- এই মুহূর্তে দে । শ
- অক্টোবর ৩, ২০২৬
সত্য প্রতিষ্ঠায় দেশ জুড়ে চলছে আন্দোলন, ডিজিটাল ‘সত্যাগ্রহ’-র ঘোষণা রাহুল গান্ধীর
দেশের নানা প্রান্তে বিচ্ছিন্ন ভাবে চলতে থাকা প্রতিবাদ ও আন্দোলনকে একটি অভিন্ন মঞ্চে নিয়ে আসার উদ্যোগ নিলেন লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী। শনিবার ‘সত্যাগ্রহ’ নামে একটি নতুন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের উদ্বোধন করলেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের অধিকার ও বিভিন্ন অন্যায়ের বিরুদ্ধে মানুষ যে লড়াই করছেন, সে লড়াইগুলির তথ্য এক জায়গায় সংকলিত করা দরকার। সে উদ্দেশ্যেই তৈরি হয়েছে এই ওয়েবসাইট। কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন নিজেদের আন্দোলনের কথা জানাতে পারবেন এই প্ল্যাটফর্মে। প্রয়োজনে তাঁরা সাহায্যের আবেদনও জানাতে পারবেন।
ওয়েবসাইটের নামের নিচে লেখা হয়েছে— ‘সংঘর্ষ জোড়ো, ভারত জোড়ো’। রাহুলের বক্তব্য, ছাত্রছাত্রী, তরুণ প্রজন্ম, কৃষক, আদিবাসী, দলিত এবং মহিলাদের নিজেদের নিজেদের সমস্যা ও দাবিকে কেন্দ্র করে আলাদা আলাদা আন্দোলন রয়েছে। কিন্তু অনেক সময় সেই আন্দোলনগুলি বিচ্ছিন্ন থেকে যায়। একা ওঠা কণ্ঠস্বরকে দমন করা তুলনায় সহজ। তাই দেশের বিভিন্ন প্রান্তের সেসব প্রতিবাদী কণ্ঠস্বরগুলিকে একটি ডিজিটাল মানচিত্রে একত্রিত করতে চান তিনি। মহাত্মা গান্ধীর ১৫৭তম জন্মবার্ষিকীর ঠিক পরেই ‘সত্যাগ্রহ’ ওয়েবসাইটের উদ্বোধন তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করা হচ্ছে। উদ্বোধনের সঙ্গে প্রকাশিত ভিডিয়ো-বার্তায় মহাত্মা গান্ধীর শিক্ষার কথা স্মরণ করেছেন রাহুল। তিনি বলেন, ‘বাপু আমাদের শিখিয়েছিলেন যে, সত্যই আমাদের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। কিন্তু আরও বড়ো অস্ত্র হল সত্যের পাশে একসঙ্গে দাঁড়ানো। আপনিও যদি কোনও অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করে থাকেন, আপনার গল্প শেয়ার করুন। এতে মাত্র দু-মিনিট সময় লাগবে।’
রাহুলের অভিযোগ, দেশে সত্যকে দমন করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন প্রান্তে নিজেদের অধিকার এবং বিভিন্ন দাবির পক্ষে মানুষ আন্দোলনে নামছেন। কিন্তু সেসব আন্দোলনগুলির মধ্যে সব সময় যোগাযোগ বা সমন্বয় থাকে না। ‘সত্যাগ্রহ’-এর মাধ্যমে সেই ব্যবধান কমানোর চেষ্টা করা হবে। ‘সত্যাগ্রহ’ ওয়েবসাইটে গিয়ে যে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন নিজেদের আন্দোলনের তথ্য নথিভুক্ত করতে পারবেন। নিজের নাম, সংগঠনের নাম এবং কী নিয়ে আন্দোলন চলছে, সে সংক্রান্ত তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো আন্দোলন ছোটো না বড়োড, তার ভিত্তিতে এই প্ল্যাটফর্মে জায়গা পাওয়ার ক্ষেত্রে কোনো আলাদা মাপকাঠির কথা জানাননি রাহুল। তাঁর আহ্বান, যে কোনো ধরনের প্রতিবাদের কথা সেখানে জানানো হোক। শুধু আন্দোলনের অস্তিত্বের কথা জানানো নয়, প্রয়োজনে সাহায্য চাওয়ার ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে এই প্ল্যাটফর্মে। কোনো আন্দোলনকারী যদি মনে করেন যে তাঁদের বাইরের সহায়তা প্রয়োজন, সেটিও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে জানাতে পারবেন। রাহুল জানিয়েছেন, সে তথ্য দেখে প্রয়োজন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হবে।
ভিডিয়ো-বার্তায় রাহুল বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ নিজেদের অধিকারের জন্য এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াই করছেন। কেউ ছাত্রছাত্রীদের কথা বলছেন, কেউ মহিলাদের কথা বলছেন, কেউ মূল্যবৃদ্ধির প্রতিবাদ করছেন। আমি বিরোধী দলনেতা হিসেবে চেয়েছি, আন্দোলন সংক্রান্ত সব তথ্য এক জায়গায় সংকলিত রাখতে। সে কারণেই ‘সত্যাগ্রহ’ ওয়েবসাইট খুলেছি আপনাদের জন্য।’ রাহুলের বক্তব্যে উঠে এসেছে জমি সংক্রান্ত সমস্যা, মহিলাদের অধিকার, দলিত ও ওবিসি অধিকার, শিক্ষা এবং পরীক্ষা সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিবাদের প্রসঙ্গও। তাঁর দাবি, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নানা বিষয়ে অসংখ্য আন্দোলন চলছে। কিন্তু সেই আন্দোলনগুলির খবর অনেক সময় স্থানীয় পরিসরের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়। একটি সাধারণ ডিজিটাল মানচিত্রে সেই তথ্য তুলে ধরলে একই ধরনের দাবিতে আন্দোলনরত মানুষ একে অপরের কথা জানতে পারবেন।
নতুন ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে নিজেদের আন্দোলনের কথা জানানোর জন্য সরাসরি আবেদন করেছেন রাহুল। তিনি বলেন, ‘যে আন্দোলনই হোক, ছোটো বা বড়ো আন্দোলন, আপনাদের নাম ও সংগঠনের নাম লিখে জমা দিন। কী নিয়ে আন্দোলন করছেন জানান। আমরা যদি আপনাদের সাহায্য করতে পারি, যদি আপনারা আমাদের সাহায্য চান, লিখুন। আপনাদের সাহায্য করতে পারলে আমরা খুশি হব।’ অর্থাৎ, ‘সত্যাগ্রহ’-এর মাধ্যমে একদিকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে চলা প্রতিবাদগুলির একটি তথ্যভান্ডার তৈরি করার চেষ্টা হচ্ছে, অন্যদিকে সেই আন্দোলনগুলির মধ্যে যোগাযোগের একটি পরিকাঠামোও গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে। রাহুলের বক্তব্যে বার বার উঠে এসেছে ‘একা লড়াই’ করার প্রসঙ্গ। এক্স-এ দেওয়া পোস্টে তিনি লেখেন, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষ নিজেদের অধিকারের জন্য লড়ছেন, কিন্তু অনেক সময় তাঁরা একাই লড়ছেন। জেন জি, পড়ুয়া, কৃষক, আদিবাসী, দলিত, মহিলা — প্রতিটি লড়াইয়ের নিজস্ব গল্প রয়েছে। কিন্তু একা ওঠা কণ্ঠস্বরকে অনেক সময় সহজেই স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। সে কারণেই তাঁর দাবি, ‘সত্যাগ্রহ’ ওই কণ্ঠস্বরগুলিকে এক মানচিত্রে একত্রিত করবে। নিজের প্রতিবাদের কথা জানালে তা ‘সত্যাগ্রহ’ মানচিত্রে দেখা যাবে। একই ধরনের সমস্যার বিরুদ্ধে অন্য কোথাও কেউ আন্দোলন করছেন কি না, তা-ও জানা যাবে।
‘সত্যাগ্রহ’ চালুর সঙ্গে নিজের রাজনৈতিক ভূমিকার কথাও স্পষ্ট করেছেন রাহুল। তাঁর বক্তব্য, লোকসভার বিরোধী দলনেতা হিসেবে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের দাবি ও সমস্যার কথা সংসদে তুলে ধরা তাঁর দায়িত্বের মধ্যে পড়ে। প্রয়োজনে চিঠি লিখে অথবা সরাসরি আন্দোলনের ময়দানে গিয়ে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর কথাও বলেছেন তিনি। এক্স-এ রাহুল লেখেন, ‘আপনার গল্প এই মানচিত্রে জায়গা পাবে। আপনার মতো আর কে লড়াই করছেন, তা দেখতে পাবেন। আর আমি যা কিছু করতে পারি, তা করব — সংসদে, রাস্তায়, চিঠি লিখে, যেখানেই আমার প্রয়োজন হবে, আপনাদের পাশে দাঁড়াব। বিরোধী দলনেতা হিসেবে এটাই আমার দায়িত্ব।’ ভিডিয়ো-বার্তাতেও একই সুরে তিনি বলেন, ‘যেখানে সত্যকে পিষে ফেলা হচ্ছে সেখানে মানুষকে প্রতিরোধ করতে সাহায্য করা বিরোধী দলনেতা হিসেবে আমার কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।’ রাহুলের মতে, সত্য কেবল দেশের সর্বোচ্চ রাজনৈতিক স্তরে গুরুত্বপূর্ণ নয়। দেশের প্রত্যন্ত প্রান্তে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যদি অন্যায়ের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকারের জন্য লড়াই করে, সে লড়াইয়েও সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো জরুরি। জমি, মহিলা অধিকার, দলিত অধিকার, ওবিসি অধিকার, শিক্ষা এবং পরীক্ষা-সহ বিভিন্ন ইস্যুতে যে আন্দোলনগুলি হচ্ছে, সেগুলিকে সংগঠিত করে একটি মানচিত্রে তুলে ধরার কথা জানিয়েছেন তিনি।
রাহুলের প্রকাশিত ভিডিয়োয় যে বিষয়গুলির উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে ছাত্রছাত্রীদের সমস্যা, নারী নিরাপত্তা, কৃষকদের দাবি এবং মূল্যবৃদ্ধি অন্যতম। তাঁর বক্তব্য, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আলাদা আলাদা বিষয়কে কেন্দ্র করে মানুষ প্রতিবাদ করছেন। কারও দাবি শিক্ষা নিয়ে, কেউ মহিলাদের নিরাপত্তা বা অধিকারের প্রশ্ন তুলছেন, আবার কেউ মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে সরব হচ্ছেন। এই বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদগুলিকে একটি জায়গায় এনে তাদের মধ্যে যোগসূত্র তৈরি করাই ‘সত্যাগ্রহ’-এর অন্যতম উদ্দেশ্য বলে জানিয়েছেন তিনি। রাহুল বলেন, ‘প্রতিবাদগুলি দেশের প্রতিটি প্রান্তে হচ্ছে। কেউ পড়ুয়াদের বিষয়ে কথা বলছেন, কেউ মহিলাদের নিয়ে, কেউ মূল্যবৃদ্ধির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করছেন। লক্ষ লক্ষ আলাদা প্রতিবাদ চলছে।’ তাঁর মতে, কোনও আন্দোলন জাতীয় স্তরে পরিচিত না হলেও তার গুরুত্ব কম নয়। তাই ছোট-বড় নির্বিশেষে সমস্ত আন্দোলনের তথ্য এই প্ল্যাটফর্মে নথিভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এ উদ্যোগের ঘোষণা এমন এক সময়ে করা হল, যখন মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের ইস্তফার দাবিতে পড়ুয়া, নাগরিক সমাজ এবং রাজনৈতিক দলগুলির একাংশের মধ্যে আন্দোলন দেখা যাচ্ছে। নির্বাচন প্রক্রিয়া এবং কমিশনের ভূমিকা নিয়ে বিরোধীদের একাংশের আপত্তিও প্রকাশ্যে এসেছে। যদিও ‘সত্যাগ্রহ’ ওয়েবসাইটের ঘোষণায় কোনও একটি নির্দিষ্ট আন্দোলনকে কেন্দ্র করে উদ্যোগটির কথা বলা হয়নি, বরং বিভিন্ন বিষয় ও দাবিকে কেন্দ্র করে চলা আন্দোলনগুলিকে একত্রিত করার কথা বলেছেন রাহুল। নাম থেকেই স্পষ্ট, ‘সত্যাগ্রহ’ উদ্যোগটির সঙ্গে মহাত্মা গান্ধীর রাজনৈতিক দর্শনের একটি সরাসরি যোগ তৈরি করতে চাইছেন রাহুল। গান্ধীর সত্য ও অহিংস প্রতিরোধের ধারণাকে স্মরণ করে তিনি বলেছেন, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানো এক জনের কাজ নয়; সেই সত্যের পাশে সম্মিলিত ভাবে দাঁড়ানোই আরও বড়ো শক্তি। রাহুলের বক্তব্য অনুযায়ী, বিরোধী দলনেতা হিসেবে তাঁর দায়িত্ব শুধু সংসদের ভিতরে সরকারের সমালোচনা করা নয়, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে মানুষের যে সমস্যাগুলি রয়েছে, সেগুলির কথাও শোনা। ‘সত্যাগ্রহ’ সেই যোগাযোগের একটি ডিজিটাল মাধ্যম হিসাবে কাজ করতে পারে বলেই তাঁর মত।
❤ Support Us







