- এই মুহূর্তে দে । শ
- ডিসেম্বর ১, ২০২৫
রাজ্যে অচল প্রায় ১ কোটি জনধন অ্যাকাউন্ট, প্রশ্নের মুখে কেন্দ্রের ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প
লেনদেনের অভাবে পশ্চিমবঙ্গের প্রায় ১ কোটি জনধন অ্যাকাউন্ট কার্যত অকেজো। আর সেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে কেন্দ্রের অন্যতম ‘ফ্ল্যাগশিপ’ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ। অভিযোগ উঠছে, রাজ্যকে শায়েস্তা করতে গিয়ে কেন্দ্র এমন এক পরিস্থিতি তৈরি করেছে, যার ফলে নিজেরাই কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে ৫ কোটিরও বেশি জনধন অ্যাকাউন্ট রয়েছে বাংলায়। তার মধ্যে লক্ষাধিক অ্যাকাউন্ট গত দুই বছরেরও বেশি সময় কোনো লেনদেন না হওয়ায় অকেজো তালিকায় চলে গিয়েছে। ব্যাংক মহলের মতে, এই অ্যাকাউন্টগুলির বড়ো অংশই সচল ছিল ‘মনরেগা’ বা একশো দিনের কাজের টাকায়। গ্রামের শ্রমিকেরা ১০০ দিনের কাজের মজুরি সরাসরি পেতেন জনধন অ্যাকাউন্টে। কেন্দ্রীয় বরাদ্দ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সেই অর্থপ্রবাহ থেমে গিয়েছে। ফলত, মানুষও আর এই অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করার প্রয়োজন অনুভব করেননি।
ব্যাংকিং নিয়ম অনুযায়ী দীর্ঘ সময় টাকার লেনদেন না থাকলে ওই অ্যাকাউন্টকে অকেজো বলে গণ্য করা হয়। কেন্দ্র অবশ্য দাবি করেছে, গণহারে কোনও অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বরং নিত্যদিনই প্রচার চলছে যাতে নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্ট ফের সক্রিয় হয়। এসএমএস, ই-মেল, চিঠি, সব মাধ্যমেই গ্রাহকদের কাছে পৌঁছনোর চেষ্টা করছে ব্যাংকগুলি। পঞ্চায়েত এলাকাতে বিশেষ শিবিরের আয়োজন করে বহু অ্যাকাউন্ট পুনরায় চালু করা হচ্ছে বলেও জানানো হয়েছে। অল ইন্ডিয়া ব্যাংক এমপ্লয়িজ অ্যাসোসিয়েশনের সর্বভারতীয় সভাপতি রাজেন নাগরের বক্তব্য, ‘মনরেগার টাকা না আসায় অগণিত মানুষ ব্যাংকে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছেন। যেখানে টাকাই নেই, সেখানে লেনদেনের উৎসাহ কোথা থেকে আসবে? শুধু অ্যাকাউন্ট খুললেই আর্থিক অন্তর্ভুক্তি হয় না। পরিষেবা নিশ্চিত করতে না পারলে প্রকল্পের উদ্দেশ্য ব্যর্থ হবেই।’ তাঁর অভিযোগ, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলিতে কাজের চাপ বাড়ছে, কর্মীসংখ্যা বাড়ছে না, ফলে সাধারণ মানুষের পরিষেবা আরো ব্যাহত হচ্ছে।
রাজ্য সরকার সূত্রে খবর, আড়াই কোটি জব কার্ড হোল্ডারের মধ্যে যাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের মতো প্রকল্প থেকে নিয়মিত টাকা পান, তাঁদের অ্যাকাউন্ট এখনো সচল। তা না হলে নিষ্ক্রিয় অ্যাকাউন্টের সংখ্যা আরো গুরুতর আকার নিত। গত জুলাইয়ে, কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক স্পষ্ট জানিয়েছিল, এ ধরনের খবর একেবারেই ভিত্তিহীন। কোনৈ ব্যাংককে অ্যাকাউন্ট বন্ধের নির্দেশ দেওয়া হয়নি। বরং ১ জুলাই থেকে তিন মাসব্যাপী বিশেষ প্রচারাভিযান শুরু হয়েছে, যার লক্ষ্য জনধন অ্যাকাউন্ট ও বিভিন্ন সামাজিক সুরক্ষা প্রকল্পকে আরো মানুষের নাগালে পৌঁছে দেওয়া। ঠিক এ সময়েই সামনে এসেছে জনধন অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত আর একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, শূন্য ব্যালেন্স থাকা সত্ত্বেও টাকা তোলার সুবিধা। অধিকাংশ গ্রাহকই জানেন না যে জনধন অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স না থাকলেও ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত ওভারড্রাফ্ট নেওয়া যায়। অর্থাৎ অ্যাকাউন্টে কোনো টাকা জমা না থাকলেও ব্যাংক গ্রাহককে জরুরি প্রয়োজনে কিছুটা অর্থ তোলার অনুমতি দেয়। ব্যাংকে গিয়ে আবেদন করলেই সাধারণত এই সুবিধা মেলে, তবে ব্যাংকের সঙ্গে সম্পর্ক ভালো থাকা আবশ্যক। এটি তাৎক্ষণিক ক্ষুদ্র ঋণের মতো কাজ করে, যা অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকলেই সমন্বয় হয়ে যায়। যদিও সামান্য সুদ গুনতে হয়, তবু জরুরি পরিস্থিতিতে এই ওভারড্রাফ্ট বহু মানুষের ভরসা হয়ে ওঠে। তবে ব্যাংক কর্মকর্তারা সতর্ক করেছেন, ওভারড্রাফ্ট বারবার নিলে অ্যাকাউন্ট ঋণাত্মক হয়ে যেতে পারে। সময়মতো অর্থ পরিশোধ না করলে ক্রেডিট স্কোরেরও ক্ষতি হতে পারে। ব্যাঙ্কভেদে নিয়মকানুন আলাদা হওয়ায় গ্রাহকদের আগে থেকেই নিয়ম জেনে নেওয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন তাঁরা।
এ ছাড়াও, সাধারণ সেভিংস অ্যাকাউন্টেই ফিক্সড ডিপোজিটের মতো উচ্চ সুদ পাওয়া যায়, এমন সুবিধা সম্পর্কেও অনেক গ্রাহক অজ্ঞাত। ব্যাংকগুলির ‘অটো সুইপ’ সুবিধা চালু থাকলে সেভিংস অ্যাকাউন্টে নির্দিষ্ট অঙ্কের বেশি টাকা জমা পড়লেই সেই অতিরিক্ত অংশ স্বয়ংক্রিয়ভাবে ফিক্সড ডিপোজিটের মতো হার অনুযায়ী সুদ অর্জন করতে থাকে। আবার, প্রয়োজন হলে একই স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় টাকা সেভিংস অ্যাকাউন্টে ফেরত আসে। শর্তসাপেক্ষ হলেও এই সুবিধা অনেকের সঞ্চয় বাড়াতে বড়ো ভূমিকা রাখতে পারে। কেন্দ্রের দাবি, জনধন যোজনা আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে দেশের ইতিহাসেই সবচেয়ে বিস্তৃত প্রকল্প। দেশে ইতিমধ্যে ৫৪ কোটিরও বেশি অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে। তাই গণহারে অ্যাকাউন্ট বন্ধ করা প্রকল্পের মূল দর্শনের বিরোধীই নয়, অচিন্তনীয়ও। বরং গ্রাহকদের সক্রিয় হয়ে ওঠার আহ্বান জানাচ্ছে সরকার, যাতে তাঁরা নানা সরকারি প্রকল্পের সুবিধা সময়মতো পান এবং আর্থিক নিরাপত্তা আরো দৃঢ় হয়। তবে মনরেগার অর্থপ্রবাহ বন্ধের জেরে যে বিপুল সংখ্যক অ্যাকাউন্ট নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে, সে বাস্তবতাই এখন বড়ো প্রশ্ন তুলে দিচ্ছে, অ্যাকাউন্ট খুলে জনপ্রচার করলে কি আর্থিক অন্তর্ভুক্তি সম্পূর্ণ হয়? নাকি প্রকল্পকে কার্যকর করতে হলে টাকার প্রবাহই প্রধান শর্ত? সময়ই তার উত্তর দেবে।
❤ Support Us






