Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • সেপ্টেম্বর ১৮, ২০২৬

উপনির্বাচনে দিশেহারা তৃণমূল ! শুভেন্দু সাক্ষাতের পর মনোনয়ন প্রত্যাহার নন্দীগ্রামের প্রার্থীর, কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণা মমতার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উপনির্বাচনে দিশেহারা তৃণমূল ! শুভেন্দু সাক্ষাতের পর মনোনয়ন প্রত্যাহার নন্দীগ্রামের প্রার্থীর, কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণা মমতার

উপনির্বাচনের মুখে নন্দীগ্রামে তৃণমূলের অন্দরের টানাপড়েন একের পর এক নতুন অধ্যায় খুলছে। দলীয় নাম এবং প্রতীক নিয়ে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তের পর শুক্রবার আচমকাই নিজের মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের প্রার্থী সঞ্চিতা দে প্রধান। তার আগে তাঁর সাক্ষাৎ হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে। আর সঞ্চিতার প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরই নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থীকে সমর্থনের কথা ঘোষণা করেছেন মমতা। ফলে ভোটের মুখে নন্দীগ্রামের রাজনৈতিক সমীকরণে  আরও এক নাটকীয় পরিস্থিতি।

শুক্রবার দুপুর নাগাদ শুভেন্দুর সঙ্গে দেখা করতে তাঁর ঘরে যান সঞ্চিতা। প্রায় ১টা নাগাদ এই সাক্ষাৎ হয় বলে জানা গিয়েছে। কেন তিনি সেখানে গেলেন, বৈঠকে কী কথা হয়েছে — সে বিষয়ে অবশ্য প্রকাশ্যে কিছু জানাননি সঞ্চিতা। তাঁর এই সাক্ষাতের খবর ছড়িয়ে পড়তেই রাজনৈতিক মহলে শুরু হয় নানা জল্পনা। তার কিছু পরেই জানা যায়, হলদিয়ায় মহকুমাশাসকের দফতরে গিয়ে নিজের মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন তিনি। ঘটনাক্রমে দুটি বিষয় পাশাপাশি আসায় প্রশ্ন আরও জোরালো হয়েছে। কারণ, নন্দীগ্রামে কয়েক দিন আগেই দলের হয়ে মনোনয়ন জমা দিয়েছিলেন সঞ্চিতা। মনোনয়ন জমা দেওয়ার সময় অখিল গিরিকে সঙ্গে নিয়ে তিনি দলীয় প্রার্থী হিসাবে নিজের উপস্থিতি জানান দিয়েছিলেন। প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও দলের পাশে থাকার বার্তাও দিয়েছিলেন। সে প্রার্থীই মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ দিন ঘনিয়ে আসার মুখে আচমকা সরে দাঁড়ালেন।

সূত্রের দাবি, শুভেন্দুর সঙ্গে সাক্ষাতের বিষয়টি একেবারেই গোপন রাখা হয়েছিল। কোথায় যাচ্ছেন বা কার সঙ্গে দেখা করতে যাচ্ছেন, সে বিষয়ে আগে থেকে কাউকে জানাননি তিনি। এমনকি শুক্রবার সকালে নন্দীগ্রাম থেকে বেরোনোর সময়ও বিষয়টি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো ইঙ্গিত দেননি। পরে জানা যায়, তিনি শুভেন্দুর ঘরেই গিয়েছিলেন। তাঁর ঘনিষ্ঠদের একাংশের দাবি, শুভেন্দুর আশীর্বাদ নিতেই সেখানে গিয়েছিলেন সঞ্চিতা। যদিও সাক্ষাতের কারণ কিংবা মনোনয়ন প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত সম্পর্কে নিজে কোনো ব্যাখ্যা দেননি তিনি।

ঘটনাটি নিয়ে তৃণমূলের মমতা-শিবিরের অন্দরে অস্বস্তি তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। নন্দীগ্রামে দলের সাংগঠনিক দুর্বলতার কথাও ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে স্বীকার করেছেন কুণাল ঘোষ। তাঁর বক্তব্য, প্রার্থী চাপ সামলাতে পারেননি। পাশাপাশি নন্দীগ্রামে সংগঠনও দুর্বল। ফলে প্রার্থীকে আগলে রাখা, তাঁর উপর নজরদারি রাখা এবং ভোটের আগে সংগঠনকে সক্রিয় করার যে প্রয়োজন ছিল, তা যথাযথ ভাবে হয়নি। নন্দীগ্রামের এই উপনির্বাচনের সঙ্গে অবশ্য শুভেন্দুর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ-সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও জড়িয়ে রয়েছে। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরের পাশাপাশি নন্দীগ্রাম থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শুভেন্দু। দুই কেন্দ্রেই জয় পাওয়ার পরে নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দেন তিনি। সে কারণেই এই আসনে উপনির্বাচনের প্রয়োজন হয়। একই ভাবে মুর্শিদাবাদের রেজিনগর আসনটি হুমায়ূন কবীর ছেড়ে দেওয়ায় সেখানে উপনির্বাচন হচ্ছে।

আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রাম, রেজিনগরে উপনির্বাচন। ভোটগণনা ৯ অক্টোবর। ফলে মনোনয়ন প্রত্যাহারের শেষ মুহূর্তে নন্দীগ্রামে মমতা-শিবিরের প্রার্থী সরে দাঁড়ানো এবং তার পরেই কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক ভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে উঠেছে। নন্দীগ্রামে বিজেপির প্রার্থী হাসিরানি রথ। তিনি শুভেন্দুর প্রাক্তন আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা। বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে চন্দ্রনাথ রথ খুন হন। ফলে এই কেন্দ্রের লড়াই শুরু থেকেই আলাদা রাজনৈতিক গুরুত্ব বহন করছে। তবে নন্দীগ্রামের ঘটনাকে শুধু একটি প্রার্থীর মনোনয়ন প্রত্যাহারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখছে না সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি। কারণ, একই সময়ে তৃণমূলের দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়েও বড়ো পরিবর্তন ঘটেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের দুই শিবিরের বিরোধ নির্বাচন কমিশনের দরজায় পৌঁছেছিল। সে মামলায় বৃহস্পতিবার রাতে অন্তর্বর্তী নির্দেশ দেয় কমিশন। ‘জোড়াফুল’ প্রতীক ‘ফ্রিজ’ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’ নামটিও কোনো পক্ষ ব্যবহার করতে পারবে না বলে জানানো হয়।

এর ফলে উপনির্বাচনের আগে দুই শিবিরকেই নতুন নাম এবং প্রতীক বেছে নিতে হয়। শুক্রবার কমিশনের তরফে সেই নাম ও প্রতীক চূড়ান্ত করে দেওয়া হয়। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের নাম হয়েছে ‘মমতা সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেস’। প্রতীক ‘ফুটবল পায়ে ফুটবলার’। অন্য দিকে ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের শিবিরের নাম ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং প্রতীক ‘খাম’। নতুন নাম ও প্রতীক পাওয়ার আগে দু-পক্ষই কমিশনের কাছে একাধিক বিকল্প দিয়েছিল। মমতা-শিবিরের তরফে তিনটি নাম প্রস্তাব করা হয়েছিল— ‘সর্বভারতীয় তৃণমূল মমতা কংগ্রেস’, ‘সর্বভারতীয় মমতা তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং ‘মমতা তৃণমূল কংগ্রেস’। প্রতীকের ক্ষেত্রে প্রস্তাব ছিল ‘ফুটবল পায়ে  ফুটবলার’ এবং ‘ক্রিকেট ব্যাট’। শেষ পর্যন্ত ফুটবল খেলোয়াড়ের প্রতীকটি অনুমোদন করে কমিশন।

অন্যদিকে ঋতব্রত-শিবিরের প্রস্তাবিত নামের মধ্যে ছিল ‘জাতীয়তাবাদী তৃণমূল কংগ্রেস’, ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ এবং ‘পশ্চিমবঙ্গ তৃণমূল কংগ্রেস’। প্রতীকের তালিকায় ছিল ‘খাম’, ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ এবং ‘টর্চ’। শেষ পর্যন্ত দ্বিতীয় নাম এবং প্রথম প্রতীকই বরাদ্দ পেয়েছে তাদের শিবির। কমিশনের সিদ্ধান্তের পরে ঋতব্রত জানান, প্রতীকের ক্ষেত্রে তাঁদের প্রথম পছন্দই পাওয়া গিয়েছে। তবে দলের নাম হিসাবে ‘গণতান্ত্রিক তৃণমূল কংগ্রেস’ ছিল তাঁদের তালিকায় তৃতীয়। তাঁর বক্তব্য, প্রথম দুটি নাম কমিশন গ্রহণ করেনি। তবে কমিশনের দেওয়া সিদ্ধান্তকে তাঁরা সম্মান করছেন। একই সঙ্গে মমতা-শিবিরের নামের মধ্যে ব্যক্তির নাম যুক্ত হওয়া নিয়েও কটাক্ষ করেছেন ঋতব্রত। তাঁর বক্তব্য, তাঁদের দলের নামে কোনো ব্যক্তির নাম নেই। গণতন্ত্রকে গুরুত্ব দিয়েই দলের কাঠামো তৈরি করা হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। কোনো ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে দলের পরিচয় তৈরি করা গণতন্ত্রের পক্ষে ক্ষতিকর বলেও মন্তব্য করেন ঋতব্রত।

এদিকে, কমিশনের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন মমতা। তাঁর বক্তব্য, তৃণমূলের নাম ও প্রতীক নিয়ে কমিশনের সিদ্ধান্ত গণতন্ত্রের ইতিহাসে ‘কালো দিবস’। ঘটনাটিকে তিনি ‘দুর্ভাগ্যজনক’, ‘অসাংবিধানিক’, ‘গণতন্ত্র-বিরোধী’ এবং ‘রাজনৈতিক ভাবে পক্ষপাতদুষ্ট’ বলে মন্তব্য করেছেন। তাঁর অভিযোগ, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক পক্ষকে সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ প্রসঙ্গে মহারাষ্ট্রের উদ্ধব ঠাকরে এবং শরদ পওয়ারের দলের ভাঙনের প্রসঙ্গও টেনে এনেছেন মমতা। তাঁর অভিযোগ, এর আগে উদ্ধব ঠাকরের দলের প্রতীক কেড়ে নেওয়া হয়েছিল এবং এনসিপি-র ক্ষেত্রেও দল ভাঙার পরে প্রতীক নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। তাঁর দাবি, একই ধরনের পরিস্থিতির মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁর দলকেও।

ভোটপ্রক্রিয়া নিয়েও একাধিক অভিযোগ তুলেছেন মমতা। এসআইআর, ভোট, গণনার সময় কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপস্থিতি, কাউন্টিং এজেন্টদের বের করে দেওয়া এবং ইভিএম নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়াই ‘হাইজ্যাক’ করা হয়েছে। এমনকি ‘মধ্যরাতে গণতন্ত্র হত্যা’ করা হয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। তবে এগুলি মমতার রাজনৈতিক অভিযোগ; সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান আলাদা হতে পারে। এ আবহেই নন্দীগ্রামে সঞ্চিতার মনোনয়ন প্রত্যাহার নতুন মাত্রা যোগ করেছে। শুক্রবার নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহারের পরই মমতা সমাজমাধ্যমে লাইভে এসে নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা করেন। কংগ্রেসকে ‘সিস্টার পার্টি’ এবং ‘ন্যাচারাল অ্যালায়েন্স’ বলে উল্লেখ করে তিনি জানান, বিজেপির বিরুদ্ধে তাঁরা একসঙ্গে লড়বেন।

মমতা জানিয়েছেন, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বৃহস্পতিবার তাঁকে ফোন করেছিলেন। দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী অরবিন্দ কেজরীবালের সঙ্গেও তাঁর কথা হয়েছে বলে দাবি করেছেন তিনি। নন্দীগ্রামে কংগ্রেসকে সমর্থনের সিদ্ধান্ত জানালেও রেজিনগর আসন নিয়ে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। পরে সেই সিদ্ধান্ত জানানো হবে বলে জানিয়েছেন মমতা। ফলে এক দিকে দলীয় নাম ও প্রতীক নিয়ে কমিশনের নির্দেশ, অন্যদিকে নন্দীগ্রামে নিজস্ব প্রার্থীর সরে দাঁড়ানো এবং কংগ্রেসকে সমর্থনের ঘোষণা — উপনির্বাচনের ঠিক আগে তৃণমূলের রাজনৈতিক সমীকরণ দ্রুত বদলাচ্ছে। নন্দীগ্রামে এই নতুন সমীকরণের প্রভাব ভোটের ফলাফলে কী ভাবে পড়বে, তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে প্রার্থী প্রত্যাহারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মমতা-শিবিরের অন্দরের সাংগঠনিক প্রশ্নগুলি নতুন করে সামনে এসেছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!