Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুন ১৮, ২০২৬

উচ্চশিক্ষার বরাদ্দ ‘অপ্রতুল’, শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
উচ্চশিক্ষার বরাদ্দ ‘অপ্রতুল’, শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয়ের সুপারিশ সংসদীয় কমিটির

‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’ (এনইপি)-র উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যপূরণে শিক্ষাখাতে সরকারি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর দাবি নতুন নয়। এবার সে দাবিকেই আরও জোরালো ভাবে সামনে আনল সংসদের শিক্ষা, নারী, শিশু, যুব ও ক্রীড়া বিষয়ক স্থায়ী কমিটি। উচ্চশিক্ষার বর্তমান বরাদ্দকে ‘অপ্রতুল’ বলে উল্লেখ করে কমিটির সুপারিশ, শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় দ্রুত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৬ শতাংশে উন্নীত করতে হবে। একই সঙ্গে মুদ্রাস্ফীতির চাপ সামাল দিতে এবং উচ্চশিক্ষার বর্তমান ব্যয়ের মান বজায় রাখতে আগামী দিনে বরাদ্দ অন্তত ৮ থেকে ১০ শতাংশ বৃদ্ধি করারও পরামর্শ দিয়েছে কমিটি।

রাজ্যসভার চেয়ারম্যান সি পি রাধাকৃষ্ণনের কাছে উচ্চশিক্ষা বিভাগ-সংক্রান্ত ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের অনুদানের দাবির উপর তৈরি ৩৬৪তম প্রতিবেদনের সুপারিশ বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়ে ৩৮১তম ‘অ্যাকশন টেকেন রিপোর্ট’ পেশ করেছে কমিটির চেয়ারম্যান তথা রাজ্যসভার সাংসদ দিগ্বিজয় সিং। সেখানে উচ্চশিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয়ের বর্তমান চিত্র, ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’র লক্ষ্যপূরণে আর্থিক প্রয়োজন, শিক্ষাব্যবস্থার বিভিন্ন কাঠামোগত সমস্যার কথা বিশদে তুলে ধরা হয়েছে। কমিটির পর্যবেক্ষণ, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে উচ্চশিক্ষা বিভাগের বাজেট অনুমানের বৃদ্ধি আগের বছরের তুলনায় কম। অর্থাৎ, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের বাজেট অনুমানের তুলনায় চলতি অর্থবর্ষে যে হারে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে, তা গত বারের বৃদ্ধির হারকে ছুঁতে পারেনি। এ প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ক্রমবর্ধমান মুদ্রাস্ফীতির পরিস্থিতিতে বরাদ্দ অন্তত ৮ থেকে ১০ শতাংশ না বাড়ালে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে প্রকৃত ব্যয়ক্ষমতা কমে যাবে। ফলে উচ্চশিক্ষা বিভাগের পক্ষে বর্তমান মান বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়বে, প্রকৃত বরাদ্দ ও ব্যয়ের মধ্যে ফারাক আরও বাড়তে পারে।

রিপোর্টে স্পষ্ট ভাষায় বলা হয়েছে, ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’র লক্ষ্য বাস্তবায়নের জন্য যে পরিমাণ আর্থিক সংস্থান প্রয়োজন, বর্তমান বরাদ্দ তার তুলনায় অনেকটাই কম। কমিটির মতে, গবেষণা, উদ্ভাবন, ডিজিটাল পরিকাঠামো, শিক্ষক নিয়োগ, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণ এবং শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে বড়ো বিনিয়োগ ছাড়া এনইপি-র লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করা সম্ভব নয়। সে কারণেই বর্তমান বরাদ্দকে ‘অপ্রতুল’ বলে উল্লেখ করেছে কমিটি। শুধু আর্থিক বরাদ্দ নয়, শিক্ষার ফলপ্রসূতা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। ২০১৮ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে পুরুষ ও মহিলাদের মোট ভর্তির হার বা গ্রস এনরোলমেন্ট রেশিয়ো (জিইআর)-এ উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি হয়নি বলে জানিয়েছে কমিটি। তাদের মতে, কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং মানবসম্পদের সর্বোত্তম বিকাশের জন্য যে হারে উচ্চশিক্ষায় অংশগ্রহণ বাড়ার কথা ছিল, বাস্তবে তা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে ২০৩৫ সালের জন্য ‘জাতীয় শিক্ষা নীতি’ যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে শিক্ষাখাতে সরকারি ব্যয় আরও বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে।

‘জাতীয় শিক্ষা নীতি-২০২০’-তে স্পষ্ট ভাবে বলা হয়েছে, কেন্দ্র ও রাজ্য সরকারগুলিকে সম্মিলিত ভাবে শিক্ষাখাতে সরকারি বিনিয়োগ জিডিপির ৬ শতাংশে নিয়ে যেতে হবে। সেই সুপারিশের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে সংসদীয় কমিটি জানিয়েছে, বাস্তবে লক্ষ্য এখনো অধরাই রয়ে গিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবর্ষে শিক্ষাখাতে কেন্দ্রীয় মন্ত্রক, রাজ্য সরকার এবং কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলির সম্মিলিত ব্যয় ছিল জিডিপির মাত্র ৪.১২ শতাংশ, যা ‘এনইপি’-র নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক কম।  এ প্রসঙ্গে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের পরিসংখ্যানও তুলে ধরেছে কমিটি। জানানো হয়েছে, ২০২২ সালে ভুটান তাদের জিডিপির ৭.৪৭ শতাংশ শিক্ষাখাতে ব্যয় করেছে। মালদ্বীপ ব্যয় করেছে ৪.৬৭ শতাংশ। সে তুলনায় ভারতের ব্যয় ছিল ৪.১২ শতাংশ। শিক্ষাক্ষেত্রে আঞ্চলিক তুলনামূলক অবস্থান বিচার করলে ভারতের শিক্ষাখাতে ব্যয়ের হার উদ্বেগজনক বলেই ইঙ্গিত মিলেছে সংসদীয় কমিটির পর্যবেক্ষণে।

কমিটির বক্তব্য, শিক্ষাখাতে জিডিপির ৬ শতাংশ ব্যয় নিশ্চিত করতে শিক্ষা মন্ত্রককে আরও সক্রিয় ভূমিকা নিতে হবে। প্রয়োজন হলে অর্থ মন্ত্রকের কাছে অতিরিক্ত তহবিলের দাবি জানাতে হবে। কারণ, স্কুলশিক্ষা থেকে উচ্চশিক্ষা— সমগ্র সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে শক্তিশালী, আধুনিক, বিশ্বমানের এবং সমাজের সব স্তরের মানুষের জন্য সহজলভ্য করে তুলতে পর্যাপ্ত আর্থিক বিনিয়োগ অপরিহার্য। উচ্চশিক্ষার আর্থিক কাঠামোর পাশাপাশি পরীক্ষায় অনিয়মের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা হয়েছে। সরকারের তরফে নানা পদক্ষেপ করা হলেও বিভিন্ন প্রতিযোগিতামূলক ও শিক্ষাগত পরীক্ষায় অনিয়মের ঘটনা পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে কমিটি। এ পরিস্থিতিতে পরীক্ষা সংস্কার সংক্রান্ত একটি বিশেষজ্ঞ প্যানেলের সুপারিশ বাস্তবায়নে শিক্ষা মন্ত্রককে নির্দিষ্ট সময়সীমা-সহ একটি রূপরেখা প্রকাশ করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।

সংসদীয় কমিটির পর্যবেক্ষণের জবাবে কেন্দ্র জানিয়েছে, উচ্চশিক্ষা বিভাগের তহবিল বরাদ্দ সংশ্লিষ্ট ব্যুরোগুলির প্রয়োজন অনুযায়ী এবং অর্থ মন্ত্রক নির্ধারিত সামগ্রিক বাজেটসীমার মধ্যেই করা হয়। সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষে উচ্চশিক্ষা বিভাগের জন্য প্রাথমিক বাজেট অনুমান ছিল ৫০,০৭৭.৯৫ কোটি টাকা। পরে সংশোধিত অনুমানের পর্যায়ে সেই অঙ্ক বাড়িয়ে ৫১,৩৮১.৬৭ কোটি টাকা করা হয়েছে। সরকার আরও জানিয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের শেষে উচ্চশিক্ষা বিভাগে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৪,০৫৫.৪৪ কোটি টাকা। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩৩,৯৩৮.৮৮ কোটি টাকার ব্যয় প্রত্যয়ন করা হয়েছিল। একই সময় পর্যন্ত প্রকৃত ব্যয়ের অঙ্ক ছিল ৩৩,৫৬৯.০৫ কোটি টাকা।

অর্থ মন্ত্রকের ব্যয়সংক্রান্ত নির্দেশিকা মেনে চলার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে সরকারি জবাবে। সেখানে জানানো হয়েছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের চতুর্থ ত্রৈমাসিকে মোট ১০,৪৮৬.৩৯ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, যা শেষ ত্রৈমাসিকের জন্য নির্ধারিত ৩৩ শতাংশ এবং মার্চ মাসের জন্য নির্ধারিত ১৫ শতাংশ ব্যয়সীমার মধ্যেই রয়েছে। অর্থবর্ষের শেষ দিকে হঠাৎ ব্যয়ের চাপ তৈরি এড়ানোর বিষয়ে সংসদীয় কমিটির সুপারিশও সরকার গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছে বলে জানানো হয়েছে। শিক্ষাবিদদের একাংশের মতে, জাতীয় শিক্ষা নীতির লক্ষ্যপূরণ, উচ্চশিক্ষার সম্প্রসারণ, গবেষণা ও উদ্ভাবনের পরিকাঠামো গড়ে তোলা এবং বিশ্বমানের মানবসম্পদ তৈরির জন্য সরকারি ব্যয় বাড়ানোর প্রশ্নটি আর এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। সংসদীয় কমিটির সাম্প্রতিক রিপোর্ট সেই বাস্তবতাকেই আরও স্পষ্ট করে সামনে আনল।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!