- দে । শ
- অক্টোবর ১২, ২০২৬
বিরোধীদের ‘সুপ্রিম কোর্ট চলো’-র মিছিল আটকাল পুলিশ, শীর্ষ আদালতে মামলা রাহুলের
ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’ ঘিরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিরোধীদের ক্ষোভ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে। ভোটার তালিকা থেকে বিপুল সংখ্যক নাম বাদ দেওয়া, সংশোধন প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে এ বার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপের দাবিও জানানো হয়েছে। সোমবার দিল্লিতে সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মিছিল ঘিরে উত্তেজনা ছড়ায়। রাহুলের নেতৃত্বে সে মিছিলে শামিল হন কংগ্রেস সাংসদ প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়্গে, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী প্রসাদ যাদব-সহ বিরোধী শিবিরের একাধিক নেতা। ছিলেন ‘অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন’ (আইসা)-এর সভাপতি নেহা বোরাও। সুপ্রিম কোর্টের উদ্দেশে বিরোধীদের মিছিল ভগবান দাস মার্গের কাছে আটকে দেয় পুলিশ। রাস্তার উপর মানবশৃঙ্খল গড়ে দাঁড়িয়ে পড়েন আধাসেনার জওয়ানেরা। ফলে শীর্ষ আদালতের দিকে এগোতে পারেননি বিরোধী নেতারা।
বিরোধীদের অভিযোগ, ‘এসআইআর’-এর নামে ভোটারদের অধিকার খর্ব করা হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে তারা। এই পরিস্থিতিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ, ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া বন্ধ করা এবং ভোটার তালিকা সংশোধনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি তুলেছে ‘ইন্ডিয়া’ জোট। অন্যদিকে, বিরোধীদের আন্দোলনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে আক্রমণ করেছে বিজেপি। সুপ্রিম কোর্টে আবেদন জানানোর সিদ্ধান্তের আগে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন রাহুল ও খাড়্গে। শনিবার তাঁরা প্রধান বিচারপতির কাছে সময় চেয়ে চিঠি পাঠান। সোমবার বিকেল ৪টে থেকে ৫টার মধ্যে দেখা করে একটি স্মারকলিপি জমা দেওয়ার ইচ্ছা ছিল তাঁদের। সেই স্মারকলিপিতে ‘ভোট চুরি’ বন্ধ করা, ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়া থামানো এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি জানানোর কথা ছিল। দিল্লিতে আন্দোলনকারীদের আটক করা, মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা এবং ট্রেন চলাচল ব্যাহত হওয়ার অভিযোগও স্মারকলিপিতে তোলার কথা জানিয়েছিলেন বিরোধী নেতারা।
কিন্তু রবিবার রাতেই সে আবেদন খারিজ করে দেয় প্রধান বিচারপতির দফতর। জানানো হয়, ‘এসআইআর’-সংক্রান্ত বিষয় ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন। প্রধান বিচারপতি নিজেই সংশ্লিষ্ট মামলার শুনানিতে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এ অবস্থায় প্রশাসনিক স্তরে বৈঠক করে বিচারাধীন বিষয় নিয়ে আলোচনা করা বিচারবিভাগীয় শিষ্টাচার এবং ক্ষমতার পৃথকীকরণের সাংবিধানিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রধান বিচারপতির দফতরের বক্তব্য, বিরোধী নেতারা যদি এ বিষয়ে আদালতের হস্তক্ষেপ চান, তবে তাঁদের যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায় আবেদন জানাতে হবে। মৌলিক অধিকার রক্ষার প্রশ্নে সুপ্রিম কোর্টের দ্বার সকলের জন্য খোলা রয়েছে। আদালতের বিচারবিভাগীয় ক্ষমতা প্রয়োগের জন্য আবেদন জানানো হলে তা আইন অনুযায়ী বিবেচনা করা হবে।
প্রধান বিচারপতি জানান, আগের দিনই বৈঠকের অনুরোধ পেয়েছিলেন তিনি। রাতেই কেন বৈঠক করা সম্ভব নয়, তা জানিয়ে উত্তর পাঠানো হয়েছে।রাহুল ও খাড়্গেকে পাঠানো চিঠিতে সূর্য কান্ত লিখেছেন, সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলি ইতিমধ্যেই সুপ্রিম কোর্টের বিচারাধীন। তাই মামলা নিয়ে বৈঠক করা সংবিধানের মৌলিক কাঠামোর অন্তর্গত ক্ষমতার পৃথকীকরণের নীতির পরিপন্থী হবে। তা প্রতিষ্ঠিত বিচারবিভাগীয় নীতি ও শিষ্টাচারের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। প্রধান বিচারপতি আরও স্পষ্ট করেছেন, বিরোধী নেতাদের চিঠিতে উত্থাপিত অভিযোগগুলির নিষ্পত্তি করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। তবে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ক্ষুণ্ণ হওয়ার অভিযোগ উঠলে বিচারবিভাগীয় প্রক্রিয়ায় তা বিবেচনা করা আদালতের কর্তব্য। সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের উল্লেখ করে তিনি জানান, মৌলিক অধিকার রক্ষার জন্য দেশের প্রত্যেক নাগরিক সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হতে পারেন। প্রধান বিচারপতির এই অবস্থানের পরেই শীর্ষ আদালতে আনুষ্ঠানিক ভাবে আবেদন জানানোর পথে এগোয় বিরোধী শিবির।
সোমবার ‘সুপ্রিম কোর্ট চলো’-র মিছিল মিছিল শুরুর আগে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে রাহুল বলেন, ‘এখানে আলাদা আলাদা কোননো আন্দোলন হচ্ছে না। একটাই আন্দোলন — জ্ঞানেশ কুমারকে সরাতে হবে। তার পরে প্রধানমন্ত্রী ও অমিত শাহের বিরুদ্ধেও আমাদের লড়াই চলবে। আমরা থামব না।’ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত ডোভালের চাপে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার কাজ করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিরোধীদের দাবি, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষা করা জরুরি। রাহুলের বক্তব্য, আন্দোলনে যোগ দেওয়া তরুণেরা শান্তিপূর্ণ ভাবে নিজেদের দাবি জানাতে পথে নেমেছিলেন। তাঁদের মনে ঘৃণা নয়, ভালবাসা ছিল। অথচ পুলিশের পাশাপাশি বিজেপির কর্মীদের হাতেও তাঁরা আক্রান্ত হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। রাহুলের কথায়, ‘আমরা এমন ভারত চাই না।’
এদিন ‘ইন্ডিয়া’ জোটের মিছিল ঘিরে মধ্য দিল্লির বিস্তীর্ণ এলাকায় কড়া নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়। সুপ্রিম কোর্টের দিকে এগোনোর পথে ভগবান দাস রোডের কাছে মিছিল আটকে দেয় পুলিশ। ওই রাস্তার শেষ প্রান্তে আদালতের দিকে যাওয়ার পথে ব্যারিকেড বসানো হয়েছিল। ফলে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের টানাপড়েন তৈরি হয়। রাহুল ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর সঙ্গে মিছিলে ছিলেন কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি বেণুগোপাল, কর্নাটকের মুখ্যমন্ত্রী ডি কে শিবকুমার, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব এবং আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব। ছিলেন আইসা সভাপতি নেহা বোরাও। মিছিলকারীদের হাতে ছিল জাতীয় পতাকা ও বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্ল্যাকার্ড। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে স্লোগানও দেন তাঁরা। বিপুল সংখ্যক মানুষের জমায়েত আর পুলিশের ব্যারিকেডের কারণে বারাখাম্বা রোড ও মান্ডি হাউস-সহ মধ্য দিল্লির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ রাস্তায় যান চলাচল ব্যাহত হয়। নিরাপত্তার কারণে এলাকায় পুলিশ, কেন্দ্রীয় রিজ়ার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ) এবং র্যাপিড অ্যাকশন ফোর্সের (আরএএফ) কর্মীদের মোতায়েন করা হয়েছিল। দিল্লি পুলিশ ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার ১৬৩ ধারা অনুযায়ী নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল বলে জানা গিয়েছে। জমায়েত নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে কয়েকটি মেট্রো স্টেশনের প্রবেশ ও প্রস্থান পথ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়। ইন্টারনেট পরিষেবা নিয়েও বিধিনিষেধের অভিযোগ ওঠছে।
অন্যদিকে, রাহুল গান্ধীর আইনজীবীদের একটি দল সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রিতে পৌঁছে রিট পিটিশন দাখিলের জন্য অতিরিক্ত সময় চান। দিল্লিতে বিক্ষোভের পরিস্থিতি এবং নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে আদালতে আবেদন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছিল। সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রিতে আবেদন জমা দেওয়ার নির্ধারিত সময় ছিল বিকেল ৪টে ৩০ মিনিট পর্যন্ত। সে সময়সীমার পরে আবেদন জমা দেওয়ার অনুমতি চেয়েছিলেন আইনজীবীরা। যদিও সুপ্রিম কোর্টের ই-ফাইলিং ব্যবস্থার মাধ্যমে যে কোনও সময় আবেদন জমা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বিরোধী জোটের মিছিল ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিয়ে কংগ্রেসকে আক্রমণ করেছেন কেন্দ্রীয় সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু। তাঁর বক্তব্য, কংগ্রেস এখন দিশাহীন। তবে প্রতিবাদ করা প্রত্যেক নাগরিকের অধিকার বলেও স্বীকার করেছেন তিনি। সোমবার সমাজমাধ্যমে রিজিজু লেখেন, সাংবিধানিক কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে ও নির্লজ্জ ভাবে আক্রমণ করা নিন্দনীয়। অন্যদিকে, কংগ্রেসের অভিযোগ, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের নেতৃত্বাধীন কেন্দ্রীয় সরকার কার্যত অঘোষিত জরুরি অবস্থার পরিস্থিতি তৈরি করেছে। মল্লিকার্জুন খাড়্গের দাবি, গণতন্ত্র ও ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে পথে নামা তরুণদের ভয় পাচ্ছে কেন্দ্র। কংগ্রেসের বক্তব্য, সংবিধান এবং নাগরিকদের ভোটাধিকার রক্ষার লড়াই চলবে। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের প্রেক্ষিতে কমিশনের জবাবদিহি নিশ্চিত করা, ‘এসআইআর’ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করার দাবি জানিয়েছে বিরোধী জোট।
❤ Support Us






