Advertisement
  • দে । শ
  • জুলাই ৯, ২০২৫

আবার বাংলাজুড়ে এনআরসি আতঙ্ক ! গণতন্ত্রে আঘাত, ঘুরপথে এনআরসি আনছে বিজেপি, দাবি মমতার

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
আবার বাংলাজুড়ে এনআরসি আতঙ্ক ! গণতন্ত্রে আঘাত, ঘুরপথে এনআরসি আনছে বিজেপি, দাবি মমতার

দিনহাটার বাসিন্দা উত্তম ব্রজবাসীর ঘাড়ে এখন ‘বিদেশি’ তকমা। ৫০ বছরের বেশি সময় ধরে বাংলায় বসবাস করেও তাঁর কপালে অনুপ্রবেশকারীর অপবাদ! পরিচয়পত্রের অভাব নেই, অথচ অসমের বিদেশি ট্রাইবুনাল থেকে শমন এসে পৌঁছেছে তাঁর বাড়ির ঠিকানায়। এ ঘটনাকে ঘিরে ফের বাংলার আকাশে ভেসে উঠেছে এনআরসি আতঙ্ক। তৃণমূল বলছে, বিজেপি সরকার বাংলায় পা না রেখেই এনআরসি চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

নাগরিকত্ব, বসবাস, ভোটাধিকার— সব কিছুই প্রশ্নের মুখে পড়েছে এই একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। উত্তম ব্রজবাসী, কোচবিহারের দিনহাটার বাসিন্দা, রাজবংশী সম্প্রদায়ের মানুষ। ১৯৬৬ সালে প্রথম ভোটার তালিকায় নাম উঠেছিল তাঁর। রয়েছে আধার, ভোটার পরিচয়পত্র, রেশন কার্ডসহ সব রকম বৈধ নথি। তবুও অসমের কামরূপ জেলা থেকে চিঠি এসে বলছে, তিনি ‘বিদেশি’। নির্দেশ এসেছে, আগামী ১৫ জুলাইয়ের মধ্যে কামরূপ জেলা পুলিশ সুপারের দফতরে হাজিরা দিতে হবে এবং ভারতীয় নাগরিকত্বের প্রমাণ দাখিল করতে হবে। প্রশ্ন উঠছে, অসম সরকার কীভাবে বাংলা রাজ্যের একজন বাসিন্দাকে বিদেশি বলে সন্দেহ করছে? এর পেছনে কি রাজনৈতিক উদ্দেশ্য আছে? বাংলায় কি ঘুরপথে নাগরিকত্ব পরীক্ষার যন্ত্রটি চালু করার চক্রান্ত চলছে?

এমন প্রশ্নগুলোকে সামনে রেখেই মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ খুলেছেন। তাঁর কণ্ঠে ধ্বনিত হলো ক্ষোভ ও প্রতিরোধের আহ্বান। পদ্মশিবিরের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তুলে সমস্ত বিরোধী দলকে একজোট হওয়ার বার্তা দিয়েছেন তিনি। সমাজমাধ্যমে পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘গত ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে উত্তম ব্রজবাসী এই বাংলার বাসিন্দা। তাঁর সমস্ত বৈধ পরিচয়পত্র থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বিদেশি সন্দেহে হয়রানি করা হচ্ছে। এটি গণতন্ত্রের উপর পরিকল্পিত আক্রমণ ছাড়া কিছু নয়। বিজেপি অসমে ক্ষমতায় থেকে পশ্চিমবঙ্গে এনআরসি চাপিয়ে দিতে চাইছে, যা সম্পূর্ণ অসাংবিধানিক।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে ভয় দেখানো, ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়া এবং তাঁদের পরিচয় মুছে ফেলার চেষ্টা করছে বিজেপি। বাংলা কখনো এই ষড়যন্ত্র মেনে নেবে না।’

এই ঘটনার প্রতিবাদে উত্তাল দিনহাটা। স্থানীয় তৃণমূল নেতৃত্ব উত্তমবাবুর পাশে দাঁড়িয়েছেন। তাঁর বাড়ি থেকে গাড়ি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছে বিডিও অফিসে। পরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে মহকুমা শাসকের দফতরে। ইতিমধ্যেই তৃণমূল বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা করেছে চৌধুরীরহাটে। রাজ্যের উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহ এই ঘটনাকে ‘রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ষড়যন্ত্র’ বলে অভিহিত করেছেন। এ দলনেত্রীর সুরেই অবস্থায় বিজেপিকে নিশানা করলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর অভিযোগ, ‘বাংলায় পিছনের দরজা দিয়ে এনআরসি চালু করতে চাইছে বিজেপি। এই রাজ্যে তাদের জনসমর্থন নেই, শাসন করার নৈতিক অধিকার নেই।’ তিনি লিখেছেন, ‘অসমে ডিটেনশন শিবিরের যেভাবে মানুষকে বন্দি করা হয়েছে, সেই মডেল বাংলায় চালু করার চেষ্টা করছে বিজেপি। বাংলায় পা না রেখেই যদি তারা এই ঔদ্ধত্য দেখাতে পারে, তাহলে কখনো ক্ষমতায় এলে কী হবে, তা ভেবেই আতঙ্ক হয়।’

স্মরণ করিয়ে দেওয়া প্রয়োজন, ২০১৯ সালের ২২ ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দিল্লির এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘আমরা সরকারে আসার পর এনআরসি নিয়ে কোনও আলোচনা করিনি।’ এরপর কেন্দ্রও বহুবার সেই অবস্থান জানিয়েছিল। কিন্তু বাস্তব ছবি বলছে, আবারও যেন সেই ইস্যুই ফিরে আসছে। এবারের ফোকাস পশ্চিমবঙ্গ। প্রমাণ মিলছে। আরএসএস-এর সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী সংস্থা ‘অখিল ভারতীয় প্রতিনিধিসভা’-র মার্চ মাসের বার্ষিক বৈঠকে নাগরিক পঞ্জি নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলেই সূত্রের দাবি। সেখানে কয়েকটি রাজ্যে এই ব্যবস্থা কীভাবে কার্যকর করা যায়, তা নিয়ে নীতিগত রূপরেখাও নাকি তৈরি হয়েছে। আরএসএস নেতাদের একাংশের বক্তব্য, ‘অসম এবং পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজ্যে বেআইনি অনুপ্রবেশের কারণে জনসংখ্যার ভারসাম্য বদলে যাচ্ছে। বেআইনি অভিবাসীদের চিহ্নিত করে বহিষ্কার করাই এখন সময়ের দাবি।’

এ আবহে সামনে এসেছে ২০২৬-২৭ সালের জনগণনার কথা। সূত্র বলছে, সেই সময়েই জাতীয় জনসংখ্যা রেজিস্টার বা এনপিআর আপডেট করার সম্ভাবনা প্রবল। যদিও সরকার এখন পর্যন্ত জাতীয় নাগরিক পঞ্জি চালুর বিষয়ে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানায়নি, তবে ২০১৯ সালে মন্ত্রিসভা এনপিআর ও এনআরসি উভয়কেই অনুমোদন দিয়েছিল, প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা বাজেট বরাদ্দ করা হয়েছিল। কোভিড অতিমারির কারণে সেই কাজ স্থগিত হয়ে যায়। কী এই এনআরসি! ২০০৩ সালের নাগরিকত্ব আইন সংশোধনের মাধ্যমে সংযুক্ত করা হয় ধারা ১৪ক, যেখানে বলা হয়েছে, প্রতিটি নাগরিককে জাতীয় তালিকায় নথিভুক্ত করা বাধ্যতামূলক। এই আইনের নিয়ম অনুযায়ী, এনপিআর-এর তথ্যের ভিত্তিতে নাগরিকদের যাচাই করে, সন্দেহভাজনদের চিহ্নিত করা যেতে পারে। চিঠি দিয়ে জানানো হবে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে, তাঁর নাগরিকত্ব নিয়ে সন্দেহ আছে। এই নিয়মের ফলে বহু নিরীহ মানুষ নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বাধ্য হবেন, এবং যাঁরা তা দিতে পারবেন না, তাঁদের নাম জাতীয় নাগরিক তালিকা থেকে বাদ পড়তে পারে। বিতর্কে নতুন মাত্রা যোগ করেছিল নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন বা সিএএ। ২০১৯ সালে সংসদে পাশ হওয়া এই আইনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও আফগানিস্তান থেকে আসা হিন্দু, শিখ, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, পারসি ও জৈন সম্প্রদায়ভুক্ত মানুষদের, যদি তারা ২০১৪ সালের ৩১ ডিসেম্বরের আগে ভারতে এসে থাকেন, তবে তাঁদের আর অবৈধ অনুপ্রবেশকারী বলা যাবে না এবং তাঁরা ভারতের নাগরিকত্বের দাবিদার হবেন। সরকারের মতে, এটি এক মানবিক আইন। তবে বিরোধীদের মতে, এই আইন দেশের ধর্মনিরপেক্ষ সংবিধানের পরিপন্থী। কারণ, এখানে মুসলমান সম্প্রদায়কে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ রাখা হয়েছে। ফলে এই আইন নাগরিকত্বের ভিত্তিতে ধর্মীয় বিভাজন তৈরি করছে। ফলে সে সময় পুরো প্রক্রিয়া ঘিরে দেশজুড়ে শুরু হয় প্রবল আন্দোলন। চাপে পড়ে মোদি সরকার জানায়, সারাদেশে কোথাও এনআরসি লাগু হবে না। যদিও বাস্তব চিত্র খানিক ভিন্ন। বিজেপি শাসিত অসমে, ২০১৯ সালের ৩১ আগস্ট এনআরসির চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশিত হয়। যাতে বাদ গিয়েছে ১৯ লক্ষ ৬ হাজার ৬৫৭ জন মানুষের নাম। এই মুহূর্তে আটক হয়ে ডিটেনশন ক্যাম্পে দিন কাটাচ্ছেন কয়েক লক্ষ ‘নাগরিক’।

এখন প্রশ্ন, সরকার যেখানে বারবার বলছে এনআরসি চালুর বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি, সেখানে কেন ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে পশ্চিমবঙ্গে এবং বিহারে অনেক মানুষের নাম বাদ পড়ছে? বিহারে সম্প্রতি শুরু হয়েছে ভোটার যাচাই প্রক্রিয়া, যেখানে বহু বাসিন্দাকে নাগরিকত্বের প্রমাণ দিতে বলা হয়েছে, এমনকি কোথাও কোথাও এনআরসি সার্টিফিকেট পর্যন্ত চাওয়া হয়েছে। সূত্র বলছে, একই পদ্ধতি এখন বাংলাতেও চালু করতে চাইছে নির্বাচন কমিশন। ফলে আশঙ্কা, পশ্চিমবঙ্গেও ঘুরপথে শুরু হয়েছে নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রস্তুতি। আজকের দিনহাটার উত্তম ব্রজবাসী, কাল হয়তো আরো শত শত পরিবার। তবে এর জবাব দিতে প্রস্তুত বাংলার শাসক দল। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হুঁশিয়ারি, ‘গণতন্ত্রের রক্ষার্থে বাংলা কখনো চুপ করে বসে থাকবে না।’


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!