Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • অক্টোবর ১৪, ২০২৬

সফল অস্ত্রোপচার, কেমন আছেন ক্যানসারে আক্রান্ত ভ্যাটিকানের পোপ ? আরোগ্য কামনা প্রধানমন্ত্রী মোদির

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
সফল অস্ত্রোপচার, কেমন আছেন ক্যানসারে আক্রান্ত ভ্যাটিকানের পোপ ? আরোগ্য কামনা প্রধানমন্ত্রী মোদির

প্রাথমিক পরীক্ষায় মিলেছিল ক্যানসারের ইঙ্গিত। মঙ্গলবার রোমের জেমেলি হাসপাতালে প্রায় দেড় ঘণ্টার অস্ত্রোপচারের পরে আপাতত স্থিতিশীল পোপ চতুর্দশ লিয়ো। তাঁর ডান ফুসফুসের নিচের অংশ বাদ দিয়েছেন চিকিৎসকেরা। অস্ত্রোপচারের পরে স্বাভাবিক ভাবেই জ্ঞান ফিরেছে তাঁর। কোনো জটিলতাও দেখা দেয়নি বলে জানিয়েছে ভ্যাটিকান। তবে, অস্ত্রোপচার সফল হলেও ক্যানসার শরীরের অন্যত্র ছড়িয়েছে কি না, তা জানতে আরও পরীক্ষার প্রয়োজন। আপাতত হাসপাতালে বিশ্রামে ৭১ বছরের পোপ। তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি।

পোপের অসুস্থতার খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই উদ্বেগ ছড়িয়েছে গোটা বিশ্বের ক্যাথলিক সম্প্রদায়ের মধ্যে। বুধবার তাঁর সফল অস্ত্রোপচারের খবরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। সমাজমাধ্যমে পোপের দ্রুত আরোগ্য ও সুস্বাস্থ্য কামনা করেছেন তিনি। অন্যদিকে, অস্ত্রোপচারের পরে আপাতত সমস্ত পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে পোপের। আগামী ২০ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁর কোনো প্রকাশ্য সাক্ষাৎ বা কর্মসূচি নেই। আগামী মাসে দক্ষিণ আমেরিকা সফরে যাওয়ার কথা রয়েছে তাঁর। শারীরিক অবস্থার কারণে সে সফরের পরিকল্পনায় কোনো পরিবর্তন আসে কি না, তা নিয়েও জল্পনা শুরু হয়েছে।

ভ্যাটিকানের বিবৃতি অনুযায়ী, পোপের ডান ফুসফুসের নিচের অংশ অস্ত্রোপচার করে বাদ দেওয়া হয়েছে। চিকিৎসকদের ভাষায়, এ পদ্ধতির নাম ‘লোবেকটমি’। অস্ত্রোপচারের আগে করা পরীক্ষায় ফুসফুসে ক্যানসারযুক্ত টিউমারের সন্দেহ করা হয়েছিল। অস্ত্রোপচারের সময় টিস্যু পরীক্ষা করে সে সন্দেহই নিশ্চিত হয়েছে। পোপের ফুসফুসে ধরা পড়েছে ‘পালমোনারি অ্যাডেনোকার্সিনোমা’, যা এক ধরনের ‘নন-স্মল সেল লাং ক্যানসার’। ভ্যাটিকানের তরফে জানানো হয়েছে, ক্যানসার আক্রান্ত অংশটি যথাসম্ভব সম্পূর্ণ ভাবে বাদ দেওয়ার জন্য অস্ত্রোপচারে ফুসফুসের নিচের ‘লোব’টি সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। ভিডিয়ো-সহায়ক পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয় অস্ত্রোপচার। অস্ত্রোপচারের সময় চিকিৎসকেরা টিস্যুর হিস্টোলজিক্যাল পরীক্ষাও করেন। তাতে ক্যানসারের উপস্থিতি নিশ্চিত হয়েছে বলে জানিয়েছে ভ্যাটিকান নিউজ।

অস্ত্রোপচার চলে প্রায় ৯০ মিনিট। তবে পোপ মোট ৩ ঘণ্টা অস্ত্রোপচার কক্ষে ছিলেন। অস্ত্রোপচারের পরে কিছুক্ষণ পর্যবেক্ষণে রাখার পর তাঁকে হাসপাতালের দশম তলায় নিজের ঘরে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। ভ্যাটিকানের এক সূত্রের দাবি, অস্ত্রোপচারের পরে রাতের খাবারও চেয়েছিলেন পোপ। বুধবার ভ্যাটিকান জানিয়েছে, অস্ত্রোপচারের পর রাত নির্বিঘ্নেই কেটেছে তাঁর। তবে অস্ত্রোপচার সফল হওয়া মানেই ক্যানসার সম্পূর্ণ নির্মূল হয়েছে, এমনটা এখনই বলা যাচ্ছে না। ফুসফুস থেকে বাদ দেওয়া টিস্যু এবং লসিকাগ্রন্থির পরীক্ষার ফলের উপর নির্ভর করবে পরবর্তী চিকিৎসা। ক্যানসার আক্রান্ত কোষ ফুসফুসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল, না কি কাছাকাছি লসিকাগ্রন্থি কিংবা শরীরের অন্য কোনো অংশে ছড়িয়েছে, তা খতিয়ে দেখছেন চিকিৎসকেরা। আপাতত কেমোথেরাপি বা অন্য কোনো অতিরিক্ত চিকিৎসার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি বলে জানিয়েছে ভ্যাটিকান।

ফুসফুসের ‘অ্যাডেনোকার্সিনোমা’ ক্যানসারের একটি পরিচিত ধরন। শ্বাসনালির আবরণ তৈরি করে এমন কোষ অথবা শ্লেষ্মা উৎপাদনকারী কোষ থেকে এই ক্যানসারের উৎপত্তি হতে পারে। রোগটি কতটা গুরুতর, তা নির্ভর করে টিউমারের আকার, অবস্থান, ক্যানসার কতটা ছড়িয়েছে এবং কোষের বৈশিষ্ট্যের উপর। চিকিৎসকদের মতে, ফুসফুসের নির্দিষ্ট কিছু ক্যানসারের ক্ষেত্রে অস্ত্রোপচার করে আক্রান্ত অংশ বাদ দেওয়া একটি প্রতিষ্ঠিত চিকিৎসাপদ্ধতি। তবে পোপের ক্যানসার ঠিক কোন পর্যায়ে রয়েছে, তা এখনই নির্দিষ্ট করে বলা সম্ভব নয়। অস্ত্রোপচারের পরে লসিকাগ্রন্থি পরীক্ষা করা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার অংশ এই গ্রন্থিগুলিতে ক্যানসার ছড়িয়েছে কি না, তা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে পরীক্ষা করে দেখা হয়। সে তথ্যের ভিত্তিতেই রোগের পর্যায় নির্ধারণ ও পরবর্তী চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকেরা। তবে লসিকাগ্রন্থি পরীক্ষা করা হচ্ছে বলেই যে ক্যানসার সেখানে ছড়িয়েছে, এমনটাও ধরে নেওয়ার কারণ নেই। চূড়ান্ত প্যাথলজি রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত পোপের রোগের ভবিষ্যৎ গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না।

ভ্যাটিকানের দাবি, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষার সময়ই পোপের ফুসফুসে ছোটো একটি ‘নডিউল’ বা পিণ্ডের সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। এমন কোনো উপসর্গ ছিল না, যার কারণে আলাদা করে ফুসফুস পরীক্ষা করার প্রয়োজন হয়েছিল। রবিবার সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে প্রার্থনার পরে জনতার উদ্দেশে কথা বলতে গিয়ে পোপ নিজেই জানান, চিকিৎসকেরা তাঁর ফুসফুসে প্রাথমিক পর্যায়ের একটি ‘নডিউল’ পেয়েছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, অস্ত্রোপচার করানোই এক্ষেত্রে যথাযথ সিদ্ধান্ত। ক্যানসার প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়া  আর রোগটি ফুসফুসের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা — এ দু-টি বিষয় এ ধরনের চিকিৎসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। তবে পোপের ক্ষেত্রে সে সম্ভাবনা কতটা, তা নির্ভর করছে পরবর্তী পরীক্ষার ফলের উপর। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, অস্ত্রোপচারের পরে বাদ দেওয়া টিস্যু নিয়ে আরও পরীক্ষা করা হবে। সেসব রিপোর্টের ভিত্তিতেই বোঝা যাবে, ক্যানসার সম্পূর্ণ ভাবে বাদ দেওয়া সম্ভব হয়েছে কি না, অতিরিক্ত চিকিৎসার প্রয়োজন রয়েছে কি না।

এদিকে, পোপের অসুস্থতার খবর প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই জেমেলি হাসপাতালের বাইরে জড়ো হন বহু মানুষ। অস্ত্রোপচারের আগে হাসিমুখে হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন তিনি। গাড়ির কাচ নামিয়ে হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষারত অনুরাগীদের দিকে হাতও নাড়েন। তাঁকে দেখতে পেয়ে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন অনেকে। হাসপাতালের কর্মীরাও প্রবেশপথে অপেক্ষা করছিলেন পোপকে স্বাগত জানাতে।  পোপের আরোগ্য কামনায় বিশেষ প্রার্থনার আয়োজনও করা হয় হাসপাতালের প্রার্থনাকক্ষে। রোমের ডায়োসিসের ভিকার জেনারেল কার্ডিনাল বালদাসারে রেইনা সে প্রার্থনায় নেতৃত্ব দেন। ভ্যাটিকানের তরফে তা সম্প্রচার করা হয়। শহরের সমস্ত গির্জাকেও প্রার্থনায় যোগ দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। ভ্যাটিকানের ‘সেক্রেটারি অফ স্টেট কার্ডিনাল’ পিয়েত্রো পারোলিন জানিয়েছেন, সোমবার পোপের সঙ্গে দেখা করার সময় তাঁকে যথেষ্ট শান্ত দেখাচ্ছিল। পোপের শারীরিক অবস্থা নিয়ে ভ্যাটিকানের এ ঘোষণা আরও একটি কারণে তাৎপর্যপূর্ণ। ক্যাথলিক চার্চের প্রধানদের স্বাস্থ্য নিয়ে দীর্ঘ দিন ধরেই গোপনীয়তা বজায় রাখার রীতি রয়েছে। তবে পোপ ফ্রান্সিসের আমলে সে অবস্থানে কিছুটা পরিবর্তন আসে। নিজের অসুস্থতা ও চিকিৎসা নিয়ে প্রকাশ্যে কথা বলতেন আর্জেন্টিনার বাসিন্দা ফ্রান্সিস। তাঁর উত্তরসূরি চতুর্দশ লিয়োর ক্ষেত্রেও এখন নিয়মিত ভাবে চিকিৎসা সংক্রান্ত তথ্য প্রকাশ করছে ভ্যাটিকান।

১৯৫৫ সালে আমেরিকার শিকাগো শহরে জন্ম রবার্ট প্রিভোস্টের। ২০২৫ সালের ৮ মে ক্যাথলিক চার্চের প্রধান হিসেবে নির্বাচিত হন তিনি। প্রথম মার্কিন পোপ হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে বড়ো কোনো উদ্বেগের খবর সামনে আসেনি। খেলাধুলোর প্রতিও আগ্রহ রয়েছে তাঁর। দায়িত্ব নেওয়ার পর এই প্রথম হাসপাতালে ভর্তি হতে হল তাঁকে। পোপের সফল অস্ত্রোপচারের খবরে আশ্বস্ত প্রধানমন্ত্রী মোদিও। এর আগে ২০২৫ সালের মে মাসে পোপ নির্বাচিত হওয়ার পরেও তাঁকে অভিনন্দন জানিয়েছিলেন তিনি। বিশ্বে শান্তি, সম্প্রীতি, সংহতি ও সেবার আদর্শ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর নেতৃত্ব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেবে বলে আশা প্রকাশ করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী। হোলি সি-র সঙ্গে ভারতের ধারাবাহিক আলোচনা ও সহযোগিতার প্রতিশ্রুতিও জানিয়েছিলেন তিনি।

এখন নজর পোপের পরবর্তী চিকিৎসা এবং সুস্থ হয়ে ওঠার দিকে। আপাতত প্রায় এক সপ্তাহ হাসপাতালে থাকার কথা তাঁর। ২০ অক্টোবর পর্যন্ত সমস্ত প্রকাশ্য কর্মসূচি বাতিল করা হয়েছে। কিন্তু নভেম্বরের শুরুতেই দীর্ঘ বিদেশ সফরের পরিকল্পনা থাকায় সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আগামী ৬ থেকে ১৭ নভেম্বর উরুগুয়ে, আর্জেন্টিনা ও পেরুতে যাওয়ার কথা পোপের। সফরটি বাস্তবায়িত হলে তাঁর দায়িত্ব নেওয়ার পর এটাই হবে দীর্ঘতম বিদেশযাত্রা। প্রায় ৩১ হাজার কিলোমিটারেরও বেশি পথ পাড়ি দেওয়ার পাশাপাশি ১২টি বিমানযাত্রা ও দু’টি হেলিকপ্টারযাত্রার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে, বিশেষজ্ঞদের মতে, ফুসফুসে অস্ত্রোপচারের পরে বিমানযাত্রা শুরু করার আগে পর্যাপ্ত সময় নিয়ে সুস্থ হয়ে ওঠা জরুরি। সাধারণত এ ধরনের অস্ত্রোপচারের পরে অন্তত তিন সপ্তাহ বিমানযাত্রা এড়িয়ে চলার পরামর্শ দেওয়া হয়। ফলে পোপের হাতে সময় খুব বেশি নেই। তবে সফর নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো জানানো হয়নি।  ক্যাথলিক চার্চের আইন অনুযায়ী, পোপের মৃত্যু হলে প্রশাসনিক দায়িত্ব সামলানোর জন্য রয়েছেন ‘কার্ডিনাল ক্যামেরলেনগো’ বা ‘চেম্বারলিন’। কিন্তু পোপ অসুস্থ হয়ে দায়িত্ব পালনে অক্ষম হলে তাঁর পরিবর্তে দায়িত্ব নেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম নেই নেই। ফলে পোপের শারীরিক অবস্থা শুধু ধর্মীয় ক্ষেত্রেই নয়, চার্চের প্রশাসনিক দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!