Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • ডিসেম্বর ১১, ২০২৫

সীমান্ত অঞ্চলে মাদক-সন্ত্রাসের বাড়বাড়ন্ত, জঙ্গি সংগঠনে বাড়ছে অর্থায়ন; উত্তর-পূর্বে ‘চিকেনস নেক’-কে অশান্ত করবার চেষ্টা?

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সীমান্ত অঞ্চলে মাদক-সন্ত্রাসের বাড়বাড়ন্ত, জঙ্গি সংগঠনে বাড়ছে অর্থায়ন; উত্তর-পূর্বে ‘চিকেনস নেক’-কে অশান্ত করবার চেষ্টা?

গোল্ডেন ক্রিসেন্ট এবং গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেলের মধ্যবর্তী অঞ্চল ভারতের জন্য দীর্ঘদিন ধরে ‘নারকোটেররিজম’ বা মাদক-সন্ত্রাস ছড়ানোর জন্য মাথাব্যথার কারণ। অন্যান্য দেশে যেখানে মাদক পাচার প্রধানত সন্ত্রাস অর্থায়নের জন্য করা হয়, সেখানে ভারতীয় প্রেক্ষাপটে পরিস্থিতি আরও জটিল এবং বহুমাত্রিক। জঙ্গি গোষ্ঠী ও মাদক পাচার সিন্ডিকেটের মধ্যে এক ধরনের সহমর্মী সম্পর্ক তৈরি হয়েছে, যা পশ্চিম সীমান্ত থেকে শুরু করে পাঞ্জাব ও জম্মু-কাশ্মীর, উত্তর ও উত্তর-পূর্বের অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মিজোরাম, মণিপুর, অসম, মেঘালয় থেকে দক্ষিণের সমুদ্র বেষ্টিত রাজ্য পর্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ত্র, মাদক এবং অর্থের লেনদেন সীমান্ত পারাপারের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। মায়ানমার, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, শ্রীলঙ্কার মতো প্রতিবেশি দেশের মাদক-সন্ত্রাসী গোষ্ঠীগুলোর সক্রিয় সহযোগিতা সমস্যাকে আরো জটিল করছে। সম্প্রতই, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি দক্ষিণ আফ্রিকার জি-২০ সম্মেলনে ভারতের মাদক-সন্ত্রাসের প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘এটা শুধু ভারত নয়, গোটা বিশ্বের জন্যই উদ্বেগের কারণ।’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মুখেও মেক্সিকো, ভেনেজুয়েলা সম্পর্কে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের অরুণাচল প্রদেশ, নাগাল্যান্ড, মণিপুর এবং মিজোরাম মায়ানমারের সঙ্গে ১,৬২৪ কিলোমিটার সীমান্ত ভাগ করে। এই অঞ্চলগুলো গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল থেকে আসা মাদকের প্রধান পরিবহন পথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ১৯৭০ এবং ১৯৮০-এর দশকে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলো মাদক চোরাচালান প্রতিরোধে কঠোর নীতি গ্রহণের পর, মণিপুরের মোরেহ এবং মিজোরামের চাম্পাই নতুন চোরাচালান রুট হিসেবে উঠে আসে। এক সময়ের অনেক বিদ্রোহী গোষ্ঠী, যেমন আইএসসিএ এবং খাপল্যাং শাখা, ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব অসম এবং কুকি মিলিশিয়ারা, তাদের কার্যক্রমের জন্য মাদক বিক্রি বা অন্য পাচারকারীদের থেকে লাভের অংশ গ্রহণ করত। মায়ানমারে সামরিক অভ্যুত্থানের পর ২০২১ সালে আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে এবং স্থানীয় অঞ্চলগুলোতে অন্তবর্তী সরকারের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে যায়। এর ফলে আফিম চাষ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। ২০২৩ সালে মায়ানমারে অপিয়াম উৎপাদন বেড়ে ১,০৮০ মেট্রিক টনে পৌঁছেছে, যা ২০২০ সালের তুলনায় প্রায় তিনগুণ। সেখান থেকে ১৫৪ মেট্রিক টন হেরোইন বৈশ্বিক বাজারে রপ্তানি হয়েছে, যার মধ্যে ভারতও অন্তর্ভুক্ত। সীমান্ত রক্ষাকারী অসম রাইফেলস জানিয়েছে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ভারত-মায়ানমার সীমান্তে প্রায় হাজার কোটি টাকার বেশি মাদক ও অস্ত্র জব্দ হয়েছে।

আফগানিস্তানেও একই চিত্র। তালিবানের ২০২২ সালের আগস্টের আফিম নিষেধাজ্ঞার পর দাম বৃদ্ধির কারণে কৃষকরা সর্বাধিক লাভের সুযোগে অবৈধ মাদক বিক্রি করেছেন। সেসময় থেকে মেথামফেটামিন এবং অন্যান্য সিন্থেটিক ড্রাগেরও উৎপাদন বেড়েছে। জাতিসংঘের একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হাক্কানি নেটওয়ার্ক এ সিন্থেটিক ড্রাগ উত্পাদন ও পাচারে জড়িত এবং ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও এদের জাল বিস্তৃত। সমুদ্রপথে মাদক পাচারও ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ভারতীয় নারকোটিকস কন্ট্রোল ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ভারতের বন্দর ও উপকূলীয় অঞ্চলে ২,৮২৬ কেজি মাদক জব্দ করা হয়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৪ সালে নৌবাহিনী ও এনসিবি এক অভিযানে ৩,১৩২ কেজি মাদক উদ্ধার করেছে, যার মূল্য প্রায় ১,০০০ কোটি টাকা। সীমান্তে ড্রোনের ব্যবহারও নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ২০২৩ সালে ভারতীয় সীমান্তে ১১৯টি ড্রোন ধ্বংস করা হয়েছে।

পাঞ্জাব, জম্মু-কাশ্মীর, নাগাল্যাণ্ড, মণিপুরে মাদকপাচারের সঙ্গে সন্ত্রাসী কার্যক্রমের যোগ স্পষ্ট। বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, পাকিস্তান সমর্থিত জঙ্গি কার্যকলাপের সঙ্গে মাদক পাচার নিবিড়ভাবে জড়িত। জম্মু-কাশ্মীরে জঙ্গি কর্মকাণ্ডের প্রাথমিক অর্থায়নের প্রায় ১৫ শতাংশই মাদক বাণিজ্য থেকে আসে। সীমান্ত পেরিয়ে অস্ত্র, মাদক এবং অর্থ পাঠানোর ক্ষেত্রে পাকিস্তানভিত্তিক সিন্ডিকেট এবং সন্ত্রাসী সংস্থার সক্রিয় ভূমিকা রয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রাপথে সম্প্রতি একটি নতুন উদ্বেগ ছড়িয়েছে শিলিগুড়ি করিডরকে ঘিরে। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, চরমভাবে সশস্ত্র সীমান্ত এলাকা বা ‘চিকেনস নেক’-কে অশান্ত করতে মাদকপাচারকারী সংস্থাগুলি কাজ করছে। সাম্প্রতিক সাত দিনে শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের বিভিন্ন এলাকায় ব্রাউন সুগার, গাঁজা, কাফ সিরাপসহ মাদক উদ্ধার হয়েছে। পুলিশ, স্পেশাল টাস্ক ফোর্স, স্পেশাল অপারেশন গ্রুপ, বিএসএফ এবং এসএসবি-সহ একাধিক এজেন্সি অভিযানে জড়িত। গত ছয় মাসে শিলিগুড়ি কমিশনারেট এলাকা থেকে প্রায় কুড়ি কোটি টাকার মাদক বাজেয়াপ্ত হয়েছে, যার মধ্যে ৩০ কেজিরও বেশি ব্রাউন সুগার উদ্ধার হয়েছে। ১০৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

পুলিশ জানাচ্ছে, গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গেল এলাকা—, মায়ানমার, লাওস ও থাইল্যান্ড মাদক উৎপাদনের মূল কেন্দ্র। শান ও সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকার লুকানো ল্যাব থেকে হেরোইন, ব্রাউন সুগার ও মেথামফেটামিন তৈরি হয়ে মণিপুর, মিজোরাম, নাগাল্যান্ডে প্রবেশ করছে। শিলিগুড়িতে পৌঁছানোর জন্য মূলত তিনটি রুট ব্যবহৃত হচ্ছে। একটি রুট আমনাজি, শিলচর, গুয়াহাটি হয়ে সড়কপথে আসছে। অন্যটি মণিপুর ও অসম হয়ে, আর তৃতীয়টি মিজোরাম, ত্রিপুরা, অসম হয়ে উত্তরবঙ্গে প্রবেশ করছে। স্বাস্থ্যসামগ্রী বা যাত্রিবাহী যানবাহনের আড়ালে মাদক সহজেই গন্তব্যে পৌঁছায়। শিলিগুড়ি পৌঁছানোর পর মাদকদ্রব্যের একাংশ স্থানীয় বাজারে ছড়িয়ে পড়ে, আর একাংশ রেল ও সড়কপথে বিহার, উত্তরপ্রদেশ হয়ে বাংলাদেশের দিকে চলে যায়। সেনা গোয়েন্দাদের মতে, কিছু মাদক সরাসরি মায়ানমার থেকে ঢুকে বাংলাদেশে যায়। এই কারবারে পাক গুপ্তচর সংস্থা আইএসআই ব্যবসায়ীদের আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা করছে।

মাদক ব্যবসায়ীরা নতুন কৌশল ব্যবহার করছে। কলেজ পড়ুয়া তরুণ-তরুণীদের কাজে লাগাচ্ছে, দ্রুত উপার্জনের আশায় কমবয়সিরা কারবারে জড়াচ্ছে। মাদক বিক্রির জন্য কোড নেম ব্যবহার হচ্ছে—ব্রাউন সুগারকে ‘চিনি’, হেরোইনকে ‘দুধ’, ক্রিস্টাল মেথকে ‘কাচ’, ইয়াবাকে ‘লাল চকোলেট’ বা ‘ট্যাব’, গাঁজাকে ‘তেজপাতা’, কাফ সিরাপকে ‘লাল বোতল’ বা ‘কোল্ড ড্রিঙ্ক’ বলা হচ্ছে। রাজ্য পুলিশের পদস্থ আধিকারিক জানিয়েছেন, আমরা জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করেছি। উত্তর-পূর্ব ভারতের মাদক প্রবাহ উত্তরবঙ্গে প্রবেশ না করতে দেওয়াই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। সেইমতো সকল এজেন্সি ও বিভাগের কর্মকর্তাদের বিশেষ নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী বিভিন্ন এলাকায় বিগত কয়েকমাসে বিএসএফ ও পুলিশের একাধিক অভিযানে পাহাড় প্রমাণ মাদক ও অস্ত্র উদ্ধার হয়েছে। আজই, পূর্ব-বর্ধমানের নাদনঘাট-পূর্বস্থলী এলাকায় একটি গাড়িকে তাড়া করে প্রায় ৮৩ কেজি গাঁজা সমেত ২ জনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পুলিশের দাবি, প্রায় ৮৩ কেজি গাঁজা উদ্ধার হয়েছে। তদন্তকারীদের অনুমান, গাঁজা ভর্তি গাড়িটি মুর্শিদাবাদ দিক থেকে হুগলির দিকে যাচ্ছিল। বিপুল পরিমাণ গাঁজা কোথা থেকে এল, কোথায় যাচ্ছিল, ধৃতদের সঙ্গে আর কে কে রয়েছে, এসবের খোঁজখবর করছে পুলিশ।

এমন সংগঠিত মাদক পাচার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ এবং সন্ত্রাসী অর্থায়ন বন্ধ করা নিরাপত্তা বাহিনী, পুলিশ-প্রশাসন ও গোয়েন্দা সংস্থার জন্য জটিল কাজ। ভারতে, এ চ্যালেঞ্জ আরো জটিল দুর্গম ওঠে দুর্নীতি, সক্ষমতার অভাব এবং সংস্থা-সংস্থা সমন্বয়হীনতার কারণে। তবে, ভারত সরকার, নিরাপত্তা হুমকি মোকাবিলার জন্য নানা সময়ে একাধিক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। উদাহরণস্বরূপ, কেন্দ্র ও রাজ্য সংস্থা এনসিবি এবং নৌ-সেনা সম্মিলিতভাবে কাজ করছে। ২০০৮ সালে, মুম্বাইতে জঙ্গি হামলার পর, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক কেন্দ্র ও রাজ্য সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে এবং সন্ত্রাসবাদ-সংক্রান্ত তথ্য আন্তঃস্তরে আদান-প্রদাম করার জন্য একটি ‘মাল্টি-এজেন্সি সেন্টার’ স্থাপন করে। ২০১৬ সালে, নরকোটিক কো-অর্ডিনেশন সেন্টার তৈরি করা হয়। এছাড়াও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক তথ্য ব্যবস্থাপনার জন্য একটি পোর্টাল এবং তদন্তের জন্য জয়েন্ট কো-অর্ডিনেশন কমিটি স্থাপন করে।আন্তর্জাতিক সহযোগিতাও বাড়ছে। আন্তর্জাতিক সংস্থা যেমন ইন্টারপোল এবং শাংহাই কো-অপারেশন অর্গানাইজেশন-এর সঙ্গে সহযোগিতা বাড়ছে। তবে আফগানিস্তান-পাকিস্তান ও মধ্য এশিয়ার অনেক মাদক বাণিজ্য নজর এড়িয়ে যাচ্ছে, যা আঞ্চলিক সন্ত্রাসী সংস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ অর্থায়নের উৎস। পরিচালনাগত স্তরে সংস্থা-সংস্থা সমন্বয় এখনও স্বতঃসিদ্ধ ও এলোমেলো। রাজ্য পুলিশ কর্মকর্তাদের মতে, কেন্দ্রীয় সংস্থার অতিরিক্ত ক্ষমতা কার্যকর হয়ে, কেন্দ্র-রাজ্য সমন্বয়কে বাধাগ্রস্ত করছে। দেশের আমজনতার মধ্যে মাদকের ব্যবহারও বৃদ্ধি পাচ্ছে। ২০১৯ সালের জরিপ অনুযায়ী, প্রায় ১.২ শতাংশ লোক অবৈধ গাঁজা ব্যবহার করেছে, এবং ২.১ শতাংশ প্রায় ২.২৬ কোটি লোক আফিম ব্যবহার করেছে। নিশ্চিতভাবেই ভারত ‘নারকোটেররিজম’ মোকাবিলায় পদক্ষেপ নিয়েছে, তবে এ লড়াই দীর্ঘ এবং কঠিন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!