- এই মুহূর্তে বি। দে । শ
- জুন ২৫, ২০২৫
নিলামে ‘পাষাণহৃদয়’: রবীন্দ্রনাথের হাতেগড়া একমাত্র ভাস্কর্য ও চিঠিপত্রের ঐতিহাসিক মুহূর্তে বাঙালির আত্মবিস্মৃত অনুশোচনা
আগামিকাল ২৬ জুন, মুম্বইয়ের অস্থাগুরু অকশন হাউসে নিলামে উঠতে চলেছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নিজের হাতে গড়া একমাত্র প্রামাণ্য ভাস্কর্য ‘পাষাণহৃদয়’। এবং তাঁর হাতে লেখা ৩৫টি চিঠির এক দুর্লভ সংকলন। কোয়ার্টজাইট পাথরের হৃদয়াকৃতি এক ক্ষুদ্র ভাস্কর্য। মাপে মাত্র ১.৬ × ১.৮ × ১.২ ইঞ্চির ভাস্কর্যটি শুধু কবির বহুমাত্রিক প্রতিভার একটি বিরল নিদর্শন নয়, তাঁর ব্যক্তিজীবনের এক গভীর, অপ্রকাশ্য বেদনাসন্ধানী অধ্যায়েরও নীরব ভাষ্য। সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক এবং ঐতিহাসিক মূল্যে অমূল্য। অপরিসীম। এখানে আছে অস্পষ্ট, আলো-আঁধারি, অভিমানের অধ্যায়ে কবির কৈশোর-যৌবনের আধ্যাত্মিক ও ব্যক্তিগত চেতনার সংকট।
১৮৮৩ সালের কর্ণাটকের কারোয়ারে, মাত্র বাইশ বছর বয়সে, একটি পাথরের বুকে কাদম্বরী দেবীকে উদ্দেশ করে কবিতা খোদাই করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। এই পাথরখণ্ডই পরবর্তীতে পরিচিত হয় ‘দ্য হার্ট অফ স্টোন’ নামে, যেখানে রবীন্দ্রনাথ খোদাই করেছিলেন চর্তুদশপদী এক কবিতা, ‘পাষাণ হৃদয় কেটে / খোদিনু নিজের হাতে / আর কি মুছিবে লেখা / অশ্রুবারিধারাপাতে?’ – অভিমান, যন্ত্রণা, প্রত্যাখ্যান আর সৃজনের নিঃসীম মেধার একযোগে প্রকাশ এই চার পংক্তিতে। কাদম্বরী দেবীকে রবীন্দ্রনাথ অভিহিত করছেন ‘পাষাণী’ হিসেবে, যিনি তাঁর প্রেমবেদনায়, তাঁর অশ্রুজলে, কোনও সাড়া দেননি। এই ভাস্কর্য শুধু কবির ‘না পাওয়া প্রেম’-এর নিদর্শন নয়, এটি এক ঐতিহাসিক দলিল, যা মিথ্যা-কল্পনায় ঢেকে রাখা কাদম্বরী-রবীন্দ্র সম্পর্ককে এক অনন্য বাস্তবতার আলোয় উদ্ভাসিত করে। কাদম্বরীকে নিয়ে একুশ শতকের বাজার-সৃষ্ট সাহিত্য-পরিবেশে যে নোংরা ও বানোয়াট চটুল সাহিত্য রচিত হয়েছে, ‘পাষাণহৃদয়’ তার বিরুদ্ধে নিঃশব্দ প্রতিবাদ।
রবীন্দ্রনাথ-কাদম্বরী সম্পর্ক নিয়ে একাংশ গবেষকের বক্তব্য, এটি ছিল গভীর আত্মিক ও প্রেমাত্মক বন্ধন। অন্যপক্ষে, ‘পাষাণহৃদয়’ যেন সেই মতকে প্রশ্নচিহ্ন দিয়ে পেরেক ঠুকে দেয়—প্রেম নয়, বরং ছিল একতরফা আকর্ষণ। যে আকর্ষণ কাদম্বরীর তরফে এক বিরাগে স্তব্ধ ছিল। ভাস্কর্যখচিত কবিতার ভাষ্যই বলে দেয়, রবীন্দ্রনাথ যেন লিখছেন এক অভিমানের ছায়াগীত—তাঁর চোখের জলে ধুয়ে যাবে না হৃদয়ে লেখা সেই গোপন বেদনা। এমন এক শিল্পকর্ম শুধু কবির ভাস্কর্যশিল্প নয়, তাঁর অন্তর্জগতের এক নিরাভরণ দলিল। ভাস্কর্যটি প্রথমে রবীন্দ্রনাথ উপহার দেন বন্ধু অক্ষয় চৌধুরীকে—যিনি কাদম্বরীর প্রতি কবির অনুভবের নীরব সাক্ষী ছিলেন। সেখান থেকে তা অক্ষয়ের স্ত্রী শরৎকুমারী, পরে তাঁদের কন্যা উমারানী ও পৌত্রী দেবযানীর মাধ্যমে যায় ইলোরা বসুর (দেবযানীর পুত্রবধূ) হাতে। ১৯৭৯ সালে পরিবারটি পাড়ি জমায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। ব্লুমিংটনের এক ব্যাংক লকারে প্রায় ৪৪ বছর ধরে সংরক্ষিত ছিল এই ‘পাষাণহৃদয়’। ২০২৩ সালে সেই পাথরফিরতি। এবং ২০২৪ সালের ২৬ মে, রামকিঙ্কর জন্মজয়ন্তীতে কলকাতার দেবভাষা গ্যালারিতে এর প্রথম সর্বজনীন আত্মপ্রকাশ।
আগামিকাল মুম্বইয়ের অস্থগুরু অকশন হাউসে শুরু হতে চলেছে এক ইতিহাসসন্ধানী নিলাম। ‘পাষাণহৃদয়’-এর প্রারম্ভিক মূল্য ধরা হয়েছে ৫৫-৭০ লক্ষ। এটি ভারত সরকারের ‘ন্যাশনাল আর্ট ট্রেজার’ তালিকাভুক্ত হওয়ায় দেশের বাইরে পাঠানো যাবে না। রবীন্দ্রনাথের জীবন ও শিল্পচিন্তার বহুমাত্রিকতা— সাহিত্য, সংগীত, চিত্রশিল্প, নাটক, নৃত্যচেতনা— সবই আমরা পণ্য করে তুলেছি অনেক আগেই। তাঁর কবিতা দিয়ে প্রেম, গান দিয়ে বিচ্ছেদ, আর মৃত্যুতেও তাঁর পংক্তি দিয়ে শোক ভুলে থাকার চেষ্টা করি আমরা। অথচ এই অমূল্য বস্তু, এই ভাস্কর্য ও হাতে লেখা ৩৫টি পত্রের সম্ভাব্য নিলামে আমরা যেন নির্বিকার দর্শক। প্রশ্ন ওঠে, এগুলির স্থান কি কোনো ব্যক্তিগত সংগ্রহে, নাকি শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবন, ভারতীয় জাদুঘর বা জাতীয় গ্রন্থাগারে হওয়া উচিত? শুধু অর্থের জোরে এমন জাতীয় সম্পদ কি বেসরকারি মালিকানায় চলে যাবে? এই প্রশ্ন নতুন নয়। উত্তরও জানা। রবীন্দ্রনাথের নোবেল চুরি কিংবা জালচিত্র প্রকাশের কলঙ্কিত ইতিহাসের পুনরাবৃত্তিই যেন এই নিলাম। এবং বাঙালির উদাসীনতা তার চেয়েও বড় অভিশাপ। আমরা যারা রবীন্দ্রনাথকে ভালোবাসি—তাঁর গান গাই, কবিতা উদ্ধৃত করি, মূর্তি পুজি—তাঁর সৃষ্টির অন্তর্নিহিত যন্ত্রণাকে, প্রজ্ঞাকে, এবং সেই নির্মমতম ‘প্রেমহীন’ প্রাপ্তির ব্যথাকে কি সত্যিই বুঝতে চেয়েছি? ‘পাষাণহৃদয়’ হয়তো আগামিকাল কারও ব্যক্তিগত সংগ্রহে যাবে। হয়তো কোনো সংগ্রাহক, শিল্প-সংস্থার লকারে ঠাঁই পাবে। হয়তো সর্বসাধারণের কাছ থেকে আর গোপনই থেকে যাবে চিরকাল।
দুর্মূল্য ভাস্কর্যের সাথে নিলামে থাকবে রবীন্দ্রনাথের লেখা ৩৫টি বিরল চিঠিও, যেগুলি কবি ১৯২৭-৩৬ সালে সমাজতত্ত্ববিদ ধূর্জটি প্রসাদ মুখোপাধ্যায়কে লিখেছেন—শুধু সাহিত্যিক কথোপকথন নয়, এরা চিন্তাজগতের মানচিত্র। কখনো পদ্মার বোটে, কখনো গ্লেন ইডেন বা শান্তিনিকেতনে বসে লেখা এই চিঠিগুলি বাংলা সাহিত্যের দৃষ্টিভঙ্গি, সংগীতের শৃঙ্খলা, সংস্কৃতির বিবর্তন ও রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিগত মতপ্রকাশের অমূল্য দলিল। বিশিষ্ট রবীন্দ্রগবেষক অভ্র ঘোষ এই চিঠিগুলিকে ‘ঐতিহাসিক নথি’ আখ্যা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, ‘এই নথিগুলি শান্তিনিকেতনে সংরক্ষিত হওয়াই যথাযথ’।
❤ Support Us






