- দে । শ
- জানুয়ারি ১৪, ২০২৬
টুসু পরবে নেই ছুটি,ক্ষোভে ফুঁসছে মানভূম অঞ্চল
বছরের বহু প্রথা ভেঙে এবার প্রথমবারের মতো, মানভূমের প্রাণের উৎসব টুসুর দিন প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলা থাকায় সৃষ্টি হয়েছে অভূতপূর্ব পরিস্থিতি। বরাবরই এদিনটি কচিকাঁচাদের জন্য বরাবরই ছুটির দিন হলেও এ বছর ব্যতিক্রম। এ ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে, পুরুলিয়া জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের ভূমিকা ও দায়িত্ববোধ নিয়ে। স্কুল খোলা থাকায় শিক্ষক, অভিভাবক এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বিস্ময় আর ক্ষোভের ছায়া। পূর্ব মেদিনীপুর, পশ্চিম মেদিনীপুর, বীরভূম এমনকি কলকাতার সংলগ্ন হাওড়ায় জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের হস্তক্ষেপে পৌষ সংক্রান্তির দিন ছুটি মঞ্জুর হয়েছে। সে তুলনায় পুরুলিয়ার ঘটনা স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন তোলে, কেন এখানকার শিশু ও শিক্ষকেরা তাদের স্থানীয় উৎসব উদযাপনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন।
জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ প্রতি বছর নিজস্ব ক্যালেন্ডার প্রকাশ করে। সে ক্যালেন্ডারে স্থানীয় উৎসব ও পার্বণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়, কারণ সংসদ গঠনের মূল উদ্দেশ্যই ছিল স্থানীয় প্রয়োজন এবং সংস্কৃতিকে গুরুত্ব দেওয়া। কিন্তু চলতি বছরে পুরুলিয়া জেলা সংসদ রাজ্য প্রাথমিক শিক্ষা পর্ষদের ক্যালেন্ডারকে কার্যত হুবহু গ্রহণ করেছে। এর ফলেই টুসু উৎসব, আখান যাত্রা এবং মকর পরবের পরের দিন পয়লা মাঘের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানীয় উৎসবগুলোর জন্য ছুটি ঘোষণা হয়নি। বিতর্কের মুখে জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদের চেয়ারম্যান এবং বান্দোয়ানের বিধায়ক রাজীবলোচন সরেন বলেন, ‘আমরা বিষয়টি যথাস্থানে জানিয়েছি। টুসু যে সাবেক মানভূমের মানুষের আবেগের উৎসব, সেটাও ব্যাখ্যা করা হয়েছে। কেন ছুটি মঞ্জুর হয়নি, তা আমি স্পষ্টভাবে বলতে পারছি না।’ তাঁর এই মন্তব্য থেকেই বোঝায় যে, প্রশাসনিক স্তরে স্থানীয় আবেগ ও সংস্কৃতির গুরুত্ব এখনো পর্যাপ্তভাবে বিবেচিত হয়নি।
এদিকে, ‘উস্থি ইউনাইটেড প্রাইমারি টিচার্স ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন’ সংসদের চেয়ারম্যানকে চিঠি পাঠিয়ে দাবি করেছে, আগের মতো টুসু, আখান যাত্রা, সরস্বতী পুজোর পরের দিন ‘বাসি ভাত’, মনসা পুজো এবং তার পরের দিন পান্নার মতো স্থানীয় ছুটিগুলি পুনর্বহাল করতে হবে। শিক্ষামহল মনে করছে, স্থানীয় সংস্কৃতি ও শিক্ষার মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা শুধু প্রশাসনিক কর্তব্যই নয়, ভারতের বিবিধ সংস্কৃতিকে সম্মান জানানোর সাংবিধানিক প্রক্রিয়াও। টুসু উৎসব কেবল মূলনিবাসী মানুষের গান-নাচ বা আচারেই সীমাবদ্ধ নয়। এটি মানভূম অঞ্চলের মানুষের আবেগ, পরিচয় ও সামাজিক ঐতিহ্যের এক অঙ্গ। উৎসবের শুরু হয় অগ্রহায়ণ মাসে এবং পৌষ সংক্রান্তির দিন এটি শেষ হয়। কুমারী মেয়েরা টুসুর পুজো করে, ফল, পিঠে, খই-মুড়কি, দুধ এবং মিষ্টান্ন দিয়ে নৈবেদ্য সাজায়। উৎসবের অপরিহার্য অংশ টুসু গান, মেয়েরা দল বেঁধে বাড়ি বাড়ি বা হাটে হাটে ঘুরে গান গায়। তাতে থাকে প্রান্তিক মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সুখ-দুঃখ, প্রেম-বিরহ ও সামাজিক ভাবনার নানা রঙ ।
উৎসবের সমাপ্তি ঘটে নদীতে টুসুর বিসর্জন দিয়ে। পৌষ সংক্রান্তির ভোরে কুমারী মেয়েরা গান গাইতে গাইতে আদরের টুসুকে নদীর জলে ভাসিয়ে দেন। এরপর স্নান সেরে নতুন জামা কাপড় পড়ে বাড়ি ফিরে আসে। এসব আচার-আচরণ কেবল লোকসংস্কৃতির উদযাপন নয়, বরং জঙ্গলমহলের মানুষের আবেগ ও ঐতিহ্যের এক জীবন্ত প্রতিফলন। টুসু উৎসব কেবল পুরুলিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়। ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পশ্চিম মেদিনীপুর এবং ঝাড়খণ্ডের পূর্ব সিংভূম জেলাতেও এ উৎসব উদযাপিত হয়। দীর্ঘদিন ধরে চলা এ প্রথার দিনে ছুটি না মেলায় কচিকাঁচাদের মনে আক্ষেপ। শিক্ষামহল মনে করছে, স্থানীয় সংস্কৃতি ও শিক্ষার মধ্যে সামঞ্জস্য রক্ষা করতে হলে টুসুর মতো উৎসবকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে। এখন দেখার বিষয়, পুরুলিয়া জেলা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংসদ কী পদক্ষেপ নেয়।
❤ Support Us






