- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- নভেম্বর ২৫, ২০২৫
বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনের প্রাকমুহূর্তে নয়া সমীকরণ ! এনসিপির ব্যতিক্রমী জোটের আভাস, বৃহৎ জোটের লক্ষ্যে বিএনপি, জামাত চায় আসন সমঝোতা
ঢাকার বাতাসে রাজনৈতিক উত্তেজনার কুয়াশা ক্রমশই ঘন হচ্ছে। জাতীয় নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার দিন যত ঘনিয়ে আসছে, দেশের রাজনীতি ততই জটিল সমীকরণে আবদ্ধ হচ্ছে। এমনই সময় দুই দিনব্যাপী মনোনয়ন প্রত্যাশীদের সঙ্গে আলোচনার পর এনসিপির অস্থায়ী কার্যালয়ে দাঁড়িয়ে নতুন বিস্ফোরক বার্তা দিলেন জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সমন্বয়ক নাসিরুদ্দীন পাটোয়ারী। তাঁর দাবি, বিএনপি–জামায়াতের প্রচলিত দ্বৈরথের বাইরে গিয়ে দেশে জন্ম নিতে চলেছে এক নতুন রাজনৈতিক বলয়। খুব শিগগিরই দেশের মানুষ দেখতে পাবে নতুন একটি জোট, যারা ধর্মীয় ফ্যাসিবাদ, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে তিনশো আসনেই প্রার্থী দাঁড় করানোর প্রস্তুতি নিচ্ছে।
পাটোয়ারীর কথায় আত্মবিশ্বাস, আর তার ভেতরেই লুকানো প্রচলিত রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ ছোড়ার বার্তা। তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের যে আকাঙ্ক্ষা দেশের মানুষ বুকের ভেতর ধারণ করে আছে, সেই চাহিদাকে পূরণ করতেই নতুন জোটের প্রস্তুতি। সংস্কারের পক্ষে, নারী–অধিকার রক্ষার পক্ষে, আর দুর্নীতি ও সন্ত্রাসবিরোধী অবস্থান নিয়েই গড়ে উঠবে এই রাজনৈতিক বলয়। সংবাদ সম্মেলনে একপর্যায়ে মঞ্চে উঠে দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আব্দুল্লাহ তুললেন গুরুতর অভিযোগ। তাঁর দাবি, জাতীয় পার্টিকে সামনে রেখে ভারত এবং আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী অংশ নির্বাচনী প্রক্রিয়া নস্যাৎ করার অপচেষ্টায় লিপ্ত। এমন মন্তব্যে রাজনৈতিক অঙ্গনে আগুন লেগেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। তিনি আরো বলেন, জুলাই অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত প্রশাসনের ওপর দখলদারির পুরনো অভ্যাস থেকে বেরিয়ে রাষ্ট্রযন্ত্রকে পুনর্গঠনের পথে যাওয়া। এনসিপির নেতাদের কণ্ঠে নতুন প্রজন্মের নতুন রাজনীতি কাঠামোর দাবি, যেখানে ধবনিত হচ্ছে— দল নয়, রাষ্ট্রকে রূপান্তর করার আহ্বান।
জুলাই সনদ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের দাবিকে সামনে রেখে কয়েকটি দল ইতিমধ্যেই নিজেদের মধ্যে সমন্বয়ের কাজ প্রায় শেষ করেছে। আলোচনার সূত্রে বোঝা যাচ্ছে, এনসিপি, আমার বাংলাদেশ পার্টি, রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন, ইউনাইটেড পিপলস বাংলাদেশ এবং গণতন্ত্র মঞ্চের একটি দল এই উদীয়মান বলয়ের অগ্রভাগে থাকবে। রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত সংস্কারই এ জোটের প্রধান লক্ষ্য। নির্বাচন অবশ্যই রয়েছে তাদের গুরুত্ব-তালিকার শীর্ষে, কিন্তু তাদের চোখ আরো দূরবর্তী। তবে এই প্রথম নয়। গত অক্টোবরেই একবার জোট গঠনের আলোচনা জমেছিল, কিন্তু নানা কারণে তা স্থগিত হয়ে যায়। পরে একটি বৈঠকে সাতটি দল একসঙ্গে বসে জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও নির্বাচন— এই দুই ইস্যুকে কেন্দ্র করে আবার আলোচনার সূত্রপাত করে। অন্যদিকে, এনসিপির এই তৎপরতার মধ্যেই বিএনপি নিজস্ব বৃহৎ জোট তৈরিতে ব্যস্ত। আন্দোলনের সময় যারাই নাগরিক প্রতিরোধে ছিল— বাম, ডান, ইসলামপন্থি, মধ্যমপন্থি, সবাইকে একসঙ্গে আনার চেষ্টা করছে খালেদা জিয়ার দল। বিএনপির লক্ষ্য একটাই, হাসিনা-পরবর্তী পরিস্থিতির যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, সেটিকে বিস্তৃত জোটের মাধ্যমে পূরণ করা। সব দলের নিজস্ব প্রতীক নিয়ে ভোটে দাঁড়ানোর বাধ্যবাধকতা এবার রাজনীতির শরীরেই নতুন জটিলতা সৃষ্টি করেছে। ফলে বড়ো দলগুলো এখন আরো সাবধানী— কাকে কত আসন ছাড়বে, আর কোন দল শেষ পর্যন্ত কোন শিবিরে দাঁড়াবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এদিকে জামায়াতে ইসলামি অন্য পথে হাঁটছে। তারা সরাসরি জোট নয়, নির্বাচনী সমঝোতার কৌশলই এগোতে চাইছে। চট্টগ্রামে দলের প্রধান শফিকুর রহমান এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, প্রচলিত জোট নয়, বরং নির্বাচনে সুবিধাজনক অবস্থানে থাকার জন্য প্রয়োজনমতো ‘এক আসনে এক প্রার্থী’ কৌশল গ্রহণ করা হবে। অর্থাৎ যেখানে জামায়াতের সম্ভাবনা বেশি, সেখানকার শক্তিশালী প্রার্থীদের সঙ্গে বোঝাপড়া করে নেয়া হবে। তাদের সাতটি ইসলামি দলের সমমনোভাবাপন্ন প্ল্যাটফর্মের প্রসঙ্গও উঠে আসে তাঁর বক্তব্যে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, নিষিদ্ধ অতীত থেকে মুক্ত হয়ে জামায়াত এখন আবার প্রভাব বাড়াতে চাইছে, বিশেষত বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররাজনীতিতে যেখানে সাম্প্রতিক নির্বাচনে ছাত্রশিবিরের উপস্থিতি এবং সাফল্য তাদের নতুন অক্সিজেন জোগাচ্ছে। এনসিপি যদিও একাধিকবার জানিয়েছে, আসন সমঝোতার কোনো পথে তারা হাঁটবে না। কিন্তু রাজনৈতিক অন্দরে আলোচনা থেমে নেই। গণ অধিকার পরিষদের সঙ্গেও তাদের কিছু ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। যদিও প্রকাশ্যে কোনো পক্ষই কিছু স্বীকার করছে না।
উল্লেখ্য, জুলাই সনদে স্বাক্ষর নিয়ে জামায়াতের আকস্মিক অবস্থান বদলানো এনসিপি নেতাদের ক্ষুব্ধ করেছিল। সামাজিক মাধ্যমে তাদের নতুন প্রজন্মের কিছু নেতা স্পষ্ট ভাষায় লিখেছিলেন, এই দেশে ধর্মের নামে প্রভাব বিস্তার বা প্রশাসনে ছদ্মবেশী অনুপ্রবেশের রাজনীতি আর চলবে না। বাম ঘরানার মধ্যে আবার আলাদা ব্যস্ততা। সিপিবি, বাসদ, বিপ্লবী কমিউনিস্ট লীগসহ ছয় দলের বাম গণতান্ত্রিক জোটও নতুন বলয় গড়ার চেষ্টায়। দলিত, আদিবাসী, সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্ম, সবাইকে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ চলছে। একইসঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা, গণফোরাম, ঐক্য ন্যাপ সবই নিজেদের মতো করে জোটের কাঠামো খোঁজার চেষ্টা করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মহম্মদ মাহবুবুর রহমানের বিশ্লেষণে স্পষ্ট, এবারের নির্বাচনে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা নয়, বরং জোট এবং আসন সমঝোতাই ফল নির্ধারণ করবে। প্রতীক আলাদা হলেও আসন ছাড় প্রক্রিয়াই সবচেয়ে বড়ো রাজনৈতিক অস্ত্র।
❤ Support Us






