- দে । শ
- অক্টোবর ১৪, ২০২৬
মিরাটের বহুচর্চিত ‘নীল ড্রাম’ হত্যা মামলায় মুসকান ও তাঁর প্রেমিককে মৃত্যুদণ্ডের সাজা
প্রেমের বিয়ে, তার পর পরকীয়ার অভিযোগ, শেষ পর্যন্ত স্বামীকে নৃশংস ভাবে খুন! প্রাক্তন মার্চেন্ট নেভির আধিকারিক সৌরভ রাজপুত হত্যাকাণ্ডে স্ত্রী মুসকান রাস্তোগী ও তাঁর প্রেমিক সাহিল শুক্লাকে মৃত্যুদণ্ড দিল মিরাটের আদালত। ১৩ মাস ধরে ১২৬টি শুনানির পর গত ৩০ সেপ্টেম্বর দু–জনকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছিল। বুধবার সাজা ঘোষণা করলেন মিরাটের জেলা বিচারক অরবিন্দ কুমার মিশ্র।
স্বামীকে খুনের অভিযোগ। তার পর দেহ টুকরো টুকরো করে কেটে নীল প্লাস্টিকের ড্রামে ভরে সিমেন্ট ঢেলে দেওয়ার অভিযোগ। যাতে অপরাধের কোনো প্রমাণ না থাকে, সে উদ্দেশ্যেই এমন কাণ্ড বলে দাবি তদন্তকারীদের। উত্তরপ্রদেশের মিরাটের এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড দেশ জুড়ে পরিচিতি পেয়েছিল ‘নীল ড্রাম’ হত্যাকাণ্ড নামে। সে মামলাতে মৃত্যুদণ্ডের সাজা হলো মুসকান রাস্তোগী এবং তাঁর প্রেমিক সাহিল শুক্লার। আদালত সূত্রে খবর, দুই দোষীকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে আদালতে হাজির করানো হয়েছিল। গত ৩০ সেপ্টেম্বরই সৌরভ রাজপুতকে খুন এবং তাঁর দেহ লোপাটের চেষ্টা করার অভিযোগে মুসকান ও সাহিলকে দোষী সাব্যস্ত করেছিল আদালত। ১৩ মাস ধরে চলা বিচারপ্রক্রিয়ায় মোট ১২৬টি শুনানির পর এই রায় ঘোষণা করা হয়। অপরাধের নৃশংসতার কথা তুলে ধরে দুই অভিযুক্তেরই মৃত্যুদণ্ড চেয়েছিল সরকারি পক্ষ।
সৌরভের বয়স ছিল ২৯ বছর। ২০১৬ সালে মুসকানের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। দু–জনের মধ্যে সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের। পরিবারের সম্মতি না মেলায় বাড়ি থেকে পালিয়ে বিয়ে করেছিলেন তাঁরা। পরে অবশ্য দুই পরিবারই সে বিয়ে মেনে নেয় বলে পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে। বিয়ের পর থেকেই সৌরভকে পরিবারের অন্য সদস্যদের থেকে আলাদা হয়ে থাকার জন্য চাপ দিতেন মুসকান, এমনই দাবি পুলিশের। পরে মিরাটের ব্রহ্মপুরী এলাকায় একটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতে শুরু করেন দু–জনে। ২০১৯ সালে তাঁদের প্রথম কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। সে সময় মার্চেন্ট নেভিতে কর্মরত ছিলেন সৌরভ। ২০১৯ সালে সেই চাকরি ছেড়ে লন্ডনে চলে যান তিনি। সেখানে একটি শপিং মলে ম্যানেজার হিসাবে কাজ করতেন তিনি। কর্মসূত্রে বিদেশে থাকলেও পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ছিল তাঁর।
২০২৫ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি লন্ডন থেকে দেশে ফেরেন সৌরভ। কিন্তু সে সফরই যে তাঁর জীবনের শেষ সফর হয়ে উঠবে, তা বুঝতে পারেননি তিনি। অভিযোগ, ২০২৫ সালের ৩ মার্চ রাতে সৌরভের খাবারে নেশাজাতীয় পদার্থ মিশিয়ে দিয়েছিলেন মুসকান। সেই খাবার খেয়ে অচেতন হয়ে পড়েন তিনি। এর পরেই সাহিলকে বাড়িতে ডেকে পাঠানো হয় বলে অভিযোগ। তদন্তকারীদের দাবি, মুসকান ও সাহিল দু–জনে মিলে সৌরভকে ছুরি দিয়ে আঘাত করে খুন করেন। তার পর দেহটি একাধিক টুকরোতে কেটে ফেলা হয়। দেহাংশ একটি নীল প্লাস্টিকের ড্রামে ঢুকিয়ে তার মধ্যে তরল সিমেন্ট ঢেলে দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ। দেহের অবশেষ যাতে সহজে শনাক্ত করা না যায়, সে উদ্দেশ্যেই এ ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে মনে করছেন তদন্তকারীরা।
ঘটনার পর বেশ কিছু দিন বিষয়টি প্রকাশ্যে আসেনি। মার্চ মাসের মাঝামাঝি সময়ে মিরাটের ওই বাড়ি থেকে নীল ড্রাম উদ্ধার করে পুলিশ। ড্রামের ভিতর থেকে সৌরভের দেহাবশেষ উদ্ধার হওয়ার পরেই সামনে আসে হত্যাকাণ্ডের ভয়াবহতা। এর পর মুসকান ও সাহিলকে গ্রেফতার করা হয়। হিমাচল প্রদেশে বেড়াতে যাওয়ার পর সেখান থেকে ফেরার সময় তাঁদের গ্রেফতার করা হয়েছিল। ঘটনার নৃশংসতা আর দেহ লোপাটের পদ্ধতির কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই দেশ জুড়ে আলোড়ন তৈরি হয় এ ঘটনায়। মামলার তদন্তে শুধু অভিযুক্তদের বয়ান নয়, বিভিন্ন তথ্যপ্রমাণ ও সাক্ষীদের বক্তব্যের উপরেও জোর দিয়েছিল পুলিশ। বিচারপ্রক্রিয়ায় মোট ২২ জন সাক্ষীর বয়ান নথিভুক্ত করা হয়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ড্রাম, ছুরি ও অপরাধে ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠা অন্যান্য সামগ্রী কেনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা।
অভিযুক্তদের গতিবিধি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হোটেলের ম্যানেজার এবং গাড়িচালকদেরও সাক্ষ্য নেওয়া হয়। বিভিন্ন জায়গায় তাঁদের থাকার নথি আদালতে পেশ করা হয়েছিল। তদন্তকারীদের দাবি, এই সমস্ত তথ্যপ্রমাণের সাহায্যে ঘটনার আগে ও পরে অভিযুক্তদের গতিবিধি সম্পর্কে ধারাবাহিক ছবি তুলে ধরা সম্ভব হয়। গত ৩০ সেপ্টেম্বর আদালত মুসকান ও সাহিলকে দোষী সাব্যস্ত করে। তবে সাজা ঘোষণা করা হলো বুধবার। সরকারি পক্ষের তরফে অপরাধের নৃশংসতার কথা তুলে ধরে মৃত্যুদণ্ডের আবেদন জানানো হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত দুই দোষীকেই মৃত্যুদণ্ডের সাজা শোনায় আদালত।
আদালতের রায় ঘোষণার পর সৌরভের মা রেণু রাজপুতের বক্তব্যেও উঠে আসে এক মায়ের গভীর ক্ষোভ ও যন্ত্রণা। তিনি বলেন, আদালত মুসকানকে দোষী সাব্যস্ত করেছে। কিন্তু ওর কাছে আমার একটা প্রশ্ন রয়েছে — ও আমার ছেলেকে কেন খুন করল? মুসকান যদি আদালতে থাকত, তা হলে আমি সকলের সামনে ওকে এই প্রশ্ন করতাম।’ সৌরভের পরিবারের কাছে এ মামলা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের বিচার নয়, বরং প্রিয়জনকে হারানোর যন্ত্রণার সঙ্গেও জড়িয়ে রয়েছে। যে স্ত্রী ও মেয়ের সঙ্গে জন্মদিন কাটাতে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছিলেন সৌরভ, সেই স্ত্রীই তাঁর খুনের ঘটনায় দোষী সাব্যস্ত হলেন। মামলার এই দিকটি সামনে আসার পর থেকেই দেশ জুড়ে চর্চা শুরু হয়েছিল।
রায় ঘোষণার পর আইনজীবী কৃষ্ণ কুমার দুবে এই রায়কে ‘ঐতিহাসিক’ বলে উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য, অভিযুক্তদের পক্ষের তরফে একাধিক যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল। খুনের ঘটনা কেউ সরাসরি দেখেননি, দুই অভিযুক্তেরই কন্যাসন্তান রয়েছে— এসব যুক্তি তোলা হয়েছিল বলে জানান তিনি। কিন্তু সরকারি পক্ষের পেশ করা প্রমাণ এতটাই শক্তিশালী ছিল যে, তা তাঁদের অপরাধ নিশ্চিত ভাবে প্রমাণ হয়। সে কারণেই অভিযুক্তদের যুক্তিগুলি খারিজ হয়ে যায়। তিনি আরও বলেন, দেশের আদালতগুলির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ রায়ের মধ্যে এটি একটি। কোনো মহিলার মৃত্যুদণ্ড হওয়া নজির সৃষ্টিকারী ঘটনা।
❤ Support Us




