- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- ডিসেম্বর ১৯, ২০২৫
দেশে ৫ হাজারের বেশি সরকারি স্কুল পড়ুয়াশূন্য, সবচেয়ে সঙ্কটজনক ছবি পশ্চিমবঙ্গ ও তেলেঙ্গানায়
শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও বাসস্থান— নাগরিক জীবনের এই ন্যূনতম অধিকারগুলির কথা নীতিনির্ধারকদের ভাষণে যতটা শোনা যায়, বাস্তবের চিত্র ততটাই হতাশাজনক। কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রকের সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান সে বাস্তবকেই ফের একবার সামনে এনে দিল। দেশের সরকারি স্কুল ব্যবস্থায় ক্রমবর্ধমান ছাত্রসংকট এখন আর বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত, গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ১০ লক্ষ ১৩ হাজার সরকারি স্কুলের মধ্যে ৫,১৪৯টি স্কুলে এক জন ছাত্রও নেই। অর্থাৎ স্কুল ভবন আছে, শিক্ষক আছেন, শিক্ষাকর্মীরাও রয়েছেন—কিন্তু পড়ুয়া নেই।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে একেবারে শূন্য ভর্তি থাকা এই স্কুলগুলির ৭০ শতাংশের বেশি শুধু দুই রাজ্যে— পশ্চিমবঙ্গ ও তেলেঙ্গানায়। পরিসংখ্যান বলছে, এই দুই রাজ্যেই পরিস্থিতি সবচেয়ে গুরুতর। সরকারি ডেটা অনুযায়ী, কার্যত প্রতি ১০টি সরকারি স্কুলের মধ্যে ৭টিতেই ছাত্রসংখ্যা নেই বা নামমাত্র, এমনই অভিযোগ উঠছে তথ্য বিশ্লেষণে। ফলে প্রশ্ন উঠছে রাজ্যগুলির শিক্ষা পরিকাঠামো, পাঠদানের মান এবং অভিভাবকদের আস্থার বিষয়টি নিয়ে। পশ্চিমবঙ্গে ২৩টি জেলার মধ্যে ২২টিতেই অন্তত ১০টি করে এমন সরকারি স্কুল রয়েছে, যেখানে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে এক জন ছাত্রও ভর্তি হয়নি। রাজ্যের রাজধানী কলকাতায় ২১১টি সরকারি স্কুলে কোনো ছাত্র নেই, যা গোটা দেশের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বাধিক। এর পরের স্থানে রয়েছে পূর্ব মেদিনীপুর (১৭৭টি) এবং দক্ষিণ দিনাজপুর (১৪৭টি)। অন্য দিকে, তেলেঙ্গানার ৩৩টি জেলার প্রতিটিতেই কমপক্ষে ১০টি ‘ছাত্রশূন্য’ স্কুলের অস্তিত্ব মিলেছে।
শুধু পুরোপুরি ছাত্রহীন স্কুলই নয়, ০ থেকে ১০ জন পড়ুয়া রয়েছে এমন সরকারি স্কুলের সংখ্যাও হু হু করে বাড়ছে। গত দুই বছরে এই ধরনের স্কুলের সংখ্যা ২৪ শতাংশ বেড়েছে।
২০২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে যেখানে এই সংখ্যা ছিল ৫২,৩০৯, সেখানে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৫,০৫৪। বর্তমানে এই স্কুলগুলি দেশের মোট সরকারি স্কুলের ৬.৪২ শতাংশ—অর্থাৎ গড় হিসেবে প্রতি ১৯টি সরকারি স্কুলের মধ্যে অন্তত একটি স্কুলে পড়ুয়ার সংখ্যা দশের কম, কোথাও আবার একেবারেই শূন্য। সবচেয়ে বিতর্কিত দিকটি হল, ছাত্র না থাকলেও এই স্কুলগুলিতে শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মীরা কর্মরত। অনেক ক্ষেত্রেই প্রশ্ন উঠছে— স্কুলগুলি আদৌ নিয়মিত চলছে কি না, নাকি নামমাত্র অস্তিত্ব বজায় রেখে শিক্ষকরা কার্যত কাজ ছাড়াই বেতন পাচ্ছেন? পশ্চিমবঙ্গে, এই কম ভর্তি বা শূন্য ভর্তি শ্রেণির ৬,৭০৩টি সরকারি স্কুলে ২৭,৩৪৮ জন শিক্ষক নিযুক্ত। অর্থাৎ গড়ে প্রতি স্কুলে প্রায় ৪ জন শিক্ষক। অন্য দিকে, বিহারে ৭৩০টি স্কুলে ৩,৬০০ জন শিক্ষক কর্মরত—প্রতি স্কুলে গড়ে প্রায় ৫ জন, যা এই শ্রেণিতে জাতীয় গড় ২.২ জন শিক্ষকের দ্বিগুণেরও বেশি। এই প্রসঙ্গে শিক্ষা মন্ত্রক জানিয়েছে, শিক্ষক নিয়োগ এবং তাঁদের যুক্তিসংগত বণ্টন সম্পূর্ণভাবে রাজ্য সরকারের আওতাধীন বিষয়। কেন্দ্র এ ক্ষেত্রে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে না। সংসদে এ প্রসঙ্গেই প্রশ্ন তুলেছিলেন সাংসদ কার্তি পি চিদাম্বরম এবং অমরিন্দর সিং রাজা। লিখিত উত্তরে শিক্ষা মন্ত্রক পরিসংখ্যান পেশ করলেও, কেন এত বিপুল সংখ্যক সরকারি স্কুলে পড়ুয়া নেই—তার কোনও সদর্থক ব্যাখ্যা মেলেনি।
শিক্ষা মহলের একাংশের মতে, এই সংকটের পিছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এক দিকে বেসরকারি ও ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের প্রতি অভিভাবকদের ঝোঁক, অন্য দিকে সরকারি স্কুলে পরিকাঠামো ও শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষ— দুই মিলেই এই পরিস্থিতি। পাশাপাশি, পারিবারিক আর্থিক সঙ্কট, কাজের অনিশ্চয়তা ও কম মজুরির কারণে বহু পরিবারেই শিশুদের স্কুলের বদলে কাজে পাঠানোর প্রবণতাও বাড়ছে। ‘আত্মনির্ভর ভারত’ বা ‘এগিয়ে বাংলা’-র মতো উন্নয়নের স্লোগান যতই উচ্চকিত হোক না কেন, সরকারি স্কুলে পড়ুয়ার অভাব দেখিয়ে দিচ্ছে—দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের একটি বড় অংশ এখনও মূল শিক্ষাব্যবস্থার বাইরে রয়ে যাচ্ছে। চিত্র আরও স্পষ্ট হচ্ছে সরকারি স্কুলের মোট সংখ্যা কমার পরিসংখ্যানে। ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে যেখানে দেশে সরকারি স্কুলের সংখ্যা ছিল ১০.৩২ লক্ষ, সেখানে ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে তা কমে দাঁড়িয়েছে ১০.১৩ লক্ষে। স্কুল একীভবন, পড়ুয়ার অভাব ও প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, সব মিলিয়ে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থার ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে। শিক্ষা বিশেষজ্ঞদের মতে, ছাত্রহীন বা অতি কম ছাত্রসংখ্যার স্কুলগুলিকে ঘিরে দ্রুত নীতিগত সিদ্ধান্ত না নিলে সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার উপর মানুষের আস্থা আরো ক্ষয়ে যাবে।
❤ Support Us





