- দে । শ
- মার্চ ৫, ২০২৬
কাজিরাঙায় অন্য ‘যুদ্ধ’, শিকারিদের বিরুদ্ধে জিতছে গণ্ডার
শূন্যে নেমেছে শিকার, বেড়েছে গণ্ডারের সংখ্যা। তৎপর ২৫৩ অ্যান্টি-পোচিং ক্যাম্প, নজরদারিতে ড্রোন, ‘ভ্যান দুর্গা’ বাহিনী
এক হাতে আধুনিক রাইফেল, অন্য হাতে টর্চ। গভীর রাতে জঙ্গলের ভেতর টহল দিচ্ছেন অমৃত হালদার। বয়স মাত্র ২৮। অসম স্টেট রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের এই কনস্টেবল কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের এক বিশেষ দলে রয়েছেন—যাদের একমাত্র দায়িত্ব, শিকারিদের হাত থেকে একশৃঙ্গ গণ্ডারদের রক্ষা করা। অমৃত জানিয়েছেন, ‘চোরাশিকারিদের ক্ষেত্রে আমাদের স্পষ্ট নির্দেশ রয়েছে— দেখামাত্র গুলি। এখনো পর্যন্ত সরাসরি এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি। তবে অস্ত্র হাতে কাউকে দেখলে গুলি চালানোর নির্দেশ রয়েছে।’
২০২৩ সালে অসম সরকারের উদ্যোগে গড়ে ওঠে এই বিশেষ ফ্রন্টলাইন বাহিনী। তার পর থেকেই কাজিরাঙা জুড়ে কড়া নজরদারি শুরু হয়। ফলও মিলেছে হাতেনাতে। ২০২৫ সালে কাজিরাঙায় গণ্ডার শিকার শূন্যে নেমে এসেছে।
অভয়ারণ্য কর্তৃপক্ষের দাবি, এ সাফল্যের পিছনে রয়েছে কড়া আইন প্রয়োগ, আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এবং মাঠপর্যায়ের লাগাতার নজরদারি। বর্তমানে কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানে প্রতি ৫ বর্গকিলোমিটার অন্তর স্থাপন করা হয়েছে নজরদারি শিবির। মোট ২৫৩টি অ্যান্টি-পোচিং ক্যাম্প থেকে দিনরাত পাহারা দিচ্ছেন বনকর্মী ও নিরাপত্তা বাহিনী। তবে বিপদ কেবল শিকারিদের কাছ থেকেই আসে না। মাঝে মধ্যেই হঠাৎ আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে গণ্ডার। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতেই গণ্ডারের আক্রমণে এক বনকর্মীর মৃত্যু হয়েছে, আহত হয়েছেন আরও একজন। অমৃত বলছেন, ‘কখনো কখনো গণ্ডার তেড়ে এলে ফাঁকা গুলি চালাতে হয়। তাতে সাধারণত প্রাণীটি সরে যায়।’
বিশ্বের একশৃঙ্গ গণ্ডারের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭০ শতাংশই রয়েছে ভারতে। তার বড়ো অংশের বাস কাজিরাঙায়। তবে সংখ্যাবৃদ্ধির এ সাফল্যের আড়ালেই দীর্ঘদিন ধরে ছিল শিকারের ভয়াবহ সমস্যা। একসময় প্রায় নিয়মিতই উদ্ধার হতো মৃত গণ্ডারের শিংবিহীন দেহ। ২০১৩ সালে অন্তত ৩৮টি গণ্ডার শিকারিদের হাতে মারা পড়ে। তার আগের বছর সংখ্যাটি ছিল প্রায় ১১। কাজিরাঙা জাতীয় উদ্যানের পরিচালক সোনালি ঘোষ বলেন, ‘একসময় কাজিরাঙার কথা উঠলেই শিকারের প্রসঙ্গ সামনে আসত। এখন টানা ২ বছর শিকার শূন্য। গণ্ডারের সংখ্যা বাড়ছে। ফলে আমরা এখন নতুন করে গণ্ডারকে অন্য এলাকাতেও ছড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা করছি।’
কীভাবে বদলে বদলে গেল পরিস্থিতি ? প্রায় এক দশক আগেই পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে। রাজ্য সরকার ‘শুট-অ্যাট-সাইট’ বা দেখামাত্র গুলি করার নির্দেশ আরও কঠোরভাবে কার্যকর করে। পাশাপাশি গড়ে ওঠে বিশেষ টাস্ক ফোর্স, বাড়ানো হয় অ্যান্টি-পোচিং ক্যাম্পের সংখ্যা, শুরু হয় ড্রোন নজরদারি। ২০১৫ সালে গুলিতে নিহত হয় ২০ জন সন্দেহভাজন শিকারি। সংখ্যাটি সে বছরের নিহত গণ্ডারের সংখ্যাকেও ছাড়িয়ে যায়। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে ‘সংরক্ষণের সামরিকীকরণ’ নিয়ে সমালোচনাও ওঠে। কিন্তু কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট, অসমের কাছে গণ্ডার ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা দেশের কাছে তাজমহল। সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, গত ৫ বছরে কাজিরাঙায় মাত্র ৫টি শিকারের ঘটনা ঘটেছে। ২০২২ এবং ২০২৫ সালে একটিও শিকার হয়নি। ২০০৯ সালে যেখানে গণ্ডারের সংখ্যা ছিল ২,০৪৮, ২০২২ সালের গণনায় তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২,৬১৩। অসম কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি সায়েন্স কলেজের অধ্যাপক ও পদ্মশ্রীপ্রাপ্ত চিকিৎসক ড. কে কে শর্মা বলেন, ‘৫–১০টি গণ্ডার থেকে আজ অসমে ৩ হাজারের বেশি হয়েছে। বহু প্রাণী স্বাভাবিক মৃত্যুও বরণ করেছে। তবু সংখ্যা বেড়েছে। এতে সংরক্ষণের শক্তিই প্রমাণিত হয়।’
সংরক্ষণের সাফল্যের প্রভাব পড়েছে পর্যটনেও। গত দশ বছরে কাজিরাঙায় পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় ২০৫ শতাংশ। ২০১৪ সালে যেখানে দর্শনার্থীর সংখ্যা ছিল প্রায় ১.৩১ লক্ষ, ২০২৫ সালে তা ছাড়িয়েছে ৪ লক্ষ। গত বছর বিদেশি পর্যটকের সংখ্যাও ছিল সর্বাধিক—প্রায় ৬,৭০০। জিপ সাফারি চালক দেবজিতের জানিয়েছেন, ‘এখানে বাঘও আছে প্রায় ১৪০টি। কিন্তু পর্যটকেরা গণ্ডার দেখতেই বেশি আগ্রহী।’ কাজিরাঙা এখন দেশের কাছে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারিরও উদাহরণ। ড্রোন নজরদারি, ওয়্যারলেস যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং জিপিএস-ভিত্তিক এম-স্ট্রাইপস প্রযুক্তি ব্যবহার করে বনকর্মীরা টহল ও নজরদারি চালান। সোনালি ঘোষ জানান, ‘প্রযুক্তির সাহায্যে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলির উপর নজর রাখা যায়, টহলদারি সমন্বয় করা যায় এবং দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়। ফলে শিকার অনেকটাই কমেছে।’
প্রসঙ্গত, কালোবাজারে গণ্ডারের শিংয়ের দাম এক কোটি টাকারও বেশি। এই চাহিদা কমাতেই ২০২১ সালে ‘বিশ্ব গণ্ডার দিবস’-এ বোকাখাতে এক অনুষ্ঠানে ২,৪০০-রও বেশি গণ্ডারের শিং পুড়িয়ে দেয় অসম বন দফতর। অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তখন বলেন, ‘গণ্ডারের শিংয়ের ঔষধি গুণ আছে, এই ধারণা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত।’ তবে, শিকার কমলেও নতুন সমস্যা দেখা দিচ্ছে —মানুষ ও বন্যপ্রাণীর সংঘাত। বিশেষ করে বর্ষাকালে ব্রহ্মপুত্রের বন্যায় জঙ্গল প্লাবিত হলে গণ্ডার, হাতি ও বাঘকে জাতীয় সড়ক পার হয়ে কার্বি আংলং পাহাড়ের দিকে যেতে হয়। সে সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। এ পরিস্থিতি সামলাতে তৈরি হয়েছে এক বিশেষ নারী বাহিনী—‘ভ্যান দুর্গা’। ২০২৩ সালে নিয়োগ পাওয়া ২,৫০০ বনরক্ষীর মধ্যে প্রায় ৩০০ জন নারী। তাঁদের মধ্য থেকেই গড়ে উঠেছে এই বিশেষ দল। কর্মী করিশ্মা গগৈ বলেন, ‘সংঘাত হলে প্রথমে ফাঁকা গুলি চালিয়ে প্রাণীটিকে রাস্তা থেকে সরানোর চেষ্টা করি। তারপর রেঞ্জারদের খবর দিই।’
মানুষ-প্রাণী সংঘাত কমাতে কেন্দ্র ও রাজ্য সরকার শুরু করেছে প্রায় ৬,৯৫০ কোটি টাকার ‘কাজিরাঙা এলিভেটেড করিডর’ প্রকল্প। জাতীয় সড়ক-৭১৫-এর প্রায় ৩৫ কিলোমিটার অংশকে এমনভাবে নির্মাণ করা হবে যাতে প্রাণীরা নিরাপদে সড়কের নীচ দিয়ে যাতায়াত করতে পারে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সম্প্রতি এই প্রকল্পের শিল্যান্যাস করেছেন। সাফল্য এসেছে, তবে বনকর্তাদের মতে, সাফল্যের মধ্যেও আত্মতুষ্টির কোনও জায়গা নেই। যতদিন কালোবাজারে গণ্ডারের শিংয়ের চাহিদা থাকবে, ততদিন বিপদও থাকবে। বনকর্তারা বলছেন, ‘শিকার সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে, এমনটা বলা যাবে না। তাই সর্বক্ষণ সতর্ক থাকতে হবে। লাগাতার নজরদারিই একমাত্র উপায়।’ তাই, বলাই যায়, কাজিরাঙার বিস্তীর্ণ ঘাসজমিতে এখন শান্তভাবে চরছে একশৃঙ্গ গণ্ডার। পর্যটকদের ক্যামেরার ঝলকানিতে ধরা পড়ছে তাদের দৈনন্দিন জীবন। কিন্তু সেই শান্ত দৃশ্যের আড়ালে চলছে এক নিরন্তর লড়াই, প্রকৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।
❤ Support Us





