- এই মুহূর্তে দে । শ
- মার্চ ১৬, ২০২৬
প্রথম দফায় ১৯২ আসনে প্রার্থী ঘোষণা বামফ্রন্টের, তালিকায় নবীন–প্রবীণ সমন্বয়ে চমক। লিবারেশনের অন্য ছক
বঙ্গভোটের আগে রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন নড়াচড়া। আসন্ন ২০২৬ পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচন সামনে রেখে প্রথম দফায় ২৯৪টি আসনের মধ্যে ১৯২টিতে প্রার্থীর নাম ঘোষণা করল বামফ্রন্ট। সোমবার প্রকাশিত এই তালিকায় এক দিকে যেমন নতুন প্রজন্মের একাধিক মুখকে সামনে আনা হয়েছে, তেমনই অভিজ্ঞ নেতাদেরও গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী করে নবীন ও প্রবীণের সমন্বয়ের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে।
দলীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, ২০২১ সালের নির্বাচনে তুলনামূলকভাবে নতুন প্রজন্মের নেতাদের সামনে আনার কৌশল নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু চলতি নির্বাচনে সংগঠনের অভিজ্ঞতা ও রাজনৈতিক পরিপক্বতাকে গুরুত্ব দিয়ে তরুণ নেতৃত্বের পাশাপাশি প্রবীণদেরও প্রার্থিতালিকায় জায়গা দেওয়া হয়েছে। ফলে ঘোষিত তালিকায় এক ধরনের প্রজন্মসমন্বয়ের রূপরেখা স্পষ্ট।
প্রার্থীদের মধ্যে বিশেষ ভাবে নজর কেড়েছে সাবিনা ইয়াসমিনের নাম। তিনি কালীগঞ্জ বিধানসভা উপনির্বাচনের পরবর্তী হিংসায় নিহত স্কুলছাত্রী তমন্নার মা। সে ঘটনার প্রেক্ষাপটে তাঁর প্রার্থী হওয়াকে রাজনৈতিক মহলের একাংশ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে। পাশাপাশি তালিকায় রয়েছেন কলকাতার প্রাক্তন মেয়র ও বিশিষ্ট আইনজীবী বিকাশ ভট্টাচার্য। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার জন্য তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ আসনে প্রার্থী করা হয়েছে বলে দলীয় সূত্রের দাবি।
তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধিত্বকারী কয়েকটি পরিচিত মুখকেও গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে প্রার্থী করা হয়েছে। দমদম (উত্তর) কেন্দ্র থেকে প্রার্থী হয়েছেন ছাত্র সংগঠন এসএফআইয়ের সর্বভারতীয় নেত্রী দীপ্সিতা ধর। কোচবিহার উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রে লড়বেন এসএফআই পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য কমিটির সভাপতি প্রণয় কার্যী। উত্তরপাড়া থেকে লড়বেন মিনাক্ষী মুখোপাধ্যায়। পানিহাটি কেন্দ্রে প্রার্থী হয়েছেন কলতান দাশগুপ্ত। মহেশতলা কেন্দ্রে লড়বেন সায়ন বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাজারহাট–নিউটাউন আসনে প্রার্থী করা হয়েছে সপ্তর্ষী দেব-কে। তরুণ নেতৃত্বকে সামনে এনে সংগঠনের ভবিষ্যৎ শক্তিকে তুলে ধরার কৌশলেই এই সিদ্ধান্ত বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ।
এ বার রাজ্যে দু-দফায় বিধানসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশনের সূচি অনুযায়ী প্রথম দফার ভোটগ্রহণ হবে আগামী ২৩ এপ্রিল, সে দিন মোট ১৫২টি আসনে ভোট হবে। দ্বিতীয় দফার ভোট নির্ধারিত হয়েছে ২৯ এপ্রিল, ওই দফায় ভোটগ্রহণ হবে ১৪২টি আসনে। সব মিলিয়ে ভোটের ফল ঘোষণা হবে আগামী ৪ মে। একই দিনে ঘোষণা করা হবে তামিলনাড়ু, কেরল, অসম এবং পুদুচেরি-র বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলও। ফলে দেশের একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাজ্যের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণের দিন হিসেবে ৪ মে-কে ঘিরে ইতিমধ্যেই রাজনৈতিক মহলে জোর আলোচনা শুরু হয়েছে।
অন্য দিকে, বঙ্গভোটের প্রাক্কালে নিজেদের রাজনৈতিক অবস্থানেও পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া (মার্কসিস্ট-লেনিনিন) লিবারেশন। এতদিন পর্যন্ত দলটি প্রধান প্রতিপক্ষ হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টি-কেই চিহ্নিত করত। কিন্তু এ বার তারা রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি— দু-পক্ষকেই একই রাজনৈতিক সারিতে রেখে ভোটে লড়াইয়ের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সোমবার দলের রাজ্য সম্পাদক অভিজিৎ মজুমদার এক বিবৃতিতে জানান, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে লিবারেশন মোট ১০টি আসনে প্রার্থী দেবে। বৃহত্তর বাম ঐক্য পুনর্গঠনের লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি। কোন কোন আসনে প্রার্থী দেওয়া হবে, তা পরে ঘোষণা করা হবে বলেও উল্লেখ করেছেন।
উল্লেখযোগ্য যে, গত বছরের শেষ দিকে ‘বাংলার বুকে চাই বামপন্থার পুনর্জাগরণ’ স্লোগান তুলে রাজ্য সম্মেলন করেছিল দলটি। সেই সম্মেলনে বিজেপির সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছিল এবং বৃহত্তর বাম ঐক্যের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়। যদিও এতদিন দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক দীপঙ্কর ভট্টাচার্য তৃণমূল ও বিজেপিকে একই রাজনৈতিক সারিতে দেখার প্রশ্নে আপত্তি জানিয়ে এসেছিলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, বাংলার রাজনৈতিক বাস্তবতায় বামপন্থার পুনর্জাগরণ ঘটাতে একটি স্বতন্ত্র তৃতীয় শক্তির উত্থান জরুরি। এমনকি বিজেপিকে প্রতিহত করতে প্রয়োজনে তৃণমূলকে কৌশলগত সমর্থন দিতেও লিবারেশন পিছপা হয়নি।
২০২৫ সালের বিহার বিধানসভা নির্বাচন ২০২৫-এ সেই কৌশলেই লড়ে চারটি আসনে জয় পেয়েছিল দলটি। তবে বঙ্গভোটের আগে পরিস্থিতির বদল ঘটেছে বলেই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকেরা। সোমবারের বিবৃতিতে অভিজিৎ মজুমদার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, বাংলায় বিজেপি–আরএসএসের ‘ফ্যাসিবাদী আগ্রাসন’ এবং তৃণমূলের ‘অপশাসন’—উভয়ের বিরুদ্ধেই রাজনৈতিক লড়াই গড়ে তুলতে চায় লিবারেশন। সেই লক্ষ্যেই সীমিত পরিসরে হলেও নির্বাচনী লড়াইয়ে নামার সিদ্ধান্ত নিয়েছে দল। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, রাজ্যভিত্তিক বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করেই কৌশলগত অবস্থান বদল করেছে লিবারেশন। বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলার রাজনীতিতে তৃণমূল এবং বিজেপি—দু’টিকেই সমান ভাবে চ্যালেঞ্জ জানাতে চাইছে দীপঙ্কর ভট্টাচার্য-র নেতৃত্বাধীন দল।
❤ Support Us






