- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ৯, ২০২৬
দু-সপ্তাহের কারাবাস, অবশেষে মুক্ত ‘স্যাফ্রন কিংডম-এর কাশ্মীরি পরিচালক আরফাত
কাশ্মীরের মানুষের পরিচয়, স্মৃতি আর অধিকার নিয়ে ছবি তৈরি করেছিলেন তিনি। সে ছবিই তাঁকে এনে দিয়েছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অথচ আমেরিকার মাটিতেই অভিবাসন সংক্রান্ত জটিলতায় আটক থাকতে হলো কাশ্মীরি চলচ্চিত্র পরিচালক আরফাত শেখকে। প্রায় দু–সপ্তাহ বন্দিজীবন কাটানোর পরে অবশেষে মুক্তি পেলেন ‘স্যাফ্রন কিংডম’-এর পরিচালক। বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। তবে মুক্তি মিললেও আপাতত সম্পূর্ণ স্বস্তি নয়। আরফাতের বিরুদ্ধে নির্বাসন সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়া এখনো চলছে। আগামী ২৭ অক্টোবর ফের শুনানিতে হাজির হতে হবে তাঁকে।
৪২ বছরের আরফাতকে গত ২৪ সেপ্টেম্বর আটক করেছিল আমেরিকার অভিবাসন ও শুল্ক প্রয়োগকারী সংস্থা (আইসিই)। ক্যালিফোর্নিয়ার সান ফ্রান্সিসকো থেকে ওয়াশিংটন ডিসি যাওয়ার পথে ডালেস আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এ ঘটনা ঘটে। তাঁর পরিবার ও বন্ধুদের উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি প্রচারাভিযানের দাবি, ৬ অক্টোবর সকালে আরফাতের জামিন মঞ্জুর হয়েছিল। কিন্তু তার পরেও তাঁকে মুক্তি দেওয়া হয়নি। ভার্জিনিয়ার বোলিং গ্রিনের ক্যারোলিন আটককেন্দ্রে আরও প্রায় ৪৮ ঘণ্টা কাটাতে হয় তাঁকে। জামিনের টাকা জমা দেওয়ার অনলাইন ব্যবস্থায় যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই মুক্তি পেতে দেরি হয়েছিল বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্ট প্রচারাভিযানের। শুক্রবার, ৯ অক্টোবর আরফাতের পরিবারের এক সদস্য জানান, বৃহস্পতিবার তাঁকে মুক্তি দিয়েছে আইসিই। সংবাদ সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনেও জামিনে মুক্তির খবর জানানো হয়েছে। তবে জামিনে মুক্তি পাওয়ার অর্থ যে অভিবাসন সংক্রান্ত মামলা থেকে অব্যাহতি পাওয়া নয়, তা স্পষ্ট। আরফাতের আমেরিকায় থাকার অধিকার নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে আইনি টানাপড়েন এখনো অব্যাহত।
আরফাতের জন্ম জম্মু ও কাশ্মীরে। তিনি কাশ্মীরের জনপ্রিয় গায়ক গুলাম নবি শেখের পুত্র। চলচ্চিত্র নিয়ে উচ্চশিক্ষার জন্য ২০১৯ সালে ছাত্র ভিসায় আমেরিকায় যান তিনি। জর্জিয়া স্টেট বিশ্ববিদ্যালয়ে চলচ্চিত্র বিষয়ে স্নাতকোত্তর পড়াশোনা করেন। ২০২০ সালে আশ্রয়ের আবেদন করেন আরফাত। বর্তমানে ভার্জিনিয়ার আলেকজ়ান্দ্রিয়ায় থাকেন তিনি। আরফাতের পরিবার ও বন্ধুদের দাবি, তাঁর অভিবাসন সংক্রান্ত আবেদন এখনো বিচারাধীন। আমেরিকায় বসবাস ও কাজ করার বৈধ অনুমতিও রয়েছে তাঁর। কিন্তু সে দাবির সঙ্গে সহমত নয় আমেরিকার স্বরাষ্ট্র দফতর (ডিএইচএস)। দফতরের বক্তব্য, আরফাত সাময়িক ভাবে বৈধ অনুমতি নিয়ে আমেরিকায় প্রবেশ করলেও অনুমোদিত সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরেও সেখানে থেকে গিয়েছেন। অভিবাসন সংক্রান্ত কোনো আবেদন বিচারাধীন থাকলেই যে আমেরিকায় বৈধ অভিবাসন-পরিচিতি পাওয়া যায়, তা নয় বলেও জানিয়েছে প্রশাসন। একই সঙ্গে আরফাতকে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার সুযোগ দেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, আরফাতের মুক্তি নিয়ে পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে স্বস্তি ফিরলেও তাঁর ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত। এক দিকে আশ্রয়ের আবেদন ও আমেরিকায় বসবাসের অনুমতি নিয়ে তাঁর সমর্থকদের দাবি, অন্যদিকে অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে প্রশাসনের অবস্থান — দুইয়ের টানাপড়েনেই আপাতত আটকে রয়েছে পরিচালকের ভবিষ্যৎ। ঘটনার দিন আরফাতের সঙ্গে ছিলেন চলচ্চিত্র পরিচালক তারা দোরাবজি। সান ফ্রান্সিসকো থেকে ডালেসে পৌঁছে বিমান থেকে নামার পরেই আরফাতকে আটক করা হয় বলে জানিয়েছেন তিনি। ওয়াশিংটন ডিসির ‘বাসবয়েজ অ্যান্ড পোয়েটস’ নামের একটি সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে ‘আর্ট অ্যাজ় রেজ়িস্ট্যান্স’ অনুষ্ঠানে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তাঁরা। শিল্প ও সংস্কৃতির মাধ্যমে প্রতিবাদ, প্রতিরোধ এবং মানুষের অধিকারের কথা তুলে ধরাই ছিল ওই আয়োজনের উদ্দেশ্য।
আরফাতকে আটকের মুহূর্তের বিবরণ দিতে গিয়ে দোরাবজি জানিয়েছেন, বিমান থেকে নামার পরে প্রথমে তিনি বুঝতেই পারেননি যে আরফাতকে আলাদা করে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পরে আরফাত তাঁকে ডাকেন। পিছন ফিরে তিনি দেখেন, কয়েক জন ব্যক্তি তাঁকে ঘিরে রয়েছেন। দোরাবজির দাবি, ওই ব্যক্তিরা সাধারণ পোশাকে ছিলেন। তাঁদের দেখে সরকারের আধিকারিক বলে চেনার উপায় ছিল না। গোটা ঘটনার সময়ে কাউকে গ্রেফতারি পরোয়ানা দেখাতেও দেখেননি তিনি। কেন আরফাতকে আটক করা হচ্ছে, তা-ও তাঁকে জানানো হয়নি বলে অভিযোগ দোরাবজির। এর পর আরফাতকে বিমানের সিঁড়ি থেকে নামিয়ে রানওয়ের দিকে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে, আরফাতের বন্ধুদের কাছে এ আটক শুধু অভিবাসন সংক্রান্ত একটি ঘটনা নয়। তাঁদের বক্তব্য, যে শিল্পী নিজের মানুষের ইতিহাস, পরিচয় এবং অধিকার নিয়ে ছবি তৈরি করেন, তাঁকেই আমেরিকায় আটক হতে হলো। আরফাতের কাজের সঙ্গে তাঁর রাজনৈতিক ও সামাজিক অবস্থানের সম্পর্ক রয়েছে বলেও মনে করেন তাঁরা। যদিও আটকের কারণ নিয়ে প্রশাসনের বক্তব্য আলাদা। ‘ডিএইচএস’-এর দাবি, ঘটনাটি অভিবাসন আইন সংক্রান্ত; আরফাতের চলচ্চিত্র বা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
আরফাতের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবি ‘স্যাফ্রন কিংডম’ মুক্তি পেয়েছিল ২০২৪ সালে। ছবিটি আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন জায়গায় প্রদর্শিত হয়েছে। একাধিক চলচ্চিত্র উৎসব ও পুরস্কার মঞ্চে স্বীকৃতিও পেয়েছে। শিকাগো ফিল্মমেকার্স অ্যাওয়ার্ডস, এলএ ফিল্ম অ্যান্ড ডকুমেন্টারি অ্যাওয়ার্ডস, মেলবোর্ন ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল, ওয়েক ফরেস্ট ফিল্ম ফেস্টিভ্যাল এবং আনাতোলিয়ান ইন্টারন্যাশনাল ফিল্ম অ্যাওয়ার্ডসের মতো মঞ্চে সেরা পূর্ণদৈর্ঘ্যের ছবির সম্মান পেয়েছে এই ছবি বলে জানিয়েছে তাঁর সমর্থকেরা। ছবিটির বিষয়বস্তু নিয়েও আলাদা করে আলোচনা হয়েছে। আরফাতের কাজের মধ্য দিয়ে পরিচয়, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে টিকে থাকা আর ন্যায়বিচারের প্রশ্ন উঠে আসে বলে দাবি তাঁর বন্ধু ও সমর্থকদের। তাঁদের মতে, ‘স্যাফ্রন কিংডম’ কেবল একটি চলচ্চিত্র নয়, কাশ্মীরের মানুষের অভিজ্ঞতা ও স্মৃতিকে ধরে রাখার অনন্য এক প্রয়াস। যে ইতিহাস অনেক সময়ে রাজনৈতিক বিতর্কের আড়ালে চাপা পড়ে যায়, তাকে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও শিল্পের ভাষায় সামনে আনাই ছিল পরিচালকের উদ্দেশ্য।
আরফাতের এক বন্ধু জানিয়েছেন, নিজের মানুষের কথা বলা এবং মানবাধিকার রক্ষার প্রশ্নে তিনি বরাবরই দৃঢ়। তাঁর কথায়, সত্য কথা বলা, মানবাধিকার রক্ষার জন্যই আরফাত নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন। আমার পরিচিত মানুষদের মধ্যে তিনি অন্যতম সদয় ও সাহসী ব্যক্তি। ‘স্যাফ্রন কিংডম’ তৈরি করে তিনি তাঁর জনগোষ্ঠীর ইতিহাস, স্মৃতি ও সত্যকে তুলে ধরতে চেয়েছেন।’ এ ঘটনার প্রেক্ষাপটেই আমেরিকার অভিবাসন নীতি নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান নিয়েছে। দেশে অবৈধ ভাবে থেকে যাওয়া বিদেশি নাগরিকদের শনাক্ত করা এবং নির্বাসনের উদ্যোগ বাড়ানোর কথা বার বার জানিয়েছে হোয়াটস হাউস।গত আগস্টে প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছিল, স্বল্পমেয়াদি ভিসায় আমেরিকায় প্রবেশ করে পরে আশ্রয়ের আবেদন জানিয়ে সেখানে থেকে যেতে চাওয়া বিদেশি নাগরিকদের ভিসা শনাক্ত করে বাতিল করার বিষয়ে কাজ চলছে।
মার্কিন প্রশাসনের এ অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন মানবাধিকারকর্মীরা। তাঁদের আশঙ্কা, অভিবাসন আইন প্রয়োগের নামে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ার অধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে বৈষম্যের মতো প্রশ্নগুলি উপেক্ষিত হতে পারে। তবে আরফাতের ক্ষেত্রে প্রশাসনের বক্তব্য, তিনি অনুমোদিত সময়সীমার বাইরে আমেরিকায় ছিলেন, আর সে কারণেই তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ফলে আপাতত আটককেন্দ্র থেকে মুক্তি পেলেও আরফাতের লড়াই শেষ হয়নি। আগামী ২৭ অক্টোবরের শুনানিতে তাঁর অভিবাসন সংক্রান্ত মামলার পরবর্তী গতিপথ স্পষ্ট হতে পারে। তার আগে পর্যন্ত তাঁকে ঘিরে থেকে যাচ্ছে সবচেয়ে বড়ো প্রশ্ন — আমেরিকায় তাঁর ভবিষ্যৎ কী হবে? আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মঞ্চে স্বীকৃতি পাওয়া কাশ্মীরি এই পরিচালকের ভাগ্য এখন অনেকটাই নির্ভর করছে অভিবাসন সংক্রান্ত আইনি প্রক্রিয়ার উপর।
❤ Support Us







