- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬
গ্রেফতারির বিরুদ্ধে হাই কোর্টে নন্দীগ্রামের কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধান, পাঁচ মামলায় রক্ষাকবচের আবেদন
নন্দীগ্রাম উপনির্বাচনের আগে জেলবন্দি কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানের গ্রেফতারি ঘিরে আইনি লড়াই শুরু হলো কলকাতা হাই কোর্টে। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন-পর্বের একটি পুরনো মামলায় গ্রেফতার হয়ে বর্তমানে জেল হেফাজতে থাকা মিলন তাঁর গ্রেফতারির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে হাই কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছেন। পাশাপাশি, তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আরও পাঁচটি মামলায় যাতে তাঁকে গ্রেফতার করা না হয়, সে সংক্রান্ত রক্ষাকবচও চাওয়া হয়েছে।
সোমবার সকালে বিচারপতি সৌগত ভট্টাচার্যের এজলাসে বিষয়টি নিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন মিলনের আইনজীবী অয়ন ভট্টাচার্য। তাঁর বক্তব্য শোনার পর মামলা দায়েরের অনুমতি দেন বিচারপতি। আগামী মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর মামলাটির শুনানি হওয়ার কথা। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গত শুক্রবার পূর্ব মেদিনীপুরের চণ্ডীপুর এলাকা থেকে মিলনকে গ্রেফতার করা হয়। ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলনের সময়কার একটি পুরনো মামলায় তাঁর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে গ্রেফতারি পরোয়ানা ছিল বলে পুলিশের দাবি। শনিবার তাঁকে হলদিয়া মহকুমা আদালতে হাজির করানো হলে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেওয়া হয়।
হাই কোর্টে সোমবার মিলনের আইনজীবী গ্রেফতারির বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, পুরনো আরও কয়েকটি মামলায় তাঁর মক্কেলকে গ্রেফতার করা হতে পারে। আদালতে জানানো হয়, একটি মামলায় ইতিমধ্যেই গ্রেফতার করা হয়েছে মিলনকে। আরও পাঁচটি মামলায় গ্রেফতারির আশঙ্কা রয়েছে। সেই কারণেই ওই মামলাগুলিতে রক্ষাকবচ চাওয়া হয়েছে। আইনজীবীর বক্তব্য, আগামী ৬ অক্টোবর নন্দীগ্রামে উপনির্বাচন। সে ভোটে কংগ্রেসের প্রার্থী মিলন। ফলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে একের পর এক পুরনো মামলায় গ্রেফতারের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সে পরিস্থিতিতে আদালতের হস্তক্ষেপ চাওয়া হয়েছে।
পুলিশের দাবি, ২০০৭ সালে নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের সময়কার একাধিক মামলায় দীর্ঘদিন ধরে মিলনের বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি ছিল। তাঁর বিরুদ্ধে মোট চারটি খুনের অভিযোগ রয়েছে বলেও পুলিশ সূত্রে জানানো হয়েছে। এ ছাড়াও খুনের চেষ্টা, খুনের উদ্দেশ্যে অপহরণ, প্রমাণ লোপাট, অনধিকার প্রবেশ এবং অস্ত্র আইনের মতো ধারায় মামলা রয়েছে বলে পুলিশের দাবি। পুলিশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মিলনের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলির মধ্যে তিনটি নন্দীগ্রাম থানায় এবং একটি খেজুরি থানায় দায়ের হয়েছিল। অভিযোগগুলির অধিকাংশই ২০০৭ সালের নন্দীগ্রাম আন্দোলন-পর্বের। পুলিশের বক্তব্য, ওই মামলাগুলিতে দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর বিরুদ্ধে জামিন-অযোগ্য গ্রেফতারি পরোয়ানা কার্যকর ছিল। নির্বাচন কমিশনের নির্দেশ মেনে পুরনো সেই পরোয়ানা কার্যকর করতেই তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে বলে পুলিশের দাবি। এর মধ্যে রবিবার আরও একটি মামলা যুক্ত হওয়ায় মিলনের বিরুদ্ধে মামলার সংখ্যা বেড়ে পাঁচ হয়েছে।
মিলনের গ্রেফতারির মধ্যেই তাঁর স্ত্রী অর্পিতা প্রধানের একটি ভিডিয়োবার্তা প্রকাশ্যে এসেছে। সেখানে জেলবন্দি স্বামীর হয়ে নন্দীগ্রামের মানুষের কাছে ভোট চেয়েছেন তিনি। একই সঙ্গে মিলনকে পুরনো এবং ‘মিথ্যা’ মামলায় ফাঁসানোর অভিযোগও তুলেছেন অর্পিতা। যদিও এই অভিযোগ তাঁর নিজস্ব বক্তব্য; এর স্বাধীন সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। ভিডিয়োবার্তায় অর্পিতা প্রশ্ন তুলেছেন, এত দিন নিয়মিত এলাকায় যাতায়াত করা সত্ত্বেও কেন আগে মিলনকে গ্রেফতার করা হয়নি। তাঁর বক্তব্য, ভোট দিতে, পুজোর সময়ে এবং কয়েক মাস আগেও মিলন এলাকায় গিয়েছিলেন। তা হলে কংগ্রেসের প্রার্থী হওয়ার পরেই কেন তাঁকে গ্রেফতার করা হল, সেই প্রশ্ন তুলেছেন তিনি।
অর্পিতার আরও অভিযোগ, ২০০৭ সালের পুরনো একটি মামলায় তাঁর স্বামীকে ফাঁসানো হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বিচারব্যবস্থার প্রতি আস্থার কথাও জানিয়েছেন তিনি। পরিবারের আর্থিক ও সামাজিক পরিস্থিতির কথাও তুলে ধরে নন্দীগ্রামের মানুষের কাছে মিলনকে ভোট দেওয়ার আবেদন করেছেন অর্পিতা। ভিডিয়োবার্তায় ভোটারদের উদ্দেশে তাঁর আবেদন, ইভিএমে ২ নম্বরে থাকা কংগ্রেসের বোতামে ভোট দিয়ে মিলনকে জয়ী করা হোক। জেলবন্দি প্রার্থীর হয়ে স্ত্রীর এই প্রচার উপনির্বাচনের আগে নতুন রাজনৈতিক মাত্রা যোগ করেছে।
মিলনের গ্রেফতারির সময় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্ব। দলের বক্তব্য, নন্দীগ্রামে কংগ্রেসের সাংগঠনিক শক্তি সীমিত। সেই পরিস্থিতিতে উপনির্বাচনের আগে দলীয় প্রার্থীর গ্রেফতারির পিছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে কংগ্রেস। শনিবার হলদিয়া আদালত চত্বরে উপস্থিত ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার। মিলনের জামিনের জন্য প্রয়োজনে কলকাতা হাই কোর্টে যাওয়ার কথাও জানিয়েছে দল। প্রদেশ কংগ্রেসের মুখপাত্র অজিতেশ পাণ্ডে জানিয়েছেন, প্রার্থীকে দ্রুত জেল থেকে বার করার জন্য প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ করা হবে। অন্যদিকে, পুলিশের বক্তব্য, গ্রেফতারির সঙ্গে নির্বাচনী রাজনীতির কোনও যোগ নেই। তাদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর থাকা গ্রেফতারি পরোয়ানার ভিত্তিতেই আইনানুগ পদক্ষেপ করা হয়েছে।
মিলনের গ্রেফতারির সময়টিও নন্দীগ্রামের উপনির্বাচনের রাজনৈতিক সমীকরণের কারণে আলোচনায় এসেছে। মনোনয়ন পর্ব থেকেই এই কেন্দ্রকে ঘিরে টানাপড়েন চলছিল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের মনোনীত তৃণমূল প্রার্থী সঞ্চিতা প্রধান দে মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর মমতা ঘোষণা করেন, তাঁর দল নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থন করবে। সে ঘোষণার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ২০০৭ সালের পুরনো মামলায় মিলনের গ্রেফতারি হয়। ঘটনাপ্রবাহকে সামনে রেখে রাজনৈতিক মহলে নানা প্রশ্ন উঠলেও গ্রেফতারির সঙ্গে ওই রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে — এমন কোননো আদালত-নির্ধারিত তথ্য এখনো সামনে আসেনি।
২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে ভবানীপুরের পাশাপাশি নন্দীগ্রাম থেকেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন শুভেন্দু অধিকারী। দুই কেন্দ্রেই জয়ী হওয়ার পরে তিনি নন্দীগ্রাম আসনটি ছেড়ে দেন। সেই কারণেই এই কেন্দ্রে উপনির্বাচন হচ্ছে। এ বার বিজেপি প্রার্থী করেছে শুভেন্দুর নিহত আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ রথের মা হাসিরানি রথকে। অন্য দিকে, তৃণমূলের প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ার পর কংগ্রেস প্রার্থী মিলন প্রধানকে সমর্থনের ঘোষণা করেছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দল। নন্দীগ্রামের এই উপনির্বাচনে কংগ্রেস, বিজেপি ও তৃণমূলের পাশাপাশি ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়ের গণতান্ত্রিক তৃণমূল, সিপিআই এবং আইএসএফ-ও প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছে। ফলে বহুমুখী লড়াইয়ের আবহে মিলনের গ্রেফতারি এবং তাঁর স্ত্রীর প্রচার নতুন করে আলোচনায় এসেছে। এখন নজর ২২ সেপ্টেম্বর কলকাতা হাই কোর্টের শুনানির দিকে। মিলনের গ্রেফতারি আইনসঙ্গত কি না, এবং তাঁর বিরুদ্ধে থাকা আরও পাঁচটি মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা থেকে কোনও অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দেওয়া হবে কি না — আদালতের নির্দেশেই তার পরবর্তী দিকটি স্পষ্ট হবে।
❤ Support Us





