Advertisement
  • দে । শ
  • মার্চ ১১, ২০২৬

১৩ বছর কোমায়, লাইফ সাপোর্ট তুলে যুবকের ‘মৃত্যুর অধিকার’ দিল সুপ্রিম কোর্ট

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
১৩ বছর কোমায়, লাইফ সাপোর্ট তুলে যুবকের ‘মৃত্যুর অধিকার’ দিল সুপ্রিম কোর্ট

১৩ বছর ধরে এক অচেতন অবস্থায় থাকার পর অবশেষে মৃত্যুর অধিকার পেলেন ৩১ বছরের যুবক হরিশ রানা। বুধবার, সুপ্রিম কোর্ট তাঁর মা-বাবার অনুরোধ মঞ্জুর করে জীবন সংরক্ষণকারী সহায়তা (লাইফ সাপোর্ট) বন্ধ করার অনুমতি দিয়েছে। আদালত এ রায়ের সঙ্গে কেন্দ্রকে অনুরোধ করেছে, ‘প্যাসিভ ইউথানেশিয়া’-র জন্য স্পষ্ট আইন প্রণয়নের বিষয়টি বিবেচনা করতে। ভারতের বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী ‘প্যাসিভ ইউথানেশিয়া’ সম্ভব কেবল তখনই, যখন কমপক্ষে ২টি চিকিৎসা বোর্ড রোগীর অবস্থা বিশ্লেষণ করে মতামত দেয়। এই রায়ে সুপ্রিম কোর্ট দেশেই প্রথমবারের মতো ‘মৃত্যুর অধিকার’ নিয়ে স্পষ্ট নির্দেশনা দিল, যা শুধু হরিশ রানার পরিবারের জন্য নয়, ভবিষ্যতের একই ধরনের মামলার ক্ষেত্রেও একটি আইনি দিশা হিসেবে কাজ করবে।

হরিশ রানা পঞ্জাব বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের ছাত্র ছিলেন। ২০১৩ সালের রাখির দিনে তিনি একটি আবাসনের চার তলা থেকে পড়ে গুরুতর আঘাত পান। দুর্ঘটনার পর থেকে তিনি শয্যাশায়ী। চিকিৎসা পরিভাষায় যাকে বলা হয় ‘পার্সিস্টেন্ট ভেজিটেটিভ স্টেট’। ১৩ বছরের  দীর্ঘ সময়ে তার শারীরিক অবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি। সব সময় লাইফ সাপোর্টে ছিলেন; শ্বাস নেওয়ার জন্য ট্রাকিওস্টোমি টিউব এবং খাবারের জন্য গ্যাস্ট্রোজেজুনোস্টমি টিউবের ওপর সম্পূর্ণ নির্ভরশীল ছিলেন। হরিশের বাবা-মা পুরোটা সময় তাঁর পাশে থেকেছেন। বিচারপতিরা হরিশের বাবা-মায়ের দীর্ঘ লড়াই ও ত্যাগের প্রশংসা করেছেন। তারা কখনও ছেলের পাশে সরেননি। প্রাথমিক ও সেকেন্ডারি দুই মেডিক্যাল বোর্ডই জানিয়েছে, এই পরিস্থিতিতে কৃত্রিম খাবার এবং সকল জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা বন্ধ করাই হরিশের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত।

বছরের পর বছর সন্তানের এমন অবস্থা দেখে যন্ত্রণায় বিধ্বস্ত দুজনেই। এদিন, তাঁদের অনুরোধে আদালত হরিশের কৃত্রিম জীবনদায়ী চিকিৎসা প্রত্যাহার করার অনুমতি দেয়। সুপ্রিম কোর্টের টি জাস্টিস জে.বি. পারদিওয়ালা ও জাস্টিস কে.ভি. বিশ্বনাথনের বেঞ্চ রায়ে বলেছেন, ‘এই ধরনের মামলার ক্ষেত্রে মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত রোগীর স্বার্থেই মৃত্যুর ‘অনুমতি’ দেওয়া হচ্ছে কিনা। জীবন দীর্ঘায়িত করার জন্য যে চিকিৎসা চলেছে তা রোগীর পক্ষে আদৌ প্রয়োজনীয় কি না।’ আদালত আরও জানিয়েছে, কোনো চিকিৎসা তখনই প্রয়োজনীয়, যখন তা রোগীর পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা রাখে। যদি পুনরুদ্ধারের কোনো সম্ভাবনা না থাকে, তবে সে  চিকিৎসা কেবল কৃত্রিমভাবে জীবন টেনে ধরে রাখার বিফল চেষ্টা মাত্র।

হরিশের দীর্ঘ চিকিৎসার প্রেক্ষাপট আরও জটিল। ২০১৮ সালের সুপ্রিম কোর্টের ‘কমন কজ  বনাম ইউনিয়ন অফ ইন্ডিয়া মামলায় মর্যাদার সঙ্গে মৃত্যুর অধিকারকে সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২১-এর অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। তবে সে নির্দেশিকায় কেবল ভেন্টিলেটরের মতো সরঞ্জাম সরানোর প্রসঙ্গ স্পষ্ট ছিল; ফিডিং টিউবের মাধ্যমে কৃত্রিম পুষ্টি বন্ধ করার বিষয়টি তখন পরিষ্কার ছিল না। হরিশ রানার বাবা-মা আদালতের দ্বারস্থ হওয়ায় এই জটিলতা সমাধান পেল। আদালত স্পষ্ট করে জানিয়েছে, হাসপাতালে রোগীকে ক্লিনিক্যালি অ্যাসিস্টেড নিউট্রিশন বা কৃত্রিম পুষ্টি দেওয়া হলেও, নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে চিকিৎসকদের মতামতের ভিত্তিতে তা প্রত্যাহার করা যেতে পারে। তবে এর জন্য দুটি মেডিক্যাল বোর্ডের পরামর্শ অপরিহার্য।

আদালত আরও উল্লেখ করেছে, হরিশের ক্ষেত্রে দেওয়া মৃত্যুদান পরোক্ষ, অর্থাৎ ‘প্যাসিভ ইউথানেশিয়া’। প্রত্যক্ষ মৃত্যু (অ্যাকটিভ ইউথানেশিয়া) ভারতে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। এখানে চিকিৎসক ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো ওষুধ দিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করেননি। শুধুমাত্র জীবন সংরক্ষণকারী ব্যবস্থাকে বন্ধ করা হয়েছে। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ‘এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে দুটি কারণে— এক, হরিশের চিকিৎসার বাস্তব অবস্থা; দুই, রোগীর স্বার্থে কোনটা সবচেয়ে ভালো।’ আদালত, হরিশের দীর্ঘ চিকিৎসা যাত্রার বেদনাকে সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরে বলেন, ‘যদি সন্তানস্নেহ, ভালোবাসা মানে চরম দুঃসময়ে লাগাতারভাবে যত্ন নেওয়া হয়, তাহলে এই পরিবারের ত্যাগের কথাই আমাদের আজকের রায়ের কেন্দ্রবিন্দু।’ আদালত এদিন সুস্পষ্ট করেছেন, মৃত্যুর অধিকারও জীবনের মতো মানবিক ও সাংবিধানিক আলোচনার অংশ। কেন্দ্র সরকারকে আদালত উপদেশ দিয়েছে, আগামী দিনে এ নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!