বিলিয়ন ডলারের বৈদেশিক মুদ্রা। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় ধুঁকতে থাকা ইরান এমন একটি প্রস্তাবের মাধ্যমে কেবল অর্থনৈতিক মুক্তির পথ খুঁজছে না, বরং আন্তর্জাতিক কূটনীতিতেও নিজেকে ফের তুলে ধরতে চাইছে এক বড়ো খেলোয়াড় হিসেবে। তবে, ইরানের এ প্রস্তাবে ভারত ও রাশিয়ার প্রতিক্রিয়া কী হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়। যদিও, ওয়াকিবহাল মহলের মতে, ইরানের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে বিশ্ব গ্যাস বাণিজ্যে শুরু হতে পারে এক নতুন অধ্যায়, যেখানে এশিয়াই হয়ে উঠবে জ্বালানি রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু।
অন্যদিকে, ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতোল্লা আলি খামেয়নি-এর বিরুদ্ধে পটপরিবর্তনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন সে দেশের নির্বাসিত যুবরাজ রেজা পাহলভি। মিউনিখে আয়োজিত এক সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আপনার শাসন অস্থিতিশীল। চারপাশে বিশ্বাসঘাতকতায় ভরা। ৫০ হাজারেরও বেশি সরকারি ও সামরিক কর্মকর্তা আমার সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন বর্তমান শাসনব্যবস্থা উৎখাতের জন্য।’ তিনি দাবি করেছেন, একটি নিজস্ব নিরাপদ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে যোগাযোগের পথ খুলে দিয়েছেন। তাঁর দাবি, এই পদত্যাগকারী কর্মকর্তাদের মধ্যে অনেকে প্রশাসনের কেন্দ্রীয় স্তরের। এখনো সেসব তথ্য বিশ্লেষণ চলছে, তবে প্রতিক্রিয়া এতটাই ব্যাপক যে, ভবিষ্যতের লড়াইয়ের শক্তি এর ভিতরেই নিহিত আছে। পাশাপাশি সাধারণ ইরানিদের জন্য আলাদা একটি ওয়েবসাইট চালু করার পরিকল্পনাও রয়েছে তাঁর, যেখানে আগ্রহী নাগরিকেরা নিজেদের নাম নিবন্ধন করে জাতীয় আন্দোলনের অংশ হতে পারবেন। যদিও তিনি ৪ দশকের বেশি সময় ধরে বিদেশে নির্বাসিত, তবু তিনি নিজেকে তুলে ধরেছেন ইসলামিক শাসনের বিকল্প হিসেবে, ধর্মনিরপেক্ষ, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রবক্তা হিসেবে। সম্মেলনে ৫০০-রও বেশি ইরানি শিল্পী, মানবাধিকারকর্মী, ক্রীড়াবিদ উপস্থিত ছিলেন, যেখানে তিনি বলেন, ‘এই শাসনের পতন অনিবার্য। এখন সময় জাতীয় ঐক্যের।’ এরপর আয়াতোল্লা খামেয়নিকে সরাসরি হুঁশিয়ারি দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনার চারপাশের অধিকাংশ মানুষ আপনাকে ঘৃণা করে। বিপুল সংখ্যক বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর সদস্য এখন সুযোগ খুঁজছে পালিয়ে বাঁচার। দেশের সাধারণ মানুষও এই শাসনের প্রতি চূড়ান্তভাবে বিরূপ। আপনি রক্ত ও আগুনের পথে হাঁটছেন।’ নিজের কর্মপরিকল্পনা ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, ‘প্রথমে দেশকে মুক্ত করব, তারপর নির্বাচনের আয়োজন করব, যেখানে মানুষ নিজের ভবিষ্যৎ নিজেই নির্ধারণ করবে।’ তিনি বলেন, রাজতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র নয়, মূল লক্ষ্য একটি স্বাধীন নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা। জানিয়েছেন, ‘ইরান সমৃদ্ধি প্রকল্প’ নামে একটি রূপান্তর পরিকল্পনার কথা। সমস্ত রাজনৈতিক মত ও গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এই বিপুল সংখ্যক সরকারি ও সামরিক ‘বিচ্যুত’-এর সক্রিয়তা বর্তমান ইসলামিক শাসনের ভিত কাঁপিয়ে দিতে পারে। যদিও তেহরানের তরফ থেকে এ বিষয়ে এখনো পর্যন্ত কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি, বিশেষজ্ঞদের ধারণা, ইরানের ভবিষ্যতের লড়াই এখন আর কেবল রাজপথে নয়, বরং সংঘটিত হচ্ছে সাইবার পরিসরে, তথ্যপ্রবাহে এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার নতুন সমীকরণে।
❤ Support Us






