- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ৭, ২০২৫
প্রবল দুর্যোগের আঁধার পেরিয়ে স্বাভাবিকতার চেষ্টায় উত্তরবঙ্গ
উত্তরবঙ্গে দুর্যোগের পর ২ দিন পেরিয়েছে। প্রাণ হারিয়েছেন ৩২ জন মানুষ। নিখোঁজ বেশ কয়েকজন। বানের তোড়ে অসংখ্য ঘরবাড়ি ভেসে গিয়েছে। হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন ঘরবাড়ি ছেড়ে ত্রাণশিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন। অনেকের মনে ১৯৯৩ সালের ভয়াবহ বন্যার ছবি ভেসে উঠছে। ত্রাণশিবিরে পৌঁছেও খাবার-জল বিতরণে দেরি হওয়ায় ক্ষোভ জমাচ্ছে। ভেসে আসছে সবহারার আর্তনাদ। মঙ্গলবার, পাহাড় ও সমতলে পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পথে। দিকে দিকে চলছে ত্রাণশিবির আর প্রশাসনের তৎপরতা। আবহাওয়া কিছুটা ভালো হতেই পাহাড় থেকে নামতে শুরু করেছেন পর্যটকরা। দার্জিলিং থেকে সমতলে নামার হিল কার্ট রোড এবং পাঙ্খাবাড়ি রোড সোমবার সকাল থেকেই খোলা রয়েছে। বিজনবাড়িতে আটকে পড়া পর্যটকদের বেশিরভাগকে এ রাস্তাগুলো ব্যবহার করে নামানো হয়েছে।
জানা যাচ্ছে, দার্জিলিংয়ের রোহিণী রোড রবিবার সাময়িকভাবে খোলা হয়েছিল, সোমবার থেকে তা আবার বন্ধ। দুধিয়ার ভাঙা সেতুর কারণে মিরিকের রাস্তা আংশিকভাবে বন্ধ। সেনা সেখানে পৌঁছে বেলি ব্রিজ তৈরির পরিকল্পনা করছে। সিকিমের কালিম্পং-লাভা-লোলেগাঁও রুট খোলা রয়েছে। মিরিক, বিজনবাড়ি, সুখিয়োপোখরি, মিলিং রোডসহ বিভিন্ন ব্লকে মেরামতির কাজ চলছে। পাহাড়ে আটকে থাকা পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য গোর্খা টেরিটোরিয়াল অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (জিটিএ) নির্দেশ দিয়েছে ‘সেফ ট্রাভেল’ মেনে চলার। মঙ্গলবারের মধ্যে প্রায় ৪০০০ পর্যটক শিলিগুড়িতে নামতে পেরেছেন। অনেক পর্যটক রবিবার ট্রেনে ওঠার কথা ছিল, কিন্তু ধস ও ভারী বর্ষণের কারণে তা সম্ভব হয়নি।
দুর্যোগের প্রভাব পড়েছে উত্তরবঙ্গের জাতীয় উদ্যান ও চা বাগানেও। গোরুমারা অভয়ারণ্য ও জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানের জঙ্গল সাফারি আপাতত বন্ধ। জঙ্গল সাফারি বন্ধ রাখা হয়েছে। জঙ্গলের ভিতরে ভেঙে যাওয়া কাঠের সেতু এবং প্লাবিত রুট মেরামত হওয়া পর্যন্ত পর্যটকদের প্রবেশ আপাতত নিষিদ্ধ। বনমন্ত্রী বীরবাহা হাঁসদা বনদপ্তরের কর্মীদের সঙ্গে পরিস্থিতি খতিয়ে দেখছেন। জলদাপাড়া বনাঞ্চলের ভেতর দিয়ে উত্তর-দক্ষিণে প্রবাহিত শিসামারা নদী। কয়েক বছর আগে নদীতে একটি জিও-সিন্থেটিক বাঁধ তৈরি করা হয়। কিছুদূর দক্ষিণে গড়ে ওঠে বোল্ডার বাঁধ। জিও-সিন্থেটিক বাঁধটি গত বর্ষায় আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এবার বর্ষার আগে সেচ দপ্তর বোল্ডার বাঁধ তৈরি করে। সেচমন্ত্রী মানস ভুঁইয়া বাঁধটি দেখতে আসেন। সোমবার হঠাৎ শিসামারা নদী ফুলেফেঁপে ওঠে এবং বাঁধের একটি অংশ ভেঙে যায়। এরপর ঘোলা জল প্রবাহিত হয়ে শালকুমারহাটের নেপালিবস্তি, নতুনপাড়া, মুন্সিপাড়া, ভালুকারপাড়া, প্রধানপাড়া ও সিধাবাড়িতে ঢুকে পড়ে।
চা বাগানে ক্ষতির পরিমাণ বিপুল। ডুয়ার্সের ৪০টি চা বাগান প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী প্রায় ১১ কোটি টাকার ক্ষতির মুখে। জলমগ্ন বাগান, ভাঙা রাস্তা ও সেতু, চা গাছের ক্ষতি চা শ্রমিক ও মালিকদের উদ্বিগ্ন করেছে। জলপাইগুড়ির নাগরাকাটা চ্যাংমারি বাগানসহ অন্যান্য বাগানও বিপন্ন। আলিপুরদুয়ারের মেচকাপাড়া বাগানে ৬ হাজার শ্রমিক প্রভাবিত। এখানে ২ হাজার চা গাছ, ৩০ ফুট লম্বা বাঁধ, ১০০ ফুট রাস্তা ও ৩ টি কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি, আলিপুরদুয়ার-১ ব্লকের ৩ টি পঞ্চায়েত—শালকুমার-১, শালকুমার-২ ও পূর্ব কাঁঠালবাড়ি—এর প্রায় ১০০ হেক্টর আমন ধান ডলোমাইট মিশ্রিত পলিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চাষিরা বলছেন, একদিনের দুর্যোগে বছরের পরিশ্রম নষ্ট হয়েছে।
ভূমিধসের ধাক্কায় পাহাড়ে পর্যটকদের নিরাপত্তার জন্য রবিবার দার্জিলিংয়ের টাইগার হিল, সান্দাকফু, রক গার্ডেন ভ্রমণে জিটিএ নিষেধাজ্ঞা জারি করলেও সোমবার সবই খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে পাহাড়ের অনেক জায়গায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির প্রভাব রয়েছে। রাস্তা ধসে গিয়েছে, স্থানীয় বাড়িঘরের পাশাপাশি হোটেল, রিসর্টগুলিও ক্ষতিগ্রস্ত। ফিরিতি পথে গাড়ি ভাড়া ও উড়ানের ক্ষেত্রে পর্যটকেরা সমস্যায় পড়ছেন। গ্যাংটক বা দার্জিলিং থেকে ফেরার গাড়ি ভাড়া ১০–১২ হাজার টাকা, বাগডোগরা থেকে কলকাতাগামী বিমানের ভাড়া ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগে বন্যপ্রাণীরাও ক্ষতি হয়েছে। গভীর অরণ্যেও ঢুকছে বানের জল। আশ্রয়হীন কয়েকশো পশুপাখি। কখনো জলে ভেসে উঠেছে তাদের দেহ। জলদাপাড়া জাতীয় উদ্যানে ৩টি গণ্ডার ভেসে গেছে, ২টি উদ্ধার হয়েছে বলে জানা যাচ্ছে। কয়েকটি হরিণ গোরুমারায় প্লাবিত এলাকা থেকে ময়নাগুড়ি ও ধূপগুড়ি ব্লকের লোকালয়ে চলে গেছে। বনদপ্তর এখনো পর্যবেক্ষণ চালাচ্ছে।
আবহাওয়াবিদরা জানান, ভারী বৃষ্টির ধারা আপাতত নেই। সপ্তাহের মাঝামাঝি থেকে বর্ষা কমতে পারে। আলিপুর আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, মঙ্গলবার থেকে আকাশ ঝলমলে, কোথাও আংশিক মেঘলা। পর্যটক ও স্থানীয়দের প্রশাসনের পরামর্শ, সড়ক পরিস্থিতি বুঝে নিরাপদ যাতায়াত করতে হবে।
❤ Support Us






