Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • ডিসেম্বর ৪, ২০২৫

পশ্চিমী ‘নিষেধাজ্ঞা’ উড়িয়ে দিল্লির মাটিতে পা পুতিনের, বিমানবন্দরে ‘বন্ধু’-কে উষ্ণ আলিঙ্গন প্রধানমন্ত্রী মোদির, আগামীকাল শুরু দ্বিপাক্ষিক বৈঠক

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পশ্চিমী ‘নিষেধাজ্ঞা’ উড়িয়ে দিল্লির মাটিতে পা পুতিনের, বিমানবন্দরে ‘বন্ধু’-কে উষ্ণ আলিঙ্গন প্রধানমন্ত্রী মোদির, আগামীকাল শুরু দ্বিপাক্ষিক বৈঠক

অসাধারণ ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মুহূর্তে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যার আকাশে ভর করে দিল্লিতে নামলেন ভ্লাদিমির পুতিন। পালাম বিমানবন্দরে তাঁকে স্বাগত জানাতে হাজির স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। প্রটোকল ছাপিয়ে ব্যক্তিগত সম্বন্ধের উষ্ণতা। সংক্ষিপ্ত আনুষ্ঠানিকতার পরেই দু’জনের আলিঙ্গন, করমর্দন, আর তারপর সে বহুল ব্যবহৃত চিত্র, এক গাড়িতে পাশাপাশি বসে রওনা। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের আবহে পুতিনের প্রথম ভারত সফরকে ঘিরে এমন রাজকীয় আপ্যায়নই যেন জানিয়ে দিল, পুরনো মিত্রতার সুর এখনো বদলায়নি।

পুতিনকে বিমানবন্দরে নেমে সঙ্গ দিলেন একদল শিল্পী। ঢাক-ঢোল নয়, বরং সংযত অথচ আভিজাত্যে ভরা সাংস্কৃতিক অভিনন্দন। তারপর নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তায় একই গাড়িতে একই সঙ্গে রওনা লোককল্যাণ মার্গে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনের দিকে। শুক্রবার সকালে অনুষ্ঠিত হবে এই সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্ব— হায়দরাবাদ হাউসে ২৩তম ভারত–রাশিয়া বার্ষিক শীর্ষ বৈঠক। কিন্তু কেন এই ৯৭ বছরের পুরোনো স্থাপত্যকেই বেছে নেওয়া হয় উচ্চস্তরের কূটনৈতিক বৈঠকের ঠিকানা হিসেবে? কারণ দুটি— প্রথমত, নিরাপত্তা। ব্রিটিশ আমলের এই ভবন বহুস্তরীয় নিরাপত্তা বেষ্টনীতে আবদ্ধ। ভূগর্ভস্থ যোগাযোগ ব্যবস্থা, সীমিত প্রবেশপথ, ঘন নজরদারি— যে কোনো সংবেদনশীল আলোচনার জন্য আদর্শ। দ্বিতীয়ত, ঐতিহাসিক মর্যাদা। লুটিয়েন্সের নকশায় গড়া এই স্থাপনা বহু বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধানের আতিথেয়তার সাক্ষী। দিল্লির প্রশাসনিক হৃদয়ে দাঁড়ানো এই ভবনে আলোচনার মধ্যেই থাকে এক ধরনের কূটনৈতিক মাধুর্য। শুক্রবার এখানেই হবে দ্বিপাক্ষিক বৈঠক, পাশাপাশি কর্মমধ্যাহ্নভোজ। প্রতিরক্ষা, বাণিজ্য, ভূ-কৌশল, শক্তি-সহযোগিতা—সব ক্ষেত্রেই আলোচনার গুরুত্ব প্রবল।

মঙ্গলবার সকালেই রাষ্ট্রীয় অভ্যর্থনায় শুরু হবে পুতিনের সরকারি সূচি। এরপর যাবেন রাজঘাটে— গান্ধী স্মৃতিস্তম্ভে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন। এরপর ফিরে যাবেন হায়দরাবাদ হাউসে, যেখানে মোদী-পুতিন বৈঠক ঘিরে রয়েছে বিস্তৃত আলোচ্যসূচি। ভারত-রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সম্পর্কের ধারাটিই এই সফরের কেন্দ্রবিন্দু। ইউক্রেন যুদ্ধের পর রাশিয়ার কিছু সামরিক প্ল্যাটফর্মের সরবরাহে বিলম্ব হয়েছে। বিশেষত এস-৪০০ এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমের বাকি থাকা দুটি ইউনিট— যা আগামী বছর মাঝামাঝি হাতে পাওয়ার বিষয়ে ভারত স্পষ্টতা চাইছে। ২০১৮ সালের ৫ বিলিয়ন ডলারের এই চুক্তির ৩টি ইউনিট ইতিমধ্যেই এসে পৌঁছেছে এবং ‘অপারেশন সিঁদুর’-এ প্রয়োগে সাফল্যের নজির রেখেছে বলে সরকারি মহলের দাবি। ক্রেমলিনের মুখপাত্র দিমিত্রি পেসকভ ইঙ্গিত দিয়েছেন, মোদি-পুতিন আলোচনায় ভারতের সম্ভাব্য আগ্রহের তালিকায় থাকা সুউ-৫৭ পঞ্চম প্রজন্মের যুদ্ধবিমান নিয়েও কথা উঠতে পারে। ভারতের বিকল্প হিসেবে রয়েছে রাফাল, এফ–২১, এফ/এ–১৮, ইউরোফাইটার টাইফুন, ফলে এই প্রস্তাব আলোচনাকে আরো তীব্র করে তুলবে।

ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে অভূতপূর্ব টানাপোড়েন, মস্কোর বিরুদ্ধে পশ্চিমী নিষেধাজ্ঞা, ইউক্রেন যুদ্ধ থামাতে ওয়াশিংটনের তৎপরতা, রুশ তেল-কূটনীতিতে চাপ— এই জটিল সমীকরণে পুতিনের এই সফর স্বাভাবিকভাবেই আলোচনার কেন্দ্রে। কেউ কেউ বলছেন, দুই দশকে ভারত-আমেরিকা সম্পর্কে এতটা তিক্ততা দেখা যায়নি। তার মধ্যেই মার্কিন প্রশাসনের ভারতের বহু পণ্যে ৫০ শতাংশ শুল্ক এবং রাশিয়ান তেল কেনার ‘অভিযোগে’ অতিরিক্ত ২৫ শতাংশ কর আরোপ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে এখনো বিপুল পরিমাণ অপরিশোধিত তেল আমদানি করলেও রাশিয়ার ভারত থেকে আমদানি তুলনামূলকভাবে কম। বৈষম্য কমাতেই নয়াদিল্লির লক্ষ্য মস্কোয় সামুদ্রিক পণ্য, আলু, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, ওষুধের রফতানি বাড়ানো। মুক্ত বাণিজ্য, বন্দর-সংযোগ, তেল-কূটনীতি— এসবই আলোচনার তালিকায়।

পুতিন ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, দু-দেশ ভবিষ্যতের মহাকাশ গবেষণা, জাহাজ ও বিমান নির্মাণ, পরমাণুশক্তি প্রকল্প, এমনকি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহারের ক্ষেত্রেও যুগ্ম উদ্যোগ নিয়ে এগোতে চায়। রাশিয়ার প্রেসিডেন্টের কার্যালয়ের ডেপুটি চিফ অফ স্টাফ ম্যাকসিম ওরেশকিন জানিয়েছেন, মোদি ও পুতিন ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য ১০০ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছনোর লক্ষ্য স্থির করেছেন। ভারতের রফতানি— বিশেষ করে ওষুধ, গাড়ি, কৃষিপণ্য ও সামুদ্রিক দ্রব্য উল্লেখযোগ্য হারে বাড়তে পারে বলেও আশা। বর্তমানে দুই দেশের বাণিজ্য মূলত জ্বালানি, সার ও যন্ত্রপাতি-কেন্দ্রিক। ২০২৪ সালে তা ১২ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৩.৬ বিলিয়ন ডলার। মোদি-পুতিন বৈঠকের পাশাপাশি আলাদা করে বসবেন দুই দেশের প্রতিরক্ষা মন্ত্রী— রাজনাথ সিং ও আন্দ্রে বেলোসোভ। বকেয়া সামরিক প্রকল্প, রক্ষণাবেক্ষণ, ক্রয়-বিকল্প, সব ক্ষেত্রেই আলোচনার গুরুত্ব তীব্র। ভারত চায় দ্রুত সরবরাহ আর রাশিয়া চায় নতুন প্রজন্মের প্রযুক্তি সহযোগিতা।

সোমবার রাতে প্রধানমন্ত্রী মোদীর দেওয়া নৈশভোজে যোগ দেবেন পুতিন। শুধু কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়, ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার বার্তাও স্পষ্ট। পুতিনের সফরে অন্যতম নজরকাড়া অংশ— রাশিয়ার রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম আরটি–র ভারতীয় চ্যানেল উদ্বোধন। বৃদ্ধি পেতে থাকা মিডিয়া-সংযোগের মধ্যেই মস্কোর বৃহত্তর সাংস্কৃতিক কূটনীতি লক্ষ্য করছে কূটনৈতিক মহল। এ ছাড়া পুতিনের সঙ্গে এসেছেন রুশ মন্ত্রিসভার একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ সদস্য— প্রতিরক্ষা, অর্থ, কৃষি, স্বাস্থ্য, স্বরাষ্ট্র ও পরিবহণমন্ত্রী, যাঁরা এ সফরের গুরুত্বের কথা জোড়ালো করছেন। শুক্রবার কর্মভোজ ও শীর্ষ বৈঠকের পরে পুতিন যোগ দেবেন রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর দেওয়া রাষ্ট্রীয় নৈশভোজে। সেখানেই সফরের আনুষ্ঠানিক ইতি। রাত সাড়ে ন-টা নাগাদ তাঁর দিল্লি ছাড়ার কথা। রুশ প্রেসিডেন্টের ২ দিনের সফর কেন্দ্র করে রাজধানী এই মুহূর্তে নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা। কেন্দ্রীয় ও নয়া দিল্লিতে মোতায়েন ৫ হাজারের বেশি পুলিশ। সোয়াট টিম, অ্যান্টি-টেরর স্কোয়াড, স্নাইপার, আকাশে অ্যান্টি-ড্রোন ব্যবস্থা, শহরজুড়ে এইচডি সিসিটিভি নজরদারি চলছে।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!