- এই মুহূর্তে দে । শ
- নভেম্বর ৩, ২০২৫
২২ জানুয়ারি থেকে শুরু কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা। এবারের থিম কান্ট্রি আর্জেন্টিনা, অনিশ্চিত বাংলাদেশের অংশগ্রহণ। অন্যদিকে, কলেজস্ট্রিটে চলছে ‘ভিজে বইমেলা’
সারাবছর রাজ্যের বইপ্রেমিরা,কবি-সাহিত্যিক, প্রকাশক, লিটল ম্যাগাজিনগুলি অপেক্ষায় থাকেন কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলার। শীতের আমেজের সাথে মিশে যায় বাঙালির চিরন্তন ঐহিত্য আর আবেগের উষ্ণ বাতাস। ফিরে ফিরে আসে স্মৃতির ছাপ, বর্তমানের জেদ আর ভবিষ্যতের অমোঘ সম্ভাবনা। সেই তীব্র আকাঙ্ক্ষা নির্মাণের প্রাথমিক পরিকল্পনা ঘোষিত হলো আজ। ২২ জানুয়ারি থেকে সল্টলেক করুণাময়ী বইমেলা প্রাঙ্গণে শুরু হচ্ছে ৪৯তম আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলা। এবারের বইমেলার ফোকাল ‘থিম কান্ট্রি’ আর্জেন্টিনা — মারাদোনা-মেসির দেশ। মেলা চলবে ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত।
সোমবার শহরের এক পাঁচতারা হোটেলে সাংবাদিক সম্মেলনে বইমেলার উদ্যোক্তা, পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সভাপতি সুধাংশুশেখর দে ও সাধারণ সম্পাদক ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায় উপস্থিত ছিলেন। তাঁরা জানান, গতবারের বইমেলায় ১ হাজারের বেশি প্রকাশক ও লিটল ম্যাগাজিন অংশ নিয়েছিলেন, ২৭ লক্ষ পাঠকের সমাগমে উদ্বেলিত হয়েছিল বইমেলা প্রাঙ্গন। বই বিক্রির পরিমাণ ছিল ২৩ কোটি টাকা। এবারের বইমেলায় বইপ্রেমীদের সংখ্যা আরো বাড়বে বলে আশাবাদী উদ্যোক্তারা। প্রথা মতোই ২২ জানুয়ারি ৪৯তম কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা উদ্বোধন করবেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। উপস্থিত থাকবেন দেশ-বিদেশের সম্মানীয় অতিথিরা।
এই বছর আর্জেন্টিনার পাশাপাশি গ্রেট ব্রিটেন, আমেরিকা, জার্মানি, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্স, স্পেন, পেরু, কলোম্বিয়া, জাপান ও থাইল্যান্ডসহ মোট ২৯টি দেশ অংশ নিচ্ছে। তবে আগে নিজস্ব প্যাভেলিয়ন থাকলেও, এবারেও বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অনিশ্চিত। প্রশ্নোত্তর পর্বে বাংলাদেশের প্রসঙ্গ উঠতেই, কিছুটা অস্বস্তিতে পড়েন গিল্ড কর্মকর্তারা। ত্রিদিবকুমার বলেন, আমাদের আপত্তি কিছু নেই, কিন্তু অংশগ্রহণ করতে চাইলে বাংলাদেশের প্রকাশকদের দিল্লি হয়ে আসতে হবে, অর্থাৎ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রকের অনুমতি মিললে তবেই অংশ নিতে পারবেন তাঁরা। এ প্রসঙ্গে ২০২৪ সালে পরশি দেশের রাজনৈতিক পালাবদলের পর, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের ক্ষেত্রে প্রতিকূল অবস্থার কথা উঠে এসেছে গিল্ড কর্তার মুখে। তবে তিনি আশাবাদী এবারে না হলেও, ভবিষ্যতে আবার বাংলাদেশ ফিরবে কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা প্রাঙ্গনে। উল্লেখ্য, নির্বাচনী আবহে বাংলাদেশের ‘অমর একুশে বইমেলা ২০২৬’-এর দিনক্ষণ নিয়েও এখনো অনিশ্চয়তা রয়েছে। ঢাকার বাংলা একাডেমি–র এক তথ্য অনুযায়ী মেলার নতুন সময়সুচি ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি ২০২৬ রূপে নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়‑দপ্তর থেকে নির্দেশ আসে যে, জাতীয় নির্বাচনের প্রেক্ষিতে মেলাটি নির্বাচন পরবর্তী সময়ে আয়োজন করা হোক— ফলে সেই নির্ধারিত তারিখ স্থগিত করা হয়। তবে প্রকাশক ও পত্রিকাগুলোও সরকারের কাছে অনুরোধ জানিয়েছেন মেলার দিনসূচি ৪ নভেম্বরের মধ্যে ঘোষণা করার জন্য। এখনো সে সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে আসে নি।
এদিন, আন্দ্রেই সেবাস্তিয়ান রোজাস, আর্জেন্টিনার ভারতীয় দূতাবাসের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিভাগের প্রধান, সাংবাদিকদের জানান, ‘আমরা আন্দতিত। আর্জেন্টিনার সংস্কৃতি তুলে ধরবার বিষয়ে আমরা আগ্রহী। কলকাতা-আর্জেন্টিনা সম্পর্কের ঐতিহ্য দীর্ঘ। রবীন্দ্রনাথ আর্জেন্টিনা গিয়েছিলেন, মারাদোনা এসেছিলেন, এবার লিওনেল মেসিও আসছেন। সামান্য উদাহরণ হলেও সম্পর্ক এভাবেই এগিয়ে চলুক।’ দেশীয় প্রকাশক হিসেবে উত্তরপ্রদেশ, কর্নাটক, ওডিশা, মহারাষ্ট্র, পাঞ্জাব, হরিয়ানা, মধ্যপ্রদেশের প্রকাশকরাও বইমেলায় অংশ নিচ্ছেন। থাকছে লিটল ম্যাগাজিন প্যাভিলিয়ন ও চিলড্রেনস প্যাভিলিয়ন। থাকছে ১ হাজার বুকস্টল ও লিটল ম্যাগাজিন টেবিল।
ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যস্ততার পাশাপাশি ২৪ ও ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে কলকাতা লিটরেচার ফেস্টিভ্যাল বা কেএলএফ-২০২৬। এ উৎসবের সঙ্গে বইমেলাকে সংযুক্ত করে আরও সমৃদ্ধ করা হবে বলে জানিয়েছেন ত্রিদিববাবু। উদ্যোক্তারা ইতিমধ্যেই ২০২৭ সালের আন্তর্জাতিক কলকাতা বইমেলার সুবর্ণজয়ন্তীর প্রস্তুতি শুরু করেছেন। তখন বইমেলার ৫০ বছর পূর্তি উদযাপন করা হবে। পরিকল্পনা রয়েছে, ১৯৭৬ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত কলকাতা ময়দানে অনুষ্ঠিত প্রথম ২০ বছরের বইমেলার দুর্লভ ফটোগ্রাফির একটি প্রদর্শনী ও প্রতিযোগিতা। গতবছরের বইমেলা শুরু হয়েছিল ২৮ জানুয়ারি, কিন্তু এবারে দিনগুলো সামান্য এগিয়ে আনা হয়েছে। পাবলিশার্স অ্যান্ড বুকসেলার্স গিল্ডের সাধারণ সম্পাদক সুধাংশু শেখর দে বলেছিলেন, ‘এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে মাধ্যমিক পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। তাই আমরা বইমেলার দিন সামান্য এগিয়ে এনেছি। তবে মেলায় কিছু ছুটির দিনও থাকবে। মেট্রোর মাধ্যমে আরও মানুষকে আসতে উৎসাহিত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
অন্যদিকে, বৃষ্টিভেজা বইয়ে নতুন প্রাণ দিতে কলেজ স্ট্রিটে ‘ভিজে বইয়ের বইমেলা’ চলছে। সোমবার সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত বঙ্কিম চ্যাটার্জি স্ট্রিটে চলছে মেলা। আয়োজক কলকাতা ক্রিয়েটিভ পাবলিশার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন। সহযোগিতায় স্বনির্ভর এবং দিল্লি বেঙ্গল অ্যাসোসিয়েশন। রোদে শুকিয়ে তোলা বই বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৮০ শতাংশ ছাড়ে। অংশ নিয়েছেন কলেজ স্ট্রিটের ২৫ জন প্রকাশক। সংগঠনের সভাপতি, প্রকাশক মারুফ হোসেন বলেন, ‘এক রাতের জল বইপাড়ার জীবনটাই থামিয়ে দিয়েছিল। তবু পাঠকের ভালোবাসা আমাদের ফের দাঁড় করিয়েছে। এই মেলা সেই ভালোবাসারই প্রতীক। এই ধরনের মেলা কলকাতা আগে দেখেনি। সমাজমাধ্যমে ডুবে থাকা এই প্রজন্ম আজ বই হাতে নিচ্ছে, পাতায় পাতায় বৃষ্টির গন্ধ নিচ্ছে— এটাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।’ তিনি জানান, ক্রাউডফান্ডিংয়ের মাধ্যমে চার লক্ষ টাকা তোলা হয়েছিল। সোমবার দুপুরে ৬৫ জন ক্ষতিগ্রস্ত প্রকাশক, বই বিক্রেতা এবং মুদ্রণ সহযোগী সংস্থাকে সেই অর্থের সহায়তা চেক তুলে দেওয়া হয়। বেলা গড়াতেই বইপাড়ায় নেমেছে পাঠকের ঢল। একের পর এক স্টলে ভিড়। টিনটিন, ফেলুদা, কাকাবাবু থেকে শার্লক হোমস— সবই আছে। তবে অনেক বইয়ের পাতায় এখনো বৃষ্টির ছাপ। কোথাও পাতাগুলি একে অপরের সঙ্গে লেগে আছে, কোথাও আবার কালি ছড়িয়ে মলিন হয়ে গেছে প্রচ্ছদ। তবু পাঠকের আগ্রহে ভাঁটা নেই। এ মেলা শেষ হওয়ার পর ৭ এবং ৮ নভেম্বর ‘বেঁচে উঠুক বইপাড়া’ নামে একটি মঞ্চ আয়োজন করছে ‘বৃষ্টিভেজা বইয়ের হাট’। কলেজ স্কোয়ারের থিওজফিক্যাল সোসাইটিতে দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ভিজে যাওয়া বই নিয়ে মেলা হবে। মঞ্চের তরফে ঐত্রেয়ী সরকার জানান, ‘এখন আমাদের রেজিস্ট্রেশন পর্ব চলছে। শুধুমাত্র ভিজে যাওয়া বই নিয়েই আমরা মেলার আয়োজন করেছি। ৪০ থেকে ৮০ শতাংশ ছাড়ে ভিজে যাওয়া বই কেনা যাবে।’ এই ‘নয়া বইমেলা’ ও প্রকাশকদের পাশে দাঁড়ানোর প্রসঙ্গে গিল্ড কর্তাদের প্রশ্ন করা হলে তাঁরা জানান, ‘পুরো ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা নেই। প্রকাশকরা যোগাযোগ করলে নিশ্চয় গিল্ড এ বিষয়ে ভাববে।’ তবে তাঁরা সতর্ক করে দিয়েছেন, কলকাতা আন্তর্জাতিক বইমেলা প্রাঙ্গলে ‘ভিজে বইমেলা’ আয়োজন করা যাবে না।
❤ Support Us






