- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- জুন ১৬, ২০২৩
“সাংবিধানিক ভাবে হিংসাকে নির্মূল করতে হবে”, ভাঙর ঘুরে দেখে বললেন রাজ্যপাল
“ভাঙড়ের কিছু জায়গায় দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটেছে। পিরিয়েড বম্বিং হয়েছে, তার চিহ্ন মিলেছে। সাংবিধানিক ভাবে এই হিংসা নির্মূল করতে হবে। আমি নিজে এলাকা ঘুরে দেখলাম, মানুষের সঙ্গে কথা বললাম, নিজের অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করলাম। শান্তিতে নির্বাচন সুনিশ্চিত করতে হবে। সন্ত্রাস ও হিংসাকে প্রশ্রয় দেওয়া হবে না। এই হিংসা ও সন্ত্রাসে যারা জড়িত তাদের শাস্তি দিতেই হবে। বাংলার শান্তিপ্রিয় মানুষ এই হিংসা সমর্থন করে না। আমি প্রকৃত সত্য অনুসন্ধানে এসেছিলাম।”
#WATCH | West Bengal Governor C.V. Ananda Bose in Bhangar, South 24 Paraganas to assess the impact of recent violence during nominations for panchayat elections pic.twitter.com/rVOdt8HSB6
— ANI (@ANI) June 16, 2023
হিংসা বিদ্ধস্ত ভাঙড়ে এসে, সরেজমিনে পুরো পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে শুক্রবার এই মন্তব্য করেন রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস।
শুক্রবার পঞ্চায়েত নির্বাচনের মনোনয়ন সন্ত্রাসে বিদ্ধস্ত ভাঙড়ের বিজয়গঞ্জ বাজার,মেলার মাঠ,বিডিও অফিস, ভাঙড় মহা বিদ্যালয় শুক্রবার সরেজমিনে পরিদর্শন করলেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস। রাজ্যপাল স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে মনোনয়নকে কেন্দ্র করে ভাঙড়ের পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চান, কারা এই ঘটনায় যুক্ত, পুলিশের ভূমিকা কী ছিল, স্থানীয় মানুষ কী চান৷ ভাঙড় ২ এর বিডিও এবং অবজার্ভারের সঙ্গেও কথা বলে পরিস্থিতি কেন এমন হল জানতে চান রাজ্যের সাংবিধানিক প্রধান।
এদিকে রাজ্যপাল ভাঙড় বিজয়গঞ্জ পৌঁছবার সময়ও সেখানে পড়ে বোমা, পোড়া গাড়ি থেকে তখনও ধোঁয়া উঠছে। ভাঙড় থানার সামনো থেকে শুক্রবারও উদ্ধার হয় সাত ব্যাগ বোমা। রাজ্যপালের পাশে থাকা একটি বোমা তাঁর নিরাপত্তা রক্ষী হাত দিয়ে তুলে একটু দূরে রেখে আসেন।
কেন বিজয়গঞ্জ এবং বিজয়গঞ্জ মেলার মাঠে পড়ে থাকা বোমা রাজ্যপাল ঘটনাস্থলে আসার আগেও পুলিশ উদ্ধার করেনি এই নিয় প্রশ্ন উঠেছে। কেউ কেউ মনে করছেন, পুলিশ চাইছে ভাঙড়ের প্রকৃত অবস্থা রাজ্যপাল সি ভি আনন্দ বোস জানুক।
রাজ্যপাল যখন বিজয়গঞ্জে তখন বেশ কয়েকজন আইএসএফ প্রার্থী রাজ্যপালকে জানান, “শাসকদল তাদের মনোনয়ন জমা দিতে দেয়নি।” ভাঙড় ২ নম্বর বিডিও অফিসের বাইরে রাজ্যপালকে মনেনয়ন দিতে না পারার বিষয়টি জানাতে আইএসএফ কর্মীরা এলে পুলিশ তাদের আটকে দেয়। তারপর রাজ্যপাল ভাঙড় ২ ব্লক অফিস ছাড়লে ওই বিডিও অফিসের বাইরে আইএসএফ বিক্ষোভ দেখান।
বিজয়গঞ্জ, মেলার মাঠ হয়ে রাজ্যপাল ভাঙড় ২ নম্বর বিডিও অফিসে যান রাজ্যপাল। বিডিওর কার্তিক পালের সঙ্গে কথা বলে পুরো বিষয়টি সম্পর্কে রাজ্যপাল খোঁজ নেন। বিডিওর সঙ্গে রাজ্যপাল বৈঠক করে গত পাঁচ দিনের উদ্ভুত পরিস্থিতি ও তার পরিপ্রেক্ষিতে বিডিও এবং পুলিশের ভূমিকা কী ছিল রাজ্যপাল জানতে চান।
এদিকে ভাঙড় ২ নম্বর বিডিও অফিস গতকাল শাসকদল দখল করে রেখে ছিল বলে স্থানীয়রা রাজ্যপালকে জানান। গতকাল রাত সাড়ে ১২ টা পর্যন্ত স্থানীয় তৃণমূল নেতা আরাবুল ইসলাম ও তাঁর ছেলে হাকিবুল ইসলাম লুকিয়ে ছিলেন। রাতে তিনি ও তাঁর ছেলে বিডিও অফিস থেকে কোনও রকমে পালিয়ে যায়। বৃহস্পতিবার ২ নম্বর বিডিও অফিস দখল করে আরাবুল ইসলাম তৃণমূলের মনোনয়ন জমা করান, বিরোধীদের বাধা দিয়েছেন বলে অভিযোগ।
এদিকে বিজয়গঞ্জ বাজার ও স্থানীয় মেলার মাঠে স্থানীয় মানুষ রাজ্যপালকে জানান, “তৃণমূল নেতা, সওকত মোল্লার নেতৃত্বে ভাঙড়ে এই হামলা, সন্ত্রাস, আক্রমণ চলে বিরোধীদের উপর। ব্যাপক হারে বোমা পড়ে, গুলি চলে। মানুষের প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।” রাজ্যপাল তাঁর নিরাপত্তা রক্ষীদের কাছে জানতে চান কে এই সওকত মোল্লা? রাজ্যপালকে জানানো হয় তিনি স্থানীয় তৃণমূল নেতা ও ভাঙড় পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক।
রাজ্যপাল যখন ঘটনা স্থলে তখন রাজ্যপালের কাছে ঘটনা জানাতে বা তাঁর নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করতে নিয়ম অনুযায়ী আসেননি পুলিশের কোনও শীর্ষ কর্তা। সাব ইনস্পেক্টর পদমর্যাদার কিছু পুলিশ রাজ্যপালকে ঘটনার বর্নণা দেন।
ভাঙড় ২ নম্বর ব্লকের বিডিওর কাছে ও অবজার্ভারের কাছে রাজ্যপাল জানতে চান কেন ভাঙড়ের এই অবস্থা? বিডিও তখন রাজ্যপালকে দোতলায় তাঁর ঘরে নিয়ে যান। মিনিট ১০ তাঁদের মধ্যে বৈঠক চলে। রাজ্যপাল বিডিওনএবং অবজার্ভারের কাছপ জানতে চান কেন বিরোধীদের আটকে দেওয়া হল? কারা এই কাজ করল? শাসকদল কি ভাবে বিডিও অফিসের দখল নিতে পারল? পর্যাপ্ত পুলিশ কি ছিল না পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য? এই প্রসঙ্গে ভাঙড়ের অবজার্ভারকে প্রশ্ন করলে তিনি নীরব থাকেন। এর পর রাজ্যপাল ভাঙড় ২ নম্বর ব্লক ছেড়ে ভাঙড় ১ নম্বর ব্লকের দিকে রওনা দেন। পথে দাঁড়িয়ে থাকা বেশ কিছুনপুলিশ কর্মীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে রাজ্যপাল গাড়ি থামিয়ে নেমে তাঁদের সঙ্গে কথা বলেন। তার পর আবার রওনা হন।
ভাঙড় ১ নম্বর ব্লকে আইএসএফ কর্মীরা ভাঙড় কলেজের সামনে বিক্ষোভ দেখান। রাজ্যপাল যখন ভাঙড় কলেজের তখন এই আইএসএফ কর্মীরা এসে বলেন আমরা রাজ্যপালকে জানাব, গত ৬ দিন শাসকদল আমাদের ১ নম্বরে মনোনয়ন জমা দিতে দেয়নি শাসকদল। তারা অভিযোগ করেন পুলিশকে বলে কোনও সহায়তা পাইনি। উল্টে আইএসএফ কর্মীদের পুলিশ ধরে নিয়ে যায়। আমাদের মনেনয়ন জমা দিতে দেওয়ার যাতে ব্যবস্থা করে দেন রাজ্যপাল, সেই দাবি জানাব। রীতিমতো মনোনয়ন জমা দোওয়ার ফাইল হাতে আইএসএফ কর্মীরা রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করার জন্য অপেক্ষা করছেন, তখন রাজ্যপাল ভাঙড় কলেজের অধ্যক্ষের ঘরে বৈঠক করছেন।
ভাঙড় কলেজে অধ্যক্ষের ঘরে প্রশাসনের কর্তাদের সঙ্গে,পুলিশ আধিকারীকদের সঙ্গে বৈঠক করেন রাজ্যপাল। পাশাপাশি আইএসএফ এর দুজন প্রার্থীকে তিনি ভাঙড় কলেজে ডেকে নেন রাজ্যপাল তাঁদের বক্তব্য শোনার জন্য। এই দুই আইএসএফ প্রতিনিধি রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে এসে একজন আইএসএফ কর্মী জানান, “আমরা রাজ্যপালকে বলেছি, তৃণমূলের গুণ্ডারা আমাদের মনোনয়ন জমা দিতে দেয়নি। আমাদের প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে, বাড়ি গিয়ে হুমকি দিয়ে আসছে। রাজ্যপাল সব শুনেছেন, তিনি এই বিষয় শোনার পর যা সিদ্ধান্ত নেবেন, আমরা তাই মেনে নেব।” আইএসএফ কর্মীরা রাজ্যপালকে এদিন মনোনয়ন জমা দিতে না দেওয়ার অভিযোগ জানাতে ভাঙড় কলেজে এসেছিলন।
এদিকে রাজ্যপালের এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর রঞ্জন চৌধুরী। তবে তাঁর কথা, “রাজ্যপাল এলেই হবে না, তাঁর সমস্থ ক্ষমতা ব্যবহার করে নির্বাচন করুন না হলে নিবাচন বন্ধ করে দিন। নির্বাচনের নামে আর মানুষের রক্তক্ষয় দেখতে চাই না। মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে এই সন্ত্রাসকে ইন্ধন দিচ্ছেন। তিনি বলছেন এক হাতে তালি বাজে না। আমার মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রশ্ন, আপনি তো বলেন আপনার সরকার সব কাজ, সবার কাজ করে দিয়েছে। তাহলে আপনার সেনাবাহিনীতে ভয় কেন? কেন ভিন রাজ্য থেকে পুলিশ এনে ভোট করাতে চাইছেন? কেন বিরোধীদের মনেনয়ন জমা দিতে বাধা দেওয়া হচ্ছে?”
ভাঙড় ২ নম্বর ব্লকে সবচেয়ে বেশি সন্ত্রাস হয়েছে গত ৬দিনে। শুক্রবারও ভাঙড়ের রেজিষ্ট্রি অফিসের সামনে শুক্রবার সকালেও বোমা উদ্ধার হয়। ভাঙড় থানার পাশে ৭ ব্যাগ বোমা উদ্ধার, ওই ব্যাগে কাঠের গুড়োর মধ্যে রাখা ছিল বোমাগুলো। ভাঙড়ের মাঠে,রাস্তায়,বাড়ির ছাদে শুক্রবারও ছড়িয়ে ছিটিয়ে বোমা, কার্তুজের প্যাকেট, গুলির খোল। আজও বিজয়গঞ্জে বৃহস্পতিবারের পোড়া গাড়ির ধোওয়া উঠছে। বাতাসে বারুদের গন্ধ রয়েছে। আজ সকালেও ভাঙড় ১,২ ব্লকে সন্ত্রাসের ছাপ স্পষ্ট, এরই মধ্যে ভাঙড় এসে পরিস্থিতি নিজের চোখে দেখে গেলেন রাজ্যপাল। সন্ত্রাসের ছবি প্রত্যক্ষ করলেন।
❤ Support Us





