Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • আগস্ট ১৮, ২০২৫

‘রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে নির্বিচারে শাস্তি দেওয়া যাবে না’, সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় সুপ্রিম রক্ষাকবচ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
‘রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে নির্বিচারে শাস্তি দেওয়া যাবে না’, সাংবাদিকতার স্বাধীনতায় সুপ্রিম রক্ষাকবচ

সুপ্রিম কোর্ট বলছে, ‘রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে সাংবাদিকদেরনির্বিচারে শাস্তি দেওয়া যাবে না। কোনো সংবাদসংস্থা বা সাংবাদিক সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করলেও তা দেশের সার্বভৌমত্ব বা ঐক্যের ক্ষতি করে না।’ মামলার শুনানি, ২০২০ সালের ঘটনার আকস্মিকতায়, ধারবাহিকতায়। উত্তরপ্রদেশের হাথরসে এক দলিত তরুণীর উপর নারকীয় যৌন নির্যাতন ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় সারা দেশ যখন প্রতিবাদে উত্তাল, তখন কেরলের সাংবাদিক সিদ্দিক কাপ্পান সেখানে খবর সংগ্রহ করতে যাচ্ছিলেন। কিন্তু মাঝপথেই উত্তরপ্রদেশ পুলিশ তাঁকে আটক করে। অভিযোগ, তিনি রাষ্ট্রদ্রোহের ষড়যন্ত্রে যুক্ত। বিনা বিচারে দিনের পর দিন জেলবন্দি থাকেন কাপ্পান। এ ঘটনা নিছক ব্যতিক্রম নয়। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তুলে সাংবাদিক আসিফ সুলতান, ফাহাদ শাহ, সাজ্জাদ গুল, রূপেশকুমার সিং, গৌতম নাভালখা, প্রবীর পুরকায়স্থ—তালিকা দীর্ঘ এবং আশঙ্কাজনকভাবে ক্রমবর্ধমান।

সংবাদ মাধ্যমের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ও প্রতিহিংসার কারণ একটাই। স রকারের বিরুদ্ধে, সরকারি নীতির ব্যর্থতা নিয়ে তাঁরা কথা বলেছিলেন, দৃঢ় কণ্ঠে, বলিষ্ট অকম্পিত কলমে প্রতিবেদন লিখেছিলেন। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভের কাজই সরকারক প্রশ্ন করা, জণগণের হয়ে অধিকারের আওয়াজ তোলা, অথচ সে কাজকেই আজকের ‘নয়া ভারতে’ কার্যত অপরাধে পরিণত করা হয়েছে। রাজনৈতিক দল ও ক্ষমতার পদলেহন করাকে প্রতিষ্টিত করা হয়েছে স্বাভাবিকতায়।

ঠিক যেমনটা হয়েছে সম্প্রতি ‘অপারেশন সিঁদুর’ সংক্রান্ত এক সাংবাদিক প্রতিবেদনের ক্ষেত্রেও। ইন্দোনেশিয়ার এক অনুষ্ঠানে ভারতীয় দূতাবাসের প্রতিরক্ষা সহচর ক্যাপ্টেন শিব কুমার মন্তব্য করেছিলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব পাকিস্তানের সামরিক ঘাঁটিতে আক্রমণের অনুমতি দেয়নি বলেই ভারতীয় বায়ুসেনা যুদ্ধবিমান হারিয়েছে। ওই মন্তব্যের ভিত্তিতে একটি সর্বভারতীয় ডিজিটাল সংবাদ-পোর্টাল একটি সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। ১১ জুলাই অসমের মোরিগাঁও থানায় সেই প্রতিবেদনের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৫২ নম্বর ধারায় মামলা দায়ের করেন এক বিজেপি নেতা। সে ধারায় দেশের সার্বভৌমত্ব, অখণ্ডতা, নিরাপত্তা বিপন্ন করার অভিযোগ আনা যায়। ওই মামলার প্রেক্ষিতে সাংবাদিক সিদ্ধার্থ বরদা রাজন ও ওই সংবাদপোর্টালের বিরুদ্ধে অসম পুলিশ যে কোনো মুহূর্তে কঠোর পদক্ষেপ নিতে পারে, এই আশঙ্কায় সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন।

গত ১২ অগস্ট, ওই মামলার শুনানিতে বিচারপতি সূর্য কান্ত ও বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর ডিভিশন বেঞ্চ অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, ‘কোনো সাংবাদিকের প্রতিবেদন বা ভিডিওকে রাষ্ট্রদ্রোহের উদাহরণ হিসেবে বিচার করা যায় না। কেউ সংবাদ পরিবেশন করলেই তা দেশের সার্বভৌমত্ব বা ঐক্য নষ্ট করে, এমনটা ধরে নেওয়া যায় না। এমন তো নয় যে কেউ অবৈধ কাজ করছে বা অস্ত্র পাচার করছে।’ আদালতের পর্যবেক্ষণ শুধুমাত্র ওই মামলার নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে থেমে থাকেনি। সুপ্রিম আদালত নির্দেশ দেন, আপাতত বরদা রাজন বা তাঁর সংবাদ পোর্টাল-এর বিরুদ্ধে জোরপূর্বক কোনো পদক্ষেপ নিতে পারবে না অসম পুলিশ। সে সঙ্গে কেন্দ্র সরকারকেও এ বিষয়ে নোটিশ পাঠানো হয়েছে।

শীর্ষ আদালতের রায় শুধু এক সাংবাদিক বা একটি সংবাদমাধ্যমকে রক্ষা করার নিছক পদক্ষেপ নয়, বরং এক বৃহত্তর বার্তা। যেখানে সাংবাদিকতার মূল কাজ, অর্থাৎ প্রশ্ন তোলা, সমালোচনা করা কিংবা সত্য উদঘাটনের চেষ্টা, তাকে আর রাষ্ট্রদ্রোহের আড়ালে চাপা দেওয়া যাবে না। তথ্য বলছে, ২০১৮ সাল থেকে ভারতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে অন্তত ২১টি রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়েছে। ২০২৩ সালের ‘প্রিজন সেন্সাস’ রিপোর্ট অনুযায়ী, সে সময় দেশে যে ৭ জন সাংবাদিক জেলে ছিলেন, তাঁদের মধ্যে ৫ জনই রাষ্ট্রদ্রোহ আইনে অভিযুক্ত। তাঁদের অপরাধ ছিল, হাতরাস কাণ্ড নিয়ে রিপোর্ট করা, কৃষি আইন নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ, কোভিডের সময় স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর ব্যর্থতা তুলে ধরা কিংবা সরকারের কোনো নীতির কঠোর সমালোচনা। শুধুমাত্র স্তাবকতা না করে, সমালোচনা করাই তাঁদের একমাত্র ‘অপরাধ’।

সুপ্রিম কোর্টের এ রায়কে স্বাগত জানিয়েছে ইন্ডিয়ান জার্নালিস্টস ইউনিয়ন (আইজেইউ)। তাদের বক্তব্য, কোর্টের এ নির্দেশ শুধু সাংবাদিকদের জন্য নয়, দেশের গণতন্ত্রের জন্য এক বড়ো জয়। আইজেইউ-র সভাপতি গীতার্থ পাঠক জানিয়েছেন, ‘শীর্ষ আদালতের রায় দেশের সমস্ত সাংবাদিকদের কাছে আশার আলো। যারা শুধুমাত্র নিজের কাজ করায় আইনি হয়রানির শিকার হন, তাঁদের জন্য এই নির্দেশ একটি শক্ত বার্তা—সাংবাদিকতা অপরাধ নয়।’ একইসঙ্গে আইজেইউ-র সাধারণ সম্পাদক ও আন্তর্জাতিক সাংবাদিক ফেডারেশনের সহ-সভাপতি সাবিনা ইন্দ্রজিত বলেন, ‘এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক মহলেও স্পষ্ট বার্তা দিচ্ছে যে, ভারতের বিচারব্যবস্থা সংবাদমাধ্যমের পাশে রয়েছে। সত্য বলার দায়িত্বে থাকা সাংবাদিকরা যেন ভয় ছাড়াই কাজ করতে পারেন, সেটাই গণতন্ত্রের প্রধান শর্ত।’

বস্তুত, গত কয়েক বছরে যেভাবে বিভিন্ন রাজ্যে, বিশেষ করে বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোতে সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে ধারাবাহিক ভাবে রাষ্ট্রদ্রোহ বা রাষ্ট্রবিরোধী কার্যকলাপের অভিযোগ এনে মামলা হয়েছে, তা ঘিরে উদ্বেগ বাড়ছিল। সেই প্রেক্ষিতে সুপ্রিম কোর্টের এমন রায় শুধু একক কোনো মামলার নিষ্পত্তি নয়, বরং সাংবাদিকতার পরিসর রক্ষার লড়াইয়ে এক মাইলফলক। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বা সংবাদমাধ্যমের দায়িত্বকে যাতে আইনের অপব্যবহার করে দমিয়ে দেওয়া না যায়, তা নিশ্চিত করতেই এই রায়। আদালতের স্পষ্ট বার্তা—প্রশ্ন তোলা অপরাধ নয়, বরং সাংবাদিকতার মৌলিক, অবধারিত কাজ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!