- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ১৬, ২০২৫
যাদবপুরের ছাত্রীর মৃত্যু: পরিবারের অভিযোগ খুন, তদন্তে নামল লালবাজার হোমিসাইড শাখা, নজরে ৭ পড়ুয়া
যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী অনামিকা মণ্ডলের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা নয়, খুন বলে অভিযোগ তুললেন তাঁর বাবা। সোমবার লালবাজারে গিয়ে হোমিসাইড শাখার আধিকারিকদের সঙ্গে আলোচনার পর তিনি যাদবপুর থানায় লিখিতভাবে জানান, ১১ সেপ্টেম্বর রাতে কেউ বা কারা তাঁর মেয়েকে পরিকল্পনা করে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরে ঠেলে ফেলে দেয়। নিহতের বাবার দাবি, ‘‘ও ওই অন্ধকারে একা যেতে পারে না। মেয়েকে কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। তাতে রাজি না হওয়ায় ঠেলে ফেলে দেওয়া হয়েছে। এটা নিছক জলাশয়ে পড়ে যাওয়ার ঘটনা নয়।’
গত ১১ সেপ্টেম্বর, বৃহস্পতিবার রাতে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ৪ নম্বর গেটের অদূরে ঝিলপাড় থেকে উদ্ধার করা হয় ইংরেজি তৃতীয় বর্ষের ছাত্রী অনামিকাকে। সঙ্গে সঙ্গে নিয়ে যাওয়া হয় হাসপাতালে। চিকিৎসকেরা জানান, আগেই মৃত্যু হয়েছে।
ময়নাতদন্তে উঠে এসেছে, মৃত্যুর কারণ জলেই ডুবে যাওয়া। কিন্তু প্রশ্ন রয়ে গিয়েছে—এক জন শিক্ষিত, সুস্থ, সচেতন ছাত্রী হঠাৎ করে রাতে ক্যাম্পাসের অন্ধকার এলাকায় একা গেলেন কেন? কেউ কি সঙ্গে ছিল? কেউ কি তাঁকে ডেকে নিয়ে গেল?
পুলিশের তরফে জানানো হয়েছে, ৪ নম্বর গেটের সামনে ৩টি সিসিটিভি ক্যামেরা রয়েছে। সে ক্যামেরায় অনামিকার গতিবিধি আংশিক ধরা পড়েছে বটে, কিন্তু ঘটনাস্থলের কাছাকাছি কোননো ক্যামেরা না থাকায় মূল মুহূর্তের কোনো দৃশ্য ফুটেজে নেই। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, যতটা সম্ভব ফুটেজ পুলিশের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। তবে ঘটনার আসল জায়গার কোনো ভিডিও প্রমাণ এখনো মেলেনি। এদিকে, খুনের অভিযোগ দায়ের হতেই হোমিসাইড শাখার তদন্তকারী কর্মকর্তারা মাঠে নেমেছেন। ইতিমধ্যেই ৪ জন পড়ুয়াকে জেরা করা হয়েছে। তদন্তকারী অফিসারদের কাছে সন্দেহের তালিকায় রয়েছেন মোট ৭ পড়ুয়া। তাঁদের মধ্যে তিন জনের বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে। যাদবপুর থানা জানিয়েছে, ঘটনার দিন রাতে অনামিকার সঙ্গে শেষ মুহূর্তে কারা ছিলেন, তাদের পরিচয় চিহ্নিত করতে কাজ শুরু হয়েছে। বন্ধুবান্ধব, সহপাঠীদের সঙ্গে কথা বলেই তৈরি হচ্ছে তালিকা। ক্যাম্পাসের সে সময়কার উপস্থিতি ও গতিবিধি খতিয়ে দেখা হচ্ছে একাধিক দিক থেকে।
ছাত্রীর মৃত্যুর পর প্রশ্নের মুখে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা। জলাশয়ের ধারে কোনো ফেন্সিং নেই, ক্যাম্পাসের ভিতরে অন্ধকার, নিরাপত্তারক্ষীর অভাব, বর্তমান ছাত্রছাত্রীর অভিযোগের তালিকা দীর্ঘ। বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য অমিতাভ দত্ত জানান, ক্যাম্পাসে অনুষ্ঠান পরিচালনার জন্য নতুন করে একটি নিয়মবিধি প্রণয়ন কমিটি তৈরি হচ্ছে। বাড়ানো হবে নিরাপত্তারক্ষীর সংখ্যা, বসানো হবে আরো সিসিটিভি, আর প্রতিটি জলাশয়ের চারপাশে লাগানো হবে ফেন্সিং। পাশাপাশি পড়ুয়াদের মানসিক সুস্থতার জন্য চালু হবে মেন্টরশিপ প্রোগ্রাম, যেখানে প্রতি ২৫ জন পড়ুয়ার জন্য থাকবেন এক জন মেন্টর। নতুন করে জারি হয়েছে মাদক নিষিদ্ধ নির্দেশিকাও। যদিও পড়ুয়ায়াদের একাংশের অভিযোগ, এমন নির্দেশিকা ২ বছর আগেও জারি হয়েছিল। কিন্তু বাস্তব প্রয়োগে যে ঘাটতি ছিল, তা মানছেন সহ-উপাচার্যও। তাঁর কথায়, ‘শুধু নিয়ম জারি করলেই হবে না, তার প্রয়োগও নিশ্চিত করতে হবে।’ সন্ধ্যার পরে ক্যাম্পাসে নজরদারি বাড়াতে তৈরি হচ্ছে পৃথক টিম। বহিরাগতদের প্রবেশ এবং সন্দেহজনক গাড়ি চলাচলের উপরও থাকবে কড়া নজর।
তদন্তে উঠে আসা প্রতিটি সূত্র খুঁটিয়ে খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলেই জানাচ্ছেন পুলিশ আধিকারিকেরা। ভিসেরা রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। দেখা হচ্ছে, শরীরে কোনও মাদক বা অ্যালকোহলের প্রভাব ছিল কি না। ঘটনার গুরুত্ব বুঝে রাজ্য পুলিশের গোয়েন্দা প্রধান রূপেশ কুমার জানিয়েছেন, ‘ঘটনার তদন্তে কলকাতা পুলিশের হোমিসাইড শাখাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। যা যা পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, সবই করা হবে।’ নামজাদা ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসের ভিতরে মৃত্যু, খুনের অভিযোগ, তদন্তে হোমিসাইড, ভেঙে পড়া পরিবার, সব মিলিয়ে গোটা রাজ্যের চোখ এখন যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকেই। প্রশ্ন একটাই—এবার সত্যিটা সামনে আসবে তো!
❤ Support Us








