Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • জুন ৮, ২০২৬

মধ্যরাতে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে রণক্ষেত্র যাদবপুরের স্টেশন চত্বর, লাঠিচার্জে জখম বহু, আটক সৃজন-সহ একাধিক বাম নেতা

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
মধ্যরাতে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে রণক্ষেত্র যাদবপুরের স্টেশন চত্বর, লাঠিচার্জে জখম বহু, আটক সৃজন-সহ একাধিক বাম নেতা

রবিবার রাতে যাদবপুর স্টেশন চত্বরে উচ্ছেদ অভিযান ঘিরে কার্যত রণক্ষেত্রের চেহারা নিল। বুলডোজারের সামনে মানবপ্রাচীর গড়ে তুলে উচ্ছেদ রুখতে চেয়েছিলেন হকার, স্থানীয় বাসিন্দা, ছাত্রছাত্রী ও সিপিআইআএম-সহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের কর্মী-সমর্থকেরা। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পুলিশি হস্তক্ষেপ, লাঠিচার্জ আর গ্রেফতারের মধ্য দিয়েই শুরু হয় বহু প্রতীক্ষিত উচ্ছেদ অভিযান। রাতের অন্ধকারে একের পর এক দোকান, ছাউনি, অস্থায়ী নির্মাণ ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় জেসিবি। সে দৃশ্য চোখের সামনে দাঁড়িয়ে দেখেন বহু হকার, যাঁদের জীবিকার একমাত্র অবলম্বন ছিল ওই ছোট্ট দোকানগুলি।

রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই যাদবপুর স্টেশন ও সংলগ্ন ২১২ নম্বর বাসস্ট্যান্ড এলাকা কার্যত অবরুদ্ধ হয়ে পড়ে। স্টেশন চত্বরে মোতায়েন করা হয় বিপুল সংখ্যক রেলপুলিশ, কলকাতা পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী। বিভিন্ন রাস্তা ব্যারিকেড দিয়ে ঘিরে ফেলা হয়। স্থানীয়দের অভিযোগ, কোনো সুস্পষ্ট লিখিত নির্দেশ বা পর্যাপ্ত সময় না দিয়েই উচ্ছেদ অভিযান শুরু করা হয়। অনেকের দাবি, মাত্র কয়েক মিনিটের সতর্কবার্তার পরেই বুলডোজার নামিয়ে দেওয়া হয় এলাকায়।

এদিন, সন্ধ্যা থেকেই উচ্ছেদের আশঙ্কায় জমতে শুরু করেছিল ভিড়। হকারদের পাশাপাশি যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা, স্থানীয় বাসিন্দারা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা জড়ো হন। সিপিএম, কংগ্রেস, এসইউসিআই(সি), সিপিআই(এমএল) লিবারেশন-সহ একাধিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা ঘটনাস্থলে পৌঁছন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, পুনর্বাসনের সুস্পষ্ট রূপরেখা ছাড়া উচ্ছেদ কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। ছাত্রছাত্রীদের একাংশের হাতে দেখা যায় ড. বি. আর. আম্বেদকর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, কল্পনা দত্তের প্রতিকৃতি। তাঁদের বক্তব্য, এ কেবল দোকান ভাঙার প্রশ্ন নয়,  গরিব মানুষের জীবন-জীবিকার প্রশ্ন। ‘বুলডোজার হটাও’, ‘পুনর্বাসন ছাড়া উচ্ছেদ নয়’— এমন নানা স্লোগানে মুখর হয়ে ওঠে গোটা এলাকা।

প্রতিবাদীদের দাবি, গত ২ জুনও একই ধরনের উচ্ছেদের চেষ্টা হয়েছিল। সেদিন হঠাৎ স্টেশন চত্বরে বুলডোজার পৌঁছে যেতেই চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ে। বামপন্থী সংগঠন এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতিবাদের মুখে প্রশাসনের সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, সে আলোচনার পর অন্তত ৩ সপ্তাহ সময় দেওয়ার বিষয়ে মৌখিক আশ্বাস মিলেছিল। আদালত খোলার পর আইনি প্রক্রিয়া মেনেই পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলেও জানানো হয়েছিল। কিন্তু সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই ফের গভীর রাতে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ায় ক্ষোভ এলাকায়। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তেজনাও চরমে ওঠে। আন্দোলনকারীরা রাস্তায় বসে পড়েন। পুলিশের সঙ্গে একাধিক দফায় কথা বলার চেষ্টা করেন বাম-কংগ্রেস নেতারা। তাঁদের বক্তব্য ছিল, অন্তত সোমবার আদালত খোলার পর বিষয়টি বিচারাধীন অবস্থায় বিবেচনা করা হোক। কিন্তু পরিস্থিতির কোনো পরিবর্তন হয়নি। পুলিশ মাইকিং করে এলাকা খালি করার নির্দেশ দেয়। আন্দোলনকারীরা সরে না দাঁড়ানোয় শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। তার পরেই নামে লাঠি।

প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, প্রথমে বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ করে। তাতে আহত হন একাধিক আন্দোলনকারী। আহতদের মধ্যে রয়েছেন সিপিএমের প্রবীণ নেতা সুজন চক্রবর্তী। মাথায় চোট লাগার পর তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। আহত হয়েছেন অভিনেতা জয়রাজ ভট্টাচার্য -সহ আরও অনেকে। রাতেই বেশ কয়েক জনকে কেপিসি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসকদের মতে, আহতদের মধ্যে কয়েক জনের মাথায় গুরুতর আঘাত রয়েছে। উচ্ছেদ ঠেকাতে ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য। আন্দোলনকারীদের অভিযোগ, পুলিশ তাঁকে-সহ একাধিক ব্যক্তিকে আটক করে প্রিজন ভ্যানে তোলে। রাতের মধ্যেই তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ শুরু হয়। আটক হওয়া ব্যক্তিদের মুক্তির দাবিতে পরবর্তীতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের সামনে অবস্থান শুরু করেন ছাত্রছাত্রীরা। রাতভর চলে বিক্ষোভ।

উচ্ছেদ অভিযান শুরু হওয়ার পর ঘণ্টাখানেকের মধ্যেই বদলে যায় স্টেশন সংলগ্ন এলাকার চেহারা। বহু বছরের পুরনো দোকান, টিনের ছাউনি, কাঠের কাঠামো এবং অস্থায়ী ব্যবসাকেন্দ্র ভেঙে ফেলা হয়। কোথাও ভাঙা টিনের স্তূপ, কোথাও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা পণ্যসামগ্রী। ভোরের আলো ফুটতেই দেখা যায়, চোখের সামনে জীবিকার অবলম্বন হারিয়ে হতাশ হয়ে বসে রয়েছেন বহু হকার। কারও দোকান পুরোপুরি ধ্বংস হয়েছে, কারও আবার আংশিক ক্ষতি হয়েছে। রেল কর্তৃপক্ষের দাবি, স্টেশন চত্বর এবং রেল জমিতে দীর্ঘদিন ধরে বেআইনি দখল ও নির্মাণের অভিযোগ ছিল। যাত্রী চলাচল এবং নিরাপত্তার স্বার্থে দখলমুক্তকরণ অভিযান চালানো হচ্ছে। এর আগে হাওড়া, শিয়ালদহ, দমদম সহ রাজ্যের বহু স্টেশন এলাকাতেও একই ধরনের উচ্ছেদ অভিযান হয়েছে। যাদবপুর সে ধারাবাহিকতারই অংশ।

তবে আন্দোলনকারীদের প্রশ্ন, যদি উচ্ছেদ অবশ্যম্ভাবীই হয়, তবে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কোথায়? যাঁদের রুজি-রুটি এক ঝটকায় কেড়ে নেওয়া হল, তাঁদের ভবিষ্যৎ কী? এই প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ফলে উচ্ছেদ অভিযান শেষ হলেও রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক যে থামছে না, তা স্পষ্ট। সোমবার সকালেও থমথমে যাদবপুর। স্টেশন চত্বর জুড়ে পুলিশি নজরদারি অব্যাহত। আর ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে বহু মানুষের একটাই প্রশ্ন, আগামীকাল থেকে সংসার চলবে কী ভাবে?


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!