Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • ডিসেম্বর ৩১, ২০২৫

দুর্বৃত্তদের অগ্নিকাণ্ডে জ্বলছে ‘অরণ্য-মানব’-এর বন, তীব্র প্রতিবাদ কংগ্রেসের

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
দুর্বৃত্তদের অগ্নিকাণ্ডে জ্বলছে ‘অরণ্য-মানব’-এর বন, তীব্র প্রতিবাদ কংগ্রেসের

পৃথিবীর বুকে সবচেয়ে সহজ, প্রতিবাদহীন, রক্তপাতহীন হিংসা বোধহয় গাছ কেটে ফেলা, তাকে পুড়িয়ে-উপড়ে ফেলে তৈরি করা সভ্যতার ইট-কাঠ-পাথরের নগরী। নদী-বন-পাহাড় সবই গড়ে ওঠে প্রকৃতির খেয়ালে, জীবকূলকে বাঁচিয়ে রাখে সূক্ষ্ম কারুকার্যে। অথচ মানুষ অনায়াসে, দ্বিধাহীন লালসায় ধ্বংস করে সব। আর সহ্যের সীমা যখন পেরিয়ে যায়, রুদ্রমূর্তির ধ্বংস নিয়ে বিধ্বংসী আক্রোশে ঝাঁপিয়ে পড়ে প্রকৃতি। মানুষের সীমাহীন লোভ খড়কুটোর মতো ভেসে যায়, গুঁড়িয়ে যায়। তবে, এরমধ্যেও তো কিছু মানুষ থাকে, যাঁদের হাতে সৃষ্টির অমোঘ খেয়াল। ঠিক তেমন এক ব্যক্তি, যিনি নিজের হাতে গড়ে তুলেছেন আস্ত এক অরণ্য। অসমের ব্রহ্মপুত্রের তীরে ভারতের ‘অরণ্য-মানব’ পদ্মশ্রী যাদব পাইয়েং এবং তাঁর কন্যা মুনমি পাইয়েং-এর উদ্যোগে নির্মিত বন শুধু রাজ্যের সবুজ প্রাচীরই নয়, জীববৈচিত্র্যের এক অনন্য কেন্দ্র। বন বিভাগের সূত্রে জানা গেছে, রবিবার সন্ধ্যায়, সেই নতুনভাবে রোপিত ‘মোলাই কাথনি ২.০’ বন অগ্নিকাণ্ডে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, প্রায় ৫,৫০০ গাছ ধ্বংস হয়েছে, দগ্ধ হয়েছে বহু ছোটো-বড়ো পশু-পাখি। ভয়াবহ এ পরিস্থিতি দুর্ঘটনাক্রমে নয়, বরং ইচ্ছাকৃতভাবে দুর্বৃত্তরা আগুন ধরিয়ে দিয়েছে সেখানে, এমনটাই অভিযোগ করেছেন মুনমি।

মুনমি পাইয়েং বলেন, ‘আমরা প্রায় ৪০ মিনিট নৌকা করে ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলাম। তখন আগুনের গ্রাস এতটাই ব্যাপক ছিল যে, শুধু হাতে তা নিয়ন্ত্রণে আনতে অনেকখানি সময় লেগেছে। ক্ষয়ক্ষতি হলেও চেষ্টা করেছি ঘুরে দাঁড়ানোর।’ যাদব পাইয়েংও এ ঘটনায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন। পরিবেশকর্মী, স্থানীয়দের পাশাপাশি রাজনৈতিক মহলেও তীব্র আলোড়ন উঠেছে। অসম কংগ্রেস সভাপতি গৌরব গগৈ কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বলেছেন, ‘এ ধরনের অগ্নিসংযোগ সরকারের ছাড়পত্র ছাড়া সম্ভব নয়। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, এ ঘটনায় বালি মাফিয়াদের হাত থাকতে পারে। আমরা চাই, ওরকম সংবেদনশীল এলাকায় বালি খননের লাইসেন্স বাতিল হোক এবং দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার করা হোক।’ অসম বিধানসভায় বিরোধী দলীয় নেতা দেবব্রত সাঈকিয়া কেন্দ্রীয় পরিবেশ মন্ত্রী ভূপেন্দ্র যাদবকে চিঠি লিখে অগ্নিসংযোগ এবং কোকিলামুখ অঞ্চলের অবৈধ বালি খনন নিয়ে বিচারিক তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেছেন, মোলাই কাথনি বন প্রায় ৫৫০ হেক্টরের বিস্তৃত এবং এটি হাতি, হরিণ, পাখি সহ অসংখ্য প্রজাতির আশ্রয়স্থল, ফলে এটি রক্ষা করা ভীষণ জরুরি।

যাদব পাইয়েং-এর জীবন একেবারে সাধারণ হলেও, তাঁর কাজ আর অধ্যাবসায় ‘অলৌকিক’ । ৬৩ বছর বয়সী এই মানুষটির জন্ম অসমের মিসিং জনজাতিতে। তাঁর বাবা ছিলেন গোপালক, তিনি নিজেও সেই পেশায় রয়েছেন। বর্তমানে তার গোসম্পদ বলতে রয়েছে প্রায় ৫০টি গরু এবং ৫০টি মোষ। স্ত্রী বিনীতা আর ৩ সন্তান— মুনমি, সঞ্জয়, সঞ্জীব-এর সঙ্গে তিনি মোলাই কাথনিবাড়িতে থাকেন। তবে, তিনি এখনো তাঁর অধিকাংশ সময় ব্যয় করেন বৃক্ষ রোপণ এবং পরিবেশ সচেতনতা ছড়িয়ে দেওয়ায় কাজে। শিশুকাল থেকেই প্রকৃতির প্রতি তাঁর বিশেষ আকর্ষণ। তিনি বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই গাছ, পাখি, জীবজন্তু সবই খুব ভালো লাগত। ধীরে ধীরে বুঝেছি, গাছ কেটে ফেললে শুধু গাছের ক্ষতি হয় না, মানুষ-সহ পশু-পাখি, বন্যপ্রাণীরাও বিপদে পড়ে।’ প্রকৃতির এই শিক্ষাই তাঁকে অনুপ্রাণিত করেছে ৪২ বছর আগে বনসৃষ্টির অদম্য দুঃসাহসিক পথে পা রাখার জন্য।

মোলাই কাথনিবাড়িতে তৈরি হওয়া এই বন শুধু গাছের জন্য নয়। এখানে রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, হাতি এবং নানা ধরনের বন্যপ্রাণী আশ্রয় নেয়। ছোটো থেকে বড়ো প্রায় সব ধরনের পাখি, সাপ, ইঁদুর—প্রকৃতির সব জীব এ বনকে নিজের ঠিকানা করেছে। যাদবের অমানুষিক শ্রমে ১৩৬০ একর জুড়ে সৃষ্টি হয়েছে গভীর অরণ্য। শুরুটা হয় আশির দশকে, যখন ব্রহ্মপুত্রের ধারে একটি দ্বীপে তিনি এবং গ্রামের মানুষজন থাকতেন। ভয়ঙ্কর বন্যায় গোটা দ্বীপের মানুষ বাস্তুচুত হন। হাজার হাজার প্রাণী মারা যায়, নষ্ট হয়ে যায় বন। কিশোর যাদব সেদিন মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। এরপর তিনি একে একে বীজ, চারা সংগ্রহ করে নিজ হাতে বন গড়ে তোলেন। বছরের পর বছর সেই চারা মহীরূহ হয়েছে, বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের মধ্যেও ফিরে এসেছে জীববৈচিত্র্য। যাদব পাইয়েং-এর শ্রম আর নিষ্ঠার স্বীকৃতিও এসেছে। ২০১৫ সালে তিনি পদ্মশ্রীতে সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। জেএনইউ-র তরফে তাকে ‘ভারতের অরণ্য-মানব’-খেতাব দেওয়া হয়। তাঁর জীবনভিত্তিক তথ্যচিত্র এবং পূর্ণ দৈর্ঘ্যের চলচ্চিত্রও নির্মিত হয়েছে। তিনি শুধু অসমেই সীমাবদ্ধ নন; মেক্সিকো ও দুবাইয়েও বনাঞ্চল গড়ার কাজেও সাহায্য করেছেন। বিশ্বব্যাপী ক্রমবর্ধমান উষ্ণায়ন রোধে বৃক্ষরোপণের সচেতনতা সৃষ্টি করা অত্যন্ত জরুরি, একথায় তাঁর নিরলস কাজের প্রধান প্রাণশক্তি।

স্থানীয়রা এ ঘটনায় বিস্মিত, শোকাহত। বন সংরক্ষণ এবং পরিবেশ সুরক্ষায় যাদব পাইয়েং এবং মুনমি পাইয়েং-এর অক্লান্ত চেষ্টা কি এবার ধ্বংসের মুখে? পরিবেশবিদরা বলছেন, যাদের স্বার্থে প্রকৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তারা হয়তো প্রতিবাদকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। কিন্তু যারা প্রকৃতিকে ভালোবাসেন, তারাই একা হলেও বন গড়ছেন, বীজ ছড়াচ্ছেন, সবুজ রক্ষা করছেন। মোলাই কাথনি শুধু একটি বন নয়, এটি একটি ‘সবুজ শিক্ষা কেন্দ্র’ যেখানে মানুষ শিখতে পারে কীভাবে ছোটো ছোটো উদ্যোগে বৃহৎ প্রাকৃতিক ক্ষয় রোধ করা যায়। বর্তমানে বন বিভাগ ও মাজুলি পুলিশ ঘটনাস্থলে তদন্ত চালাচ্ছে। তবে, প্রশ্ন উঠছে, অগ্নিকান্ডের ফলে কি ধরনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে ক্ষয়প্রাপ্ত বন এবং এর সংলগ্ন জীববৈচিত্র্যের ওপর!


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!