Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • এপ্রিল ২৫, ২০২৬

কুকি–নাগা সংঘর্ষে ফের অগ্নিগর্ভ মণিপুর। ‘পূর্ণমাত্রায় আত্মরক্ষা’-র হুঁশিয়ারি কুকি সংগঠনের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কুকি–নাগা সংঘর্ষে ফের অগ্নিগর্ভ মণিপুর। ‘পূর্ণমাত্রায় আত্মরক্ষা’-র হুঁশিয়ারি কুকি সংগঠনের

উখরুলে কুকি–নাগা গোষ্ঠীর নতুন করে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে ফের জ্বলছে মণিপুর। শুক্রবার ভোর থেকে শুরু হওয়া একাধিক সহিংস ঘটনায় অন্তত ৩ জনের মৃত্যু হয়েছে, জখম বহু। নিহতদের মধ্যে ২ জন কুকি সম্প্রদায়ভুক্ত এবং ১ জন তাংখুল নাগা বলে জানা গিয়েছে। উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে, ‘কুকি সিএসও ওয়ার্কিং কমিটি’ কঠোর ভাষায় জানিয়েছে, পরিস্থিতি আরও অবনতি হলে তারা ‘পূর্ণমাত্রার আত্মরক্ষা’-র পথে যেতে বাধ্য হবে। তাঁদের দাবি, কুকি-অধ্যুষিত একাধিক গ্রামে ধারাবাহিক হামলা কার্যত ‘যুদ্ধ ঘোষণার সমান’। একইসঙ্গে রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্র—উভয়কেই সম্ভাব্য পরিস্থিতির অবনতির জন্য সরাসরি দায়ী করেছে সংগঠনটি।

কমিটির তরফে জারি করা দীর্ঘ বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয়েছে, ২৪ এপ্রিল ভোর থেকেই উখরুল জেলার মুলাম, শংফেল, মংকোট চেপু, শাংকাই ও জালেনবুং সহ একাধিক গ্রামে পরিকল্পিত ও সমন্বিত হামলা চালানো হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, সিরারিখোং ও সিনাকেইথেল অঞ্চল থেকে একাধিক দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা। সবচেয়ে রক্তক্ষয়ী ঘটনা ঘটে মুলাম ও শংফেলের সংযোগকারী অঞ্চলে। ওই হামলায় ঘটনাস্থলেই দুই কুকি গ্রামরক্ষীর মৃত্যু হয় বলে জানানো হয়েছে। আহতদের সাহায্য করতে গিয়ে তাঁরা হামলার মুখে পড়েন বলে অভিযোগ। সংঘর্ষে অন্তত ৯ জন আহত হয়েছেন। পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে মুলাম গ্রামে অগ্নিসংযোগের ঘটনায়। অভিযোগ, সংঘর্ষের পর, ১৬ টি বাড়ি সম্পূর্ণ ভস্মীভূত করা হয়। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের তালিকা দীর্ঘ। স্থানীয়দের দাবি, পরিকল্পিতভাবে গ্রামকে লক্ষ্য করে ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে।  পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় গ্রামবাসীরা বাধ্য হয়ে লাইসেন্সপ্রাপ্ত অস্ত্র ব্যবহার করে আত্মরক্ষার চেষ্টা করেন বলে দাবি কুকি সংগঠনগুলির। তাঁদের পাল্টা গুলিতে এক নাগা হামলাকারীর মৃত্যু হয়েছে বলেও জানানো হয়েছে।

অন্যদিকে, নাগা সংগঠনগুলি কুকিদের সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, মুল্লাম গ্রামে তাংখুল নাগাদের তরফে কোনো আক্রমণ চালানো হয়নি। নাগা সংগঠনগুলির বক্তব্য, সিনাকেথেই এলাকায় আগের একটি হামলার পর থেকেই উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল এবং সেই পরিস্থিতিতে নিরাপত্তার কারণে নাগা গ্রামরক্ষীরা টহল দিচ্ছিলেন। অভিযোগ, সে সময়েই একদল  সশস্ত্র কুকি গোষ্ঠী হঠাৎ করে হামলা চালায়, সংঘর্ষে এক নাগা গ্রামরক্ষীর মৃত্যু হয়। এরপরেই পাল্টা সংঘর্ষ শুরু হয় বলে নাগা সংগঠনগুলির দাবি। সংঘর্ষের আবহে নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকার কথাও উঠে আসছে। কুকি সংগঠনের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ৪র্থ মহার রেজিমেন্টের দ্রুত হস্তক্ষেপে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠা থেকে রক্ষা পায়। পাশাপাশি বিএসএফ ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনী আহতদের উদ্ধার করে হাসপাতালে পাঠায়।

অন্যদিকে, পুলিশের দাবি ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া গোলাবারুদ নাকি রাজ্যের লুট হওয়া অস্ত্রাগারের সঙ্গে সম্পর্কিত, যা আরামবাই তেংগোলের সঙ্গে যুক্ত বলে অভিযোগ উঠেছে। এরই মধ্যে আরও একটি নতুন বিতর্ক সামনে এসেছে। সামাজিক মাধ্যমে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে, যেখানে দাবি করা হচ্ছে, জাতীয় সড়কে দুই নাগাকে গুলি করে হত্যার প্রতিশোধ হিসেবে এনএসসিএন (আইএম) পাঁচ জন কুকি জঙ্গিকে অপহরণ ও হত্যা করেছে। তবে উখরুলের নাগা সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে এই ভিডিও ও বিবৃতি সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। তাদের দাবি, প্রচারিত ভিডিও ও ছবি সাম্প্রতিক সময়ের নয়, বরং পুরনো ঘটনার। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এলাকায় অশান্তি ছড়ানো এবং নাগাদের বিরুদ্ধে উস্কানি তৈরির জন্য এগুলো ভাইরাল করা হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

উভয় পক্ষের পাল্টা অভিযোগ, সহিংসতা এবং সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো বিভিন্ন দাবি-প্রতিদাবির জেরে উখরুলের পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। প্রশাসনের তরফে জানানো হয়েছে, এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিস্থিতির উপর কড়া নজর রাখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, মণিপুরে ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া জাতিগত সংঘর্ষের জেরে পাহাড়ি ও উপত্যকা অঞ্চলের সম্পর্ক বারবার উত্তপ্ত হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এখনো পর্যন্ত প্রায় ৫৮ হাজারেরও বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। নিহতের সংখ্যা ২০০-র বেশি। হাজার হাজার বাড়ি ধ্বংস হয়েছে, বহু মানুষ এখনও ত্রাণ শিবিরে দিন কাটাচ্ছেন।  ক্রমাগত সংঘর্ষ, পাল্টা অভিযোগ এবং নিরাপত্তা উদ্বেগের মাঝে মণিপুরের পাহাড়ি ও উপত্যকা অঞ্চলের সংকট যে আরও গভীর হচ্ছে, তা এই নতুন ঘটনায় আবারও স্পষ্ট হয়ে উঠল বলে মনে করছে প্রশাসনিক মহল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!