Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ৩০, ২০২৫

কর্মরত সাফাই কর্মীর মৃত্যুর ক্ষতিপূরণে গড়িমসি নয়, রাজ্যগুলিকে কড়া নির্দেশ শীর্ষ আদালতের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কর্মরত সাফাই কর্মীর মৃত্যুর ক্ষতিপূরণে গড়িমসি নয়, রাজ্যগুলিকে কড়া নির্দেশ শীর্ষ আদালতের

ম্যানহোলে নেমে সাফাই করতে গিয়ে যদি কোনো শ্রমিকের মৃত্যু ঘটে, তবে ক্ষতিপূরণের ব্যাপারে কোনো গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। ৩ সপ্তাহের মধ্যেই নিহতের পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের টাকা পৌঁছে দিতে হবে, বুধবার এমনই কড়া নির্দেশ দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বলা হয়েছে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ক্ষতিপূরণ না দিলে সংশ্লিষ্ট রাজ্য বা কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের পূর্ত দফতরের সচিবকে আদালতে হাজির হতে হবে।

বিচারপতি অরবিন্দ কুমার এবং বিচারপতি এন. ভি. আঞ্জারিয়ার বেঞ্চ এদিন এই নির্দেশ দিয়েছেন। ২০২৩ সালের ২০ অক্টোবর আদালত ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জিং বা হাতে নিকাশি পরিষ্কারের মতো অমানবিক প্রথা সম্পূর্ণরূপে নির্মূল করতে সর্বোচ্চ আদালত যে নির্দেশ দিয়েছিল, বুধবার সে রায়ের বাস্তবায়ন কতটা হয়েছে তা যাচাই করার সময়ই আদালত এই নতুন নির্দেশ জারি করে। ম্যানহোলে মানুষ নামিয়ে সাফাই করানোকে সুপ্রিম কোর্ট আবারও ‘অমানবিক’ এবং ‘নিষিদ্ধ’ প্রথা বলে অভিহিত করেছে। আদালতের পর্যবেক্ষণ, দেশে আজও নানা রাজ্যে মানুষকে ম্যানহোলে নামিয়ে কাজ করানো হচ্ছে, যা কেবল আইনবিরুদ্ধই নয়, এক গভীর সামাজিক ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। বর্তমানে কেবল বিশেষ পরিস্থিতিতেই ম্যানহোলে মানুষ নামানোর অনুমতি রয়েছে, তাও তখন সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকের জীবন ও স্বাস্থ্যের পূর্ণ সুরক্ষার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু বাস্তবে সেই সুরক্ষা প্রায় কোথাও নেই বললেই চলে।

২০১৩ সালে দেশে ‘প্রোহিবিশন অব এমপ্লয়মেন্ট অ্যাজ ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারস অ্যান্ড দেয়ার রিহ্যাবিলিটেশন অ্যাক্ট’ কার্যকর হওয়ার পরও দেশের নানা প্রান্তে এ ধরণের মৃত্যুর ঘটনা থামেনি। চলতি বছরের শুরুতেই সুপ্রিম কোর্ট দেশের ৬টি বড়ো শহর— কলকাতা, দিল্লি, মুম্বই, চেন্নাই, বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদ-এ ম্যানহোলে মানুষ নামিয়ে সাফাই করানোর কাজ পুরোপুরি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। তবু ভূ-গর্ভস্থ নালা পরিষ্কার করতে গিয়ে মৃত্যু ও দুর্ঘটনার খবর আসা থামেনি। ক্ষতিপূরণ সংক্রান্ত নির্দেশও আদালত এ দিন আরো স্পষ্ট করে দিয়েছে। গত বছরের রায়ে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছিল, ম্যানহোল বা নিকাশি পরিষ্কার করতে গিয়ে মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবারের হাতে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ১০ লক্ষ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০ লক্ষ টাকা করা হবে। তবে সে রায়ে পুরনো মৃত্যুর ঘটনাগুলিতে ওই বাড়তি অঙ্ক প্রযোজ্য হবে কি না, তা স্পষ্ট ছিল না। বুধবার আদালত জানিয়েছে, ক্ষতিপূরণের অঙ্ক ১০ লক্ষ না ৩০ লক্ষ হবে, এ প্রশ্ন এখনও মীমাংসিত না হলেও অন্তত ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়া বন্ধ রাখার কোনো কারণ নেই। আদালত স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছে, প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে অবিলম্বে ন্যূনতম ক্ষতিপূরণের অর্থ দিতে হবে এবং মৃত্যুর ঘটনা ঘটার ৩ সপ্তাহের মধ্যেই সেই টাকা পরিবারের হাতে পৌঁছে দিতে হবে। এই সময়সীমা মানতে ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট রাজ্যের পূর্ত দফতরের সচিবকে আদালতে ডেকে পাঠানো হবে।

সুপ্রিম কোর্টের আগের নির্দেশ অনুযায়ী, ম্যানহোল বা সিউয়ারে নামতে গিয়ে যদি কেউ আহত হন, তবে ন্যূনতম ১০ লক্ষ টাকা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। যদি সেই অক্ষমতা স্থায়ী হয়, তবে ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বেড়ে হবে ২০ লক্ষ টাকা। বিচারপতিরা পর্যবেক্ষণ করেছেন, ‘এ ধরনের কাজের ঝুঁকি এতটাই ভয়াবহ যে, অনেক শ্রমিক মৃত্যু এড়ালেও আজীবন শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হচ্ছেন। রাষ্ট্রের দায়িত্ব তাঁদের পুনর্বাসন ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনের ব্যবস্থা করা।’ আদালতের রায়ে আরো বলা হয়েছে, প্রতিটি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলকে ম্যানহোলে সাফাই করতে গিয়ে প্রাণ হারানো বা অক্ষম হয়ে পড়া শ্রমিকদের পরিবারের জন্য স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে। তাঁদের সন্তানদের জন্য শিক্ষাবৃত্তি, প্রশিক্ষণ ও কর্মসংস্থানের সুযোগ দিতে হবে, যাতে পরিবারটি দারিদ্র্যের চক্র থেকে বেরিয়ে আসতে পারে। আদালতের মতে, ক্ষতিপূরণ কেবল আর্থিক সহায়তা নয়, বরং এটি সামাজিক ন্যায়বিচারের একটি পদক্ষেপ।

প্রসঙ্গত, এ মামলাটির সূত্রপাত বলরাম সিং নামে এক নাগরিকের জনস্বার্থ মামলা থেকে। তিনি অভিযোগ করেছিলেন, ১৯৯৩ সালের ‘এমপ্লয়মেন্ট অব ম্যানুয়াল স্ক্যাভেঞ্জারস অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন অব ড্রাই ল্যাট্রিনস (প্রোহিবিশন) অ্যাক্ট’ এবং ২০১৩ সালের নতুন আইনের পরও বাস্তবে কোনো পরিবর্তন আসেনি। আদালতও ওই অভিযোগে মান্যতা দিয়ে বলেছে, ‘দীর্ঘ ৩ দশক পেরিয়ে গেলেও প্রশাসন চোখ বুজে বসে আছে।’ আদালত কেন্দ্র সরকারকে নির্দেশ দিয়েছে যেন রেল, পৌরসভা, কর্পোরেশন, ক্যান্টনমেন্ট বোর্ড এবং অন্যান্য সরকারি ও বেসরকারি সংস্থাগুলির ক্ষেত্রে হাতে নিকাশি পরিষ্কার করার কাজ ধাপে ধাপে সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা হয়। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত গত ৫ বছরে দেশে অন্তত ৩৪৭ জন শ্রমিক সিউয়ার বা সেপটিক ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু ও দিল্লিতেই ঘটেছে মোট মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশ। মানবাধিকার কর্মীদের মতে, আদালতের এ নির্দেশ কেবল ক্ষতিপূরণের অঙ্ক বাড়ানো নয়, বরং এক দীর্ঘদিনের অবমাননার বিরুদ্ধে মানবিক মর্যাদার দাবিকে স্বীকৃতি দেওয়া। তাঁরা বলছেন, ‘প্রতিটি ম্যানহোল-মৃত্যু আমাদের প্রশাসনিক ব্যর্থতার প্রতীক। এবার সুপ্রিম কোর্ট শুধু ন্যায়ের নয়, মানবতার পক্ষেও দাঁড়াল।’


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!