- এই মুহূর্তে দে । শ
- জানুয়ারি ২৯, ২০২৫
রাজ্যে ট্যাব দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড উত্তর দিনাজপুরের প্রধান শিক্ষক। শিক্ষকের কাজে স্তম্ভিত শিক্ষকমহল
রাজ্যের স্কুলগুলিতে ট্যাব দুর্নীতির প্রধানচক্রী বলে অনুমান করা হয়েছিল চোপড়ার মাঝিয়ালি হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষককে। গ্রেপ্তারের আঁচ পেয়ে ওই শিক্ষক গা-ঢাকা দেন নেপাল সীমান্তে। অবশেষে ইসলামপুর থেকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ
রাজ্যের গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প ‘তরুণের স্বপ্ন’। এই প্রকল্পে সরকারি স্কুলগুলির একাদশ এবং দ্বাদশ শ্রেণির পড়ুয়াদের পড়াশোনার সুবিধার্থে ট্যাব কেনার জন্য রাজ্য সরকার ১০ হাজার টাকা করে দেয়। যাতে আধুনিক সময়ের সাথে টাল মিলিয়ে প্রত্যন্ত এলাকার ছাত্রছাত্রীরা বাড়তি সুযোগ পায়। সিলেবাসের বাইরে নতুন কিছু শিখতে পারে। সেই শিক্ষামুখী প্রকল্প নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। এ বছর অনেক ছাত্রছাত্রী ট্যাব কেনার টাকা পাননি বরং তা ঢুকেছে অন্য কোনো অ্যাকাউন্টে। কলকাতা থেকে শুরু করে জেলার একাধিক স্কুলে ঘটে। ঘটনার তদন্তে নেমে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশ ও সিআইডির বিশেষ দল উত্তর দিনাজপুর, দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা, পূর্ব বর্ধমান, মালদা, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিম বর্ধমান, ঝাড়গ্রামের সরকারি স্কুলের শিক্ষককে গ্রেপ্তার করে। কিন্তু তদন্তকারী কর্তাদের মনে সন্দেহ জেগেছিল – জিজিটাল জালিয়াতির পিছনে একটা বড়ো চক্র রয়েছে ।
শুরু হয় খোঁজ। মূলত উত্তর দিনাজপুর থেকেই এই ট্যাব দুর্নীতির কলকাঠি নাড়া হয়েছিল বলে খবর পায় পুলিশের সাইবার ক্রাইম দপ্তর। উঠে আসে চোপড়ার মাঝিয়ালি হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মহম্মদ মোফতাজুল ইসলামের নাম। তিনিই এ দুর্নীতির মাস্টারমাইন্ড। মাঝিয়ালি হাইস্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদে থেকে অ্যাকাউন্ট গরমিল করেছেন বলে অভিযোগ। এক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা অন্য একাধিক অ্যাকাউন্টে পাচার হয়ে গেছিল। দীর্ঘ দিন ধরে তাঁর খোঁজ চালাচ্ছিল কলকাতা পুলিশ, রাজ্য পুলিশ, সিআইডির যৌথ দল। গ্রেপ্তারের আঁচ পেয়ে অভিযুক্ত শিক্ষক গা-ঢাকা দেন নেপাল সীমান্তে। অবশেষে বুধবার ইসলামপুর থেকে গ্রেফতার করা হয়েছে তাঁকে।
ইসলামপুর পুলিশ জেলার পুলিশ সুপার জবি থমাস বলেন, ‘সাইবার ক্রাইম থানার অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে মোফতাজুল ইসলামের নাম উঠে আসে মূল চক্রী হিসেবে। তিনি মাঝিয়ালি এলাকার একটি স্কুলে চাকরি করতেন। গোপন সূত্রে খবর পেয়ে ওই মাঝিয়ালি এলাকা থেকেই তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।’
পুলিশ জানতে পেরেছে, গত প্রায় ১০ বছর ধরে মাঝিয়ালি হাই স্কুলে চাকরি করছেন মোফতাজুল। ২০২২ সালে ওই স্কুলের প্রধানশিক্ষক অবসর নিলে অন্তর্বর্তিকালীন দায়িত্ব পান তিনি। ভারপ্রাপ্ত প্রধান হিসাবে স্কুলের পোর্টাল তিনিই সামলাতেন। সেখান থেকে কোনও গোলমাল করেছেন কি না, খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তকারীদের দাবি, ট্যাবের টাকা নয়ছয়ের অন্যতম মূলচক্রী এই মোফতাজুল। নিজের স্কুল দিয়ে শুরু করে ক্রমে তিনি বিভিন্ন রাজ্যে নিজের জাল বিস্তার করেন। ছোট ছোট দল গঠন করেন। প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে কী ভাবে ট্যাবের টাকা অন্য অ্যাকাউন্টে পাঠানো যায়, তার পরিকল্পনা করতেন অভিযুক্ত। নিজের বাড়িতে ব্যাঙ্কের কাস্টমার সার্ভিস পয়েন্ট চালানোর মোড়কে গ্রাহকদের ব্যাঙ্কিং তথ্য হাতিয়ে প্রতারণার জাল তৈরি করেছিলেন তিনি। ট্যাব প্রাপকদের অ্যাকাউন্ট নম্বর মুছে সেখানে অন্য অ্যাকাউন্ট নম্বর ভরে দেওয়া হয়েছিল। আর তারপরই নির্দিষ্ট সময়ে ওই অ্যাকাউন্টে টাকা চলে আসে। এভাবেই বিপুল পরিমাণ টাকা হস্তগত করেছিলেন তিনি। কলকাতা এবং জেলার যতগুলি স্কুলে ট্যাব দুর্নীতির হদিস মিলেছে, ততগুলিতেই মোফতাজুলের নাম ছিল অভিযুক্তের তালিকায়।
গত বছর নভেম্বরে ট্যাব কেলেঙ্কারির প্রথম অভিযোগ উঠেছিল পূর্ব বর্ধমানে। ধীরে ধীরে একই অভিযোগ উঠতে শুরু করে অন্যান্য জেলায়। দেখা গিয়েছে, ১৫টি জেলার মোট ১৯৪টি স্কুলের পড়ুয়ারা ট্যাব কেলেঙ্কারির শিকার। বাকি আট জেলা থেকে পরবর্তীকালে অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। প্রায় ১৯০০ ছাত্রছাত্রী জালিয়াতির শিকার হন। রাজ্যের শিক্ষা মন্ত্রী ব্রাত্য বসু আগেই জানিয়েছেন, ‘কয়েকটি জেলায় অল্প কিছু স্কুলে এই ধরনের ঘটনা ঘটেছে। এখনও পর্যন্ত ১০ জন গ্রেফতার হয়েছেন। ন্যাশনাল ইনফরমেটিকস সেন্টার আমাদের ইতিমধ্যে পুরো বিষয়টি তদন্ত করে একটি এসওপি (স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিওর) জমা দিয়েছে। মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিকের প্রশ্নপত্র যে ভাবে বাইরে আসা আটকানো গিয়েছে, এই বিষয়টিরও সম্পূর্ণ সমাধান হবে।’ রাজ্যে একের পর দুর্নীতিতে জড়িয়ে তাবড় তাবড় রাজনৈতিক নেতারা জেলে রয়েছেন। কিন্তু একজন শিক্ষক যে এত বড় কাণ্ড ঘটাতে পারেন তা যেন কেউ কল্পনাও করতে পারেন নি। মানুষ গড়বার কারিগর – শিক্ষকের এ হেন কাজে পুলিশ থেকে শুরু করে বহু পড়ুয়া সবাই নির্বাক। প্রশ্ন উঠছে, স্বয়ং প্রধান শিক্ষক যদি এমন অসৎ, অপরাধী হন, তাহলে ছাত্রদের কী শেখাবেন তিনি?
❤ Support Us







