- এই মুহূর্তে বৈষয়িক
- জুন ৩০, ২০২৫
স্টেট ব্যাঙ্ক সহ দেশের ১২টি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের মুনাফা বাড়লো ৭১ শতাংশ, ঋণ খেলাপির হার সর্বনিম্নে
দেশের অর্থনীতির পরিকাঠামোগত স্তম্ভ হল ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা। এই স্তম্ভ যদি দুর্বল হয়, তবে পুরো অর্থনীতির উপরেই তার ভয়াবহ প্রভাব পড়ে। ২০১৭-১৮ সালে ঠিক এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছিল ভারত। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলি সম্মিলিত ভাবে প্রায় ৮৫ হাজার কোটি টাকার ক্ষতির মুখে পড়েছিল। ঋণখেলাপি, দুর্বল আর্থিক সংহতি, মূলধনের অভাব আর দুর্বল গ্রাহক পরিষেবা ব্যাঙ্কিং খাতের স্বাস্থ্যকে গুরুতর ভাবে বিপন্ন করেছিল। সেখান থেকেই শুরু হয় ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াই শুরু হয়। ২০২৫ সালে এসে দেখা যাচ্ছে— সে লড়াইয়ের ফল আজ হাতে আসছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির আর্থিক স্বাস্থ্য কতটা উন্নত হয়েছে, তার স্পষ্ট প্রমাণ মিলেছে ২৭ জুন, দিল্লিতে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমনের সঙ্গে পিএসবিগুলির শীর্ষ কর্তাদের উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকে। রেকর্ড মুনাফা, ঋণ খেলাপের সর্বনিম্ন হার, স্থিতিশীল ঋণ প্রবাহ এবং ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থায় বাড়তি তরলতার মধ্য দিয়ে দেশের ব্যাঙ্কিং খাত যে ঘুরে দাঁড়িয়েছে, তা এ দিনের দীর্ঘ পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের সাম্প্রতিক রেপো রেট হ্রাস (৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৫.৫%) আর সিসিআর কমিয়ে ৩ শতাংশ করার সিদ্ধান্তের জেরে ২.৫ লক্ষ কোটি টাকা অতিরিক্ত তরলতা এসেছে বাজারে। গত ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ১.৭৮ লক্ষ কোটি টাকায়। এক বছর আগে যা ছিল ১.০৪ লক্ষ কোটি টাকা। অর্থাৎ একলপ্তে ৭১ শতাংশেরও বেশি লাভের মুখ দেখেছে তারা। এই তালিকায় সবার ওপরে স্টেট ব্যাঙ্ক অফ ইন্ডিয়া, তারা একাই ৭০,৯০১ কোটি টাকার মুনাফা করেছে, ২০২৪-২৫ অর্থবর্ষের তুলনায় তুলনায় ১৬ শতাংশ বেশি। গোটা রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্ক মুনাফার প্রায় ৪০ শতাংশ এসেছে এসবিআই থেকেই। অন্যদিকে, সবচেয়ে বেশি মুনাফার প্রবৃদ্ধি হয়েছে পাঞ্জাব ন্যাশনাল ব্যাঙ্ক। ১০২ শতাংশ বেড়ে ১৬,৬৩০ কোটি। দ্বিতীয় স্থানে পাঞ্জাব অ্যান্ড সিন্ধ ব্যাঙ্ক, যার নিট লাভ বেড়েছে ৭১ শতাংশ। শুধু লাভ নয়, ব্যাঙ্কগুলির অনাদায়ী ঋণের পরিমাণও উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে। ২৫-২৬ অর্থবর্ষে নিট এনপিএ কমে এসেছে মাত্র ০.৫২ শতাংশে, যা গত কয়েক বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। শুধুমাত্র পরিসংখ্যানগত উন্নতি নয়, বরং আর্থিক শৃঙ্খলার পুনঃপ্রতিষ্ঠা, সুশাসনের প্রতিফলন আর নীতিগত স্থিরতার চিহ্ন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে কেন্দ্রের বহুস্তরীয় ‘ফোর আর’ কৌশল—’রেকগনাইজ’, ‘রিজলভড’, ‘রি-ক্যাপিটালাইজ’ ও ‘রিফর্ম’। অর্থাৎ স্বচ্ছতার সঙ্গে অনাদায়ী ঋণ চিহ্নিত করা, অনাদায়ী ঋণের সমস্যা সমাধান ও পুনরুদ্ধার, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে নতুন মূলধন সহায়তা প্রদান, আর্থিক ব্যবস্থায় প্রয়োজনীয় কাঠামোগত সংস্কার, ডিজিটাল পরিকাঠামো গঠন এবং ব্যাঙ্ক সংযুক্তিকরণ, সব মিলিয়ে ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থার ভিতকে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে। এ শুধু মুনাফার অঙ্ক নয়, ব্যাঙ্কগুলির ভূমিকাও এখন বহুমাত্রিক। কৃষি, এমএসএমই, সবুজ জ্বালানি থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক বুলিয়ন এক্সচেঞ্জে অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিকে অগ্রণী শক্তি হিসেবে ভাবা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, আর্থিক অন্তর্ভুক্তিকরণ প্রকল্প যেমন জনধন, মুদ্রা যোজনা বা বিদ্যালক্ষ্মীর মতো প্রকল্পে ব্যাঙ্কগুলির সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রশংসনীয়। ২০১৬-১৭ থেকে ২০২০-২১ সময়কালে কেন্দ্র রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলিতে ৩,১০,৯৯৭ কোটি মূলধনী সহায়তা দিয়েছিল। ২০২২-২৩ থেকে ২০২৫-অর্থবর্ষের মধ্যে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির মোট ব্যবসা ২০৩ লক্ষ কোটি থেকে বেড়ে হয়েছে ২৫১ লক্ষ কোটি টাকা। একই সময়ে অনাদায়ী ঋণের হার ১.২৪% থেকে কমে হয়েছে ০.৫২%, ব্যাঙ্কগুলি কেন্দ্রকে চলতি অর্থবর্ষে ৩৪,৯৯০ কোটি টাকার লভ্যাংশ দিয়েছে, যা গত অর্থবর্ষে ২০,৯৬৪ কোটি টাকা ছিল।
অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণ এ প্রসঙ্গে জানান, পিএসবিগুলির ঝুঁকিভিত্তিক সম্পদের তুলনায় মূলধনের অনুপাত ২৫-এর মার্চে ১৬.১৫% ছিল, যা দেশের আর্থিক স্থিতিশীলতার উজ্জ্বল প্রমাণ। এর পাশাপাশি, ব্যাঙ্কগুলিকে আরও বেশি আমানত সংগ্রহে উৎসাহিত করা হয়েছে। বিশেষ করে আধা-শহর ও গ্রামীণ এলাকায় শাখা বিস্তার, ক্যাম্পেইন পরিচালনা, ও স্থানীয় স্তরে কার্যকরী প্রচারের ওপর জোর দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তিনি আরও জানিয়েছেন, প্রধানমন্ত্রী ধন ধান্য যোজনা, সূর্যঘর বিন্যমূল্যে বিজলী যোজনা, বিদ্যালক্ষ্মী, বিশ্বকর্মা, কিষাণ ক্রেডিট কার্ড—এসব আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রকল্পে অংশগ্রহণ বাড়ানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ১ জুলাই থেকে তিন মাসব্যাপী ‘আর্থিক অন্তর্ভুক্তি বৃদ্ধি অভিযান’ শুরু হচ্ছে। আশা করা হচ্ছে সেগুলি দেশের ২.৭ লক্ষ গ্রাম ও শহর পঞ্চায়েত স্তরে পৌঁছাবে। পাশাপাশি, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোগ -এর জন্য তৈরি নতুন ঋণ মূল্যায়ন পরিকাঠামো, যাতে ইতিমধ্যেই কেন্দ্র ৬০,০০০ কোটির ঋণ মঞ্জুর করেছে, সেটিরও দ্রুত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। স্ট্যান্ড আপ ইন্ডিয়া প্রকল্পেও ২.২৮ লক্ষ ঋণ মঞ্জুর হয়েছে, যার ব্যয়ের পরিমাণ ৫১,১৯২ কোটি।
তা ছাড়াও, আন্তর্জাতিক আর্থিক‑প্রযুক্তি শহর-এ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কগুলির উপস্থিতি বাড়ানো, আইআইবিএক্স-এ সক্রিয় অংশগ্রহণ, আর আন্তর্জাতিক সুযোগ কাজে লাগানোর দিশাও দেখানো হয়েছে। গ্রাহক পরিষেবায় উন্নতির লক্ষ্যে দ্রুত অভিযোগ নিষ্পত্তি, বহু-ভাষিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, আধুনিক শাখা এবং শহুরে সম্প্রসারণেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। নির্মলা সীতারমণ জানিয়েছেন, ব্যাঙ্কগুলিকে যাতে নিজেদের কার্যকারিতা আরও প্রসারিত করতে, তার জন্য আরও কর্মী নিয়োগ করতে, স্থানীয় অর্থনৈতিক সম্ভাবনা চিহ্নিত করে স্থানভিত্তিক ঋণপণ্য তৈরি করতে, এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির লক্ষ্যে নতুন মডেল নির্মাণ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চল এবং গ্রামীণ এলাকায় ব্যাঙ্কগুলির নতুন শাখা বাড়ানোর নির্দেশও দিয়েছেন তিনি। ‘বিজনেস করেসপন্ডেন্ট নেটওয়ার্ক’ শক্তিশালী করার উপর বিশেষ জোর দেওয়া হয়েছে, যাতে দেশের সর্বস্তরে ব্যাঙ্কিং পরিষেবা পৌঁছে দেওয়া যায়।
❤ Support Us





