Advertisement
  • দে । শ
  • মে ১২, ২০২৫

কালিয়াচকে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই গঙ্গা-ভাঙন দুর্গতদের ‘শেষ আশ্রয়’

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
কালিয়াচকে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে ছাই গঙ্গা-ভাঙন দুর্গতদের ‘শেষ আশ্রয়’

এক সময় নদী তাদের ঘর কেড়ে নিয়েছিল। গঙ্গাভাঙনের কড়াল গ্রাসে উদ্বাস্তু হয়ে, তারা আশ্রয় খুঁজেছিলেন সরকারি জমিতে। কালিয়াচকের দুর্গারামটোলায় ত্রিপল, টিন, বাঁশ-খড়, চাটাই, যে যা পেরেছেন, তাই দিয়ে কোনমতে গড়ে তুলেছিলেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। ঝুপড়ি সে ঘরেই ফিরছিল স্বাভাবিকতা। ফিরেছিল কিছুটা স্বস্তি। কিন্তু রবিবারের দুপুরে এক নিমেষে সব শেষ হয়ে গেল। আগুনে ছাই হয়ে গেল ভাঙন-পীড়িত মানুষের বসতভিটে, সামান্যপুঁজি, খাদ্যশস্য, জামাকাপড়, আসবাবপত্র, স্বাভাবিক ছন্দে বাঁচার স্বপ্ন, সব, সব কিছু। কালিয়াচক-৩ ব্লকের বীরনগর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের দুর্গারামটোলা এলাকার ঘটনা।

গঙ্গা ভাঙনের পরে ২০২১ সালে যে সরকারি জমিতে আশ্রয় নিয়েছিলেন প্রায় ৩০টি পরিবার, সেখানেই রবিবার দুপুর ১২টা নাগাদ আচমকা দাউ দাউ করে আগুন লেগে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, রান্নার সময় উনুন থেকেই আগুনের সূত্রপাত। গরমে শুকিয়ে থাকা খড়-টালি-চাটাইয়ের ঘরগুলো একের পর এক জ্বলে উঠতে থাকে। ঝোড়ো হাওয়ায় আশেপাশের ঝুপড়ি ঘরগুলিতে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। ঘরের ভেতরে থাকা গ্যাস সিলিন্ডার ফেটে আগুন আরও মারাত্মক রূপ নেয়। পুড়ে ছাই হয়ে যায় ৩০-৩৫টি ঘর। স্থানীয় বাসিন্দাদের আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা, দমকলের সহায়তা কিছুই আগুনের গ্রাস থামাতে পারে নি। মালদা দমকল দফতরের আধিকারিক সুনীল সরকার বলেন, ‘প্রাথমিক ভাবে অনুমান, রান্নার খড়ি বা কাঠ থেকেই আগুন লেগেছে। যদিও কোনও হতাহতের খবর নেই, কিন্তু ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকখানি।’

ঘটনার খবর পেয়ে ইংরেজবাজার থেকে ছুটে আসে দমকলের ২ টি ইঞ্জিন। কিন্তু প্রায় ৫০ কিলোমিটার দূরের রাস্তা পেরিয়ে আসতে গিয়ে প্রায় দেড় ঘণ্টা পেরিয়ে যায়। তার মধ্যে আগুন প্রায় সব কিছুই ভস্মীভূত করে দিয়েছে। দমকলকর্মীদের ২ ঘণ্টার চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও, ততক্ষণে সব শেষ। দুর্গারামটোলায় নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই খুঁজে নিয়েছিলেন যারা, সেই বিমল হালদার, চানু মণ্ডল, রেবতী মণ্ডলদের বুক-চাপড়ানো আর্তনাদে বাতাস ভারি হয়ে উঠেছে। তাঁরা বলেন, ‘তখন নদী সব কিছু নিয়ে গিয়েছিল। এইখানে নতুন করে ঘর তুলেছিলাম। আজ আবার সব শেষ হয়ে গেল।’ ক্ষতিগ্রস্থ বিমল হালদার বলেন, ‘আমার স্ত্রী তখন রান্না করছিল। হঠাৎ দেখি পাশের ঘর থেকে ধোঁয়া বেরোচ্ছে। কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগুন চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছে। কোনোমতে প্রাণটুকু নিয়ে আমরা পালিয়ে আসতে পেরেছি।’ এমনই করুণ চিত্রের বর্ণনা ফুটে ওঠে দুর্গত আরো অনেকের মুখে। হঠাৎ অগ্নিকাণ্ডে জীবন যেমন–তেমন রক্ষা হলেও, সম্পূর্ণ সর্বস্বান্ত অবস্থায় এখন তাঁরা। যাঁরা কিছুদিন আগে মাথার উপর ছাউনি পেয়েছিলেন, তাঁরাই এখন ফের খোলা আকাশের নীচে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, আগুন নেভাতে নলকূপের জল ব্যবহার করা হয়েছিল। কিন্তু সিলিন্ডার বিস্ফোরণের পর অনেকেই পিছিয়ে আসেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত ত্রাণ পাঠানো হয়েছে। দুর্গতদের হাতে শুকনো খাবার, ত্রিপল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী তুলে দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন বীরনগর-১ গ্রাম পঞ্চায়েতের প্রধান পিন্টু দাস। তবে বসবাসযোগ্য আশ্রয় কবে মিলবে, তা নিয়ে এখনো অনিশ্চয়তা। মালদা জেলা পরিষদের সদস্য পরিতোষ সরকার বলেন, ‘ঘটনার খবর পাওয়া মাত্রই ছুটে এসেছি। প্রশাসন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে রয়েছে। জেলা ও ব্লক স্তরে সাহায্যের পরিকল্পনা হচ্ছে।’ সরকার আরো বলেন, ‘এই পরিবারগুলির জীবনে দুর্যোগ যেন বারবার ফিরে ফিরে আসছে। গঙ্গা ভাঙনের পর এরা যখন নতুন করে জীবন গুছিয়ে নিতে শুরু করেছে, তখনই এই বিধ্বংসী অগ্নিকাণ্ড।’

তবে, প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষতিগ্রস্থদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। দুর্গতদের বক্তব্য, ৫০ কিমি দূর থেকে দমকলের ইঞ্জিন আসতে সময় লেগে গেছে অনেকটাই। গ্রামীণ এলাকা হওয়ায় আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়লেও, নিভাতে পারেননি তাঁরা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আগে থেকে কাছাকাছি অঞ্চলে একটা অস্থায়ী দমকল কেন্দ্র থাকলে এতটা ক্ষয়ক্ষতি হতো না।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!