- এই মুহূর্তে দে । শ
- জুন ৯, ২০২৬
পাক অধিকৃত কাশ্মীরে রক্তাক্ত দমন অভিযান ! প্রতিবাদীদের লক্ষ্য করে গুলি, নিহত অন্তত ৩০, জখম দু-শতাধিক
পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে (পিওকে) ফের বিস্ফোরিত হলো দীর্ঘ দিনের জমে থাকা ক্ষোভ। প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে শামিল সাধারণ মানুষের উপর নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিচালনার অভিযোগকে কেন্দ্র করে উত্তাল হয়ে উঠেছে গোটা অঞ্চল। বিক্ষোভকারী সংগঠনগুলির দাবি, গত কয়েক দিনে পুলিশের গুলি এবং নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে।জখম হয়েছেন ২০০-রও বেশি মানুষ। যদিও প্রশাসনের দাবি, মৃতের সংখ্যা ১১, আহত ৭০ জন।
রাওয়ালাকোট, পুঞ্চ, বাগ, মুজফ্ফরাবাদ-সহ একাধিক এলাকায় এই মূহূর্তে উত্তপ্ত পরিস্থিতি। মোতায়েন করা হয়েছে অতিরিক্ত পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী। একাধিক এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। চলছে ধরপাকড় আর তল্লাশি অভিযান। প্রশাসনের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়া নাগরিকদের বিরুদ্ধে কড়া পদক্ষেপের ইঙ্গিতও দিয়েছে ইসলামাবাদপন্থী প্রশাসন।
পিওকে-এর আমজনতার ক্ষোভের এই সাম্প্রতিক বিস্ফোরণের নেপথ্যে রয়েছে বহু দিনের আর্থিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ। মূল্যবৃদ্ধি, বিদ্যুতের অস্বাভাবিক মাশুল, বেকারত্ব, খাদ্যদ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি, প্রশাসনিক দুর্নীতি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের অভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই ক্ষোভ জমছিল পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষের মধ্যে। সে ক্ষোভকে সংগঠিত রূপ দেয় নাগরিক মঞ্চ ‘জয়েন্ট আওয়ামি অ্যাকশন কমিটি’ (জেএএসি)। গত কয়েক বছরে সংগঠনটি সাধারণ মানুষের নানা দাবিকে সামনে রেখে একাধিক আন্দোলন গড়ে তুলে দ্রুত জনসমর্থন অর্জন করে। গত শুক্রবার ‘জেএএসি’-কে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে পাক অধিকৃত কাশ্মীর প্রশাসন। ফলে, পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। প্রশাসনের দাবি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু সংগঠনের সমর্থকদের অভিযোগ, মানুষের ন্যায্য দাবি দমিয়ে দিতেই নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। এরপর, উত্তেজনার সূত্রপাত রাওয়ালাকোটে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রশাসনের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সামিল এক ব্যবসায়ী নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হন। তাঁর মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্থানীয় বাসিন্দারা।
রবিবার নতুন করে সংঘর্ষের সূত্রপাত হয় রাওয়ালাকোটের একটি হাসপাতালের মর্গের সামনে। সেখানে জড়ো হয়েছিলেন বহু বিক্ষোভকারী। মর্গে রাখা ছিল গুলিতে নিহত আর এক আন্দোলনকারীর দেহ। সে সময় বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান শুরু করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি, কোনোরকম সতর্কবার্তা ছাড়াই গুলি চালানো হয়। মুহূর্তে রণক্ষেত্রের চেহারা নেয় হাসপাতাল চত্বর। পুঞ্চ বিভাগের কমিশনার সর্দার ওয়াহিদ খান অবশ্য ভিন্ন দাবি করেছেন। তাঁর বক্তব্য, বিক্ষোভকারীরা প্রথমে নিরাপত্তা বাহিনীর উপর হামলা চালায়। স্বয়ংক্রিয় রাইফেল থেকে গুলি, পেট্রল বোমা এবং অন্যান্য বিস্ফোরক ব্যবহার করা হয়। আন্দোলনকারীরা ‘গেরিলা কৌশল’ অবলম্বন করেছিল বলেও দাবি করেন তিনি। কমিশনারের বক্তব্য অনুযায়ী, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাল্টা অভিযানে ৬ জন বিক্ষোভকারী নিহত হন। অন্যদিকে, বিক্ষোভকারীদের গুলিতে ৪ জন পুলিশকর্মী-সহ এক পথচারীরও মৃত্যু হয়েছে বলে পিওকে প্রশাসনের দাবি।
তবে সরকারি এ হিসাবকে সম্পূর্ণ খারিজ করে দিয়েছে ‘জেএএসি’। সংগঠনের অভিযোগ, প্রকৃত মৃতের সংখ্যা প্রশাসন ইচ্ছাকৃত ভাবে গোপন করছে। তাদের দাবি, গত কয়েক দিনের দমন অভিযানে ৩০ জনেরও বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছেন, আহতের সংখ্যা ২০০ ছাড়িয়েছে। সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একাধিক ভিডিও ও স্থানীয় সাংবাদিকদের বিবরণেও সরকারি তথ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। ‘জেএএসি’ নেতা শওকত নওয়াজ মীর এক ভিডিও বার্তায় অভিযোগ করেছেন, ‘রাওয়ালাকোটে আমাদের মানুষের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র গণহত্যা শুরু করেছে।’ তাঁর দাবি, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দমন করতেই নিরাপত্তা বাহিনী অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করেছে। এই পরিস্থিতির মধ্যেই মঙ্গলবার জেএএসি-র ডাকা বৃহত্তর আন্দোলন এবং মুজফ্ফরাবাদের উদ্দেশে দীর্ঘ পদযাত্রা ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রশাসন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, কোনো অবস্থাতেই এই পদযাত্রার অনুমতি দেওয়া হবে না। সরকারি সূত্রের দাবি, ইতিমধ্যেই ২০০-র বেশি মানুষকে আটক করা হয়েছে। জেএএসি-র একাধিক নেতা আত্মগোপনে রয়েছেন বলেও দাবি প্রশাসনের। যদিও আন্দোলনকারীদের বক্তব্য, নিষেধাজ্ঞা, ধরপাকড় এবং গুলিচালনা সত্ত্বেও আন্দোলন থামবে না। তাঁদের অভিযোগ, পাক অধিকৃত কাশ্মীরের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ধারাবাহিক ভাবে খর্ব করা হচ্ছে। বিশেষ করে আইনসভার ৪৫টি আসনের মধ্যে ১২টি আসন পাকিস্তানে বসবাসকারী তথাকথিত শরণার্থীদের জন্য সংরক্ষণের বিরোধিতা আন্দোলনের অন্যতম প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছে।
পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে পাকিস্তানের মানবাধিকার কমিশন (এইচআরসিপি)। এক বিবৃতিতে তারা ‘জেএএসি’-কে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুর ঘটনায় শোকপ্রকাশ করে অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন করার কড়া সমালোচনা করেছে। কমিশনের বক্তব্য, মানুষের রাজনৈতিক অধিকার অস্বীকার করে সংলাপের পরিবেশ তৈরি করা সম্ভব নয়। সমস্যার সমাধানে আলোচনার পথই একমাত্র উপায়। ঘটনার আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও শুরু হয়েছে। ব্রিটেনে বসবাসকারী কাশ্মীরি প্রবাসীরা পাকিস্তানি কূটনৈতিক মিশনের সামনে বিক্ষোভ দেখিয়েছেন। অন্তত ৩০ জন ব্রিটিশ সাংসদ ব্রিটিশ সরকারের কাছে চিঠি লিখে পরিস্থিতি শান্ত করার লক্ষ্যে কূটনৈতিক হস্তক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছেন। মানবাধিকার কর্মীদের অভিযোগ, পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী কাশ্মীরিদের নাগরিক হিসেবে নয়, নিরাপত্তা-ঝুঁকি হিসেবে দেখছে। রক্তাক্ত পরিস্থিতি নিয়ে সরব হয়েছে ভারতও। মঙ্গলবার ভারতের বিদেশ মন্ত্রক এক বিবৃতিতে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে ‘চরম পুলিশি বর্বরতা’র নিন্দা করেছে। বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘পাকিস্তান অধিকৃত কাশ্মীরে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর দমন অভিযানের খবর পাওয়া যাচ্ছে। বহু মানুষ নিহত ও আহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত পাকিস্তানকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য জবাবদিহির আওতায় আনা।’ রাওয়ালাকোটের রক্তাক্ত সংঘর্ষের পর আপাতত থমথমে পাক অধিকৃত কাশ্মীর। কিন্তু ক্ষোভের আগুন যে এখনো নিভে যায়নি, তা স্পষ্ট। বরং প্রশাসনের দমননীতির ফলে পরিস্থিতি আরও অস্থির হয়ে ওঠার আশঙ্কা বাড়ছে।
❤ Support Us





