- এই মুহূর্তে দে । শ
- সেপ্টেম্বর ২২, ২০২৬
পুজোর পরেই বাংলার ৩০ লক্ষ গ্রামীণ পরিবারকে ৬০ হাজার টাকা ! আবাস যোজনার তালিকা চূড়ান্ত করতে তিন দফা যাচাই
উৎসবের মরসুম শেষ হলেই গ্রামীণ বাংলার বড়ো অংশের গ্রামীণ মানুষের জন্য খুলতে চলেছে পাকা ছাদের দরজা। পাকা বাড়ির স্বপ্ন পূরণের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনার গ্রামীণ প্রকল্পের আওতায় রাজ্যের প্রায় ৩০ লক্ষ পরিবারকে প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তুতি শুরু করেছে রাজ্য প্রশাসন। পুজোর পরেই যোগ্য উপভোক্তাদের ব্যাংক হিসাবে সরাসরি এই টাকা পাঠানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তবে তার আগে নামের তালিকা চূড়ান্ত করতে চলছে একাধিক স্তরে কঠোর যাচাই।
প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে, আবাস যোজনার জন্য রাজ্য জুড়ে মোট ৫৪ লক্ষ ৫৯ হাজার নাম উঠে এসেছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৪ লক্ষ ৫০ হাজার নাম এসেছে বাড়ি বাড়ি গিয়ে করা প্রাথমিক সমীক্ষার মাধ্যমে। পাশাপাশি, অনলাইনে স্ব-সমীক্ষার মাধ্যমে আরও কয়েক লক্ষ আবেদন জমা পড়েছে। এই বিপুল সংখ্যক নামের মধ্যে কারা প্রকল্পের সমস্ত শর্ত পূরণ করছেন, তা খতিয়ে দেখতেই এখন জোরকদমে চলছে যাচাই-পর্ব।
তবে প্রাথমিক তালিকায় নাম থাকা মানেই যে সকলেই বাড়ি তৈরির টাকা পাবেন, এমনটা নয়। প্রশাসনের তরফে স্পষ্ট করে দেওয়া হয়েছে, যোগ্যতার মাপকাঠি পূরণ করার পরেই কোনও পরিবারের নাম চূড়ান্ত তালিকায় স্থান পাবে। ফলে একদিকে যেমন প্রকৃত দরিদ্র পরিবার যাতে কোনও ভাবেই বাদ না যায়, সেই দিকে নজর রাখা হচ্ছে, তেমনই অযোগ্য কোনও ব্যক্তি যাতে সরকারি সুবিধা না পান, তা নিশ্চিত করতেও নেওয়া হয়েছে একাধিক ব্যবস্থা। আবাস যোজনার তালিকায় স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবার তিন দফায় যাচাইয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে। প্রথমে স্থানীয় স্তরে সংগৃহীত তথ্য খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তার পরে ব্লক স্তরে নির্দিষ্ট সংখ্যক নাম বেছে নিয়ে পুনরায় পরীক্ষা করা হচ্ছে। জেলা প্রশাসনের তরফেও নমুনাভিত্তিক পুনঃযাচাইয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রের খবর, ব্লক উন্নয়ন আধিকারিকদের দফতর থেকে ১০ শতাংশ নাম পুনরায় যাচাই করা হবে। তার পাশাপাশি জেলাভিত্তিক ভাবে আরও ২ থেকে ৩ শতাংশ নাম বেছে নিয়ে পুনরায় পরীক্ষা চালানো হচ্ছে। কোনো পরিবারের আর্থিক পরিস্থিতি, বর্তমান বাড়ির অবস্থা, জমির মালিকানা, পরিবারের সদস্যদের তথ্য এবং আগে কোনও সরকারি আবাসন প্রকল্পের সুবিধা নেওয়া হয়েছিল কি না — একাধিক বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রশাসনের একাংশের বক্তব্য, তালিকায় ভুল নাম ঢুকে পড়লে তার দায় সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের উপর বর্তাতে পারে। ফলে নাম যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কোনো রকম গাফিলতি বরদাস্ত করা হবে না। শুধু কাগজপত্রের উপর নির্ভর না করে প্রয়োজন অনুযায়ী সরেজমিনে গিয়ে তথ্য যাচাইয়ের উপরেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের পরিকল্পনা অনুযায়ী, যাচাইয়ের কাজ শেষ করে চূড়ান্ত তালিকা তৈরি হওয়ার পর পুজোর পর থেকেই প্রথম কিস্তির টাকা দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। প্রত্যেক অনুমোদিত উপভোক্তার ব্যাংক হিসাবে সরাসরি ৬০ হাজার টাকা পাঠানো হবে। বাড়ি তৈরির কাজ নির্দিষ্ট পর্যায়ে পৌঁছনোর পরে দ্বিতীয় কিস্তির টাকা দেওয়া হবে। অর্থাৎ একসঙ্গে পুরো অর্থ না দিয়ে বাড়ি তৈরির অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ধাপে ধাপে টাকা দেওয়ার ব্যবস্থা থাকবে। এর ফলে সরকারি অর্থ নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যেই ব্যবহার হচ্ছে কি না, সেটিও নজরে রাখা সম্ভব হবে।
এ প্রকল্পের আওতায় সমতল এলাকায় পাকা বাড়ি তৈরির জন্য মোট ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়। পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় সেই সহায়তার পরিমাণ ১ লক্ষ ৩০ হাজার টাকা পর্যন্ত। এর পাশাপাশি শৌচালয় তৈরির জন্য অতিরিক্ত ১২ হাজার টাকা দেওয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে।ফলে বাড়ি তৈরির মূল অনুদানের সঙ্গে শৌচালয় নির্মাণের অর্থ যোগ হলে উপভোক্তাদের হাতে সরকারি সহায়তার পরিমাণ আরও কিছুটা বাড়ে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য শুধু মাথার উপর পাকা ছাদ তৈরি করা নয়, পরিবারের জন্য নিরাপদ ও স্বাস্থ্যসম্মত আবাসন নিশ্চিত করাও।
আবাস যোজনার অধীনে নির্মীয়মাণ বাড়ির ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট কিছু শর্ত। সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, বাড়ির ন্যূনতম আয়তন ২৫ বর্গমিটার হতে হবে। সে বাড়ির মধ্যেই রান্নার জন্য উপযুক্ত জায়গার ব্যবস্থা রাখতে হবে। বাড়ি তৈরির ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিবেশ ও এলাকার উপযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। নির্মাণসামগ্রী এবং বাড়ির নকশা নির্ধারণের ক্ষেত্রে স্থানীয় পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে বাড়িটি অবশ্যই প্রকল্পের নির্ধারিত মানদণ্ড মেনে তৈরি করতে হবে। বর্তমানে, প্রকল্পের টাকা সরাসরি উপভোক্তার ব্যাংক হিসাবে পাঠানোর জন্য ব্যাংক হিসাবের তথ্য যাচাই করা হচ্ছে। আধার নম্বরের সঙ্গে ব্যাংক হিসাবের সংযুক্তিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কোনো তথ্যের সঙ্গে অন্য তথ্যের অমিল থাকলে টাকা পাঠানোর আগে তা সংশোধনের সুযোগ দেওয়ার বিষয়টিও প্রশাসনের নজরে রয়েছে। সরকারি অর্থ সরাসরি উপভোক্তার হিসাবে পৌঁছে দেওয়ার মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা কমানো এবং অর্থপ্রদানের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় রাখাই এর অন্যতম উদ্দেশ্য। সে কারণেই চূড়ান্ত তালিকা তৈরির আগে নথিপত্র যাচাইকে এতটা গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
এ বারের জনসমীক্ষায় একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বাড়ি বাড়ি গিয়ে তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি সাধারণ মানুষকে নিজেরাই আবেদন বা স্ব-সমীক্ষার সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তার ফলে বহু পরিবার সরাসরি নিজেদের তথ্য প্রশাসনের কাছে জমা দিয়েছে। প্রাথমিক ভাবে সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে অনলাইনে জমা পড়া আবেদন মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। একই পরিবারের একাধিক আবেদন রয়েছে কি না, কোনও পরিবারের নাম একাধিক জায়গায় রয়েছে কি না কিংবা প্রকল্পের শর্ত পূরণ না করা সত্ত্বেও কেউ আবেদন করেছেন কি না — এসব বিষয়ও যাচাইয়ের আওতায় রয়েছে।প্রশাসনের বক্তব্য, এত বড় সংখ্যক নাম নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে ভুলভ্রান্তির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তাই একাধিক স্তরে তথ্য যাচাই করে তবেই চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করা হচ্ছে।
পুরো প্রক্রিয়াটি দ্রুত শেষ করতে জেলায় জেলায় প্রশাসনিক বৈঠকও চলছে। পঞ্চায়েত দফতরের শীর্ষ আধিকারিকেরা বিভিন্ন জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত আধিকারিকদের সঙ্গে বৈঠক করে সমীক্ষা ও যাচাইয়ের অগ্রগতি পর্যালোচনা করছেন। কোথায় কতগুলি নাম যাচাই হয়েছে, কোথায় নথির সমস্যা রয়েছে, কোথায় পুনরায় সরেজমিনে যাওয়ার প্রয়োজন—সবই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।ব্লক উন্নয়ন আধিকারিকদেরও সতর্ক করা হয়েছে, কোনও নাম যাচাই না করে চূড়ান্ত তালিকায় পাঠানো যাবে না। একই সঙ্গে প্রকৃত যোগ্য পরিবার যাতে প্রশাসনিক জটিলতার কারণে বাদ না পড়ে, সেই বিষয়েও বিশেষ নজর দিতে বলা হয়েছে।
এখন প্রশ্ন একটাই, প্রাথমিক ভাবে উঠে আসা ৫৪ লক্ষ ৫৯ হাজার নামের মধ্যে শেষ পর্যন্ত কত পরিবার আবাস যোজনার সুবিধা পাবেন? প্রশাসনের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রায় ৩০ লক্ষ পরিবারকে এই পর্যায়ে আর্থিক সহায়তা দেওয়ার লক্ষ্য রয়েছে। অর্থাৎ সমীক্ষায় নাম ওঠা প্রত্যেক পরিবার যে টাকা পাবেন, এমন নয়। যাচাই-পর্বে যোগ্য প্রমাণিত হওয়ার পরেই চূড়ান্ত তালিকায় নাম উঠবে এবং সে তালিকা অনুযায়ী অর্থ দেওয়া হবে। প্রশাসনের হাতে এখন তাই একদিকে রয়েছে কয়েক দশ লক্ষ পরিবারের তথ্য, অন্য দিকে রয়েছে নির্দিষ্ট সংখ্যক পরিবারকে দ্রুত সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য। এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করাই এখন মূল চ্যালেঞ্জ। সব কিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে পুজোর পরেই গ্রামীণ বাংলার প্রায় ৩০ লক্ষ পরিবারের ব্যাংক হিসাবে পৌঁছে যেতে পারে প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা। সেই অর্থ দিয়েই শুরু হতে পারে বহু পরিবারের দীর্ঘ দিনের পাকা বাড়ির স্বপ্ন পূরণের কাজ।
❤ Support Us






