Advertisement
  • দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
  • জুন ৮, ২০২৬

দিল্লিতে ভাঙন তৃণমূলে ! রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা সুখেন্দুশেখর রায়ের, বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে ছাড়লেন দলও

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
দিল্লিতে ভাঙন তৃণমূলে ! রাজ্যসভার সাংসদ পদ থেকে ইস্তফা সুখেন্দুশেখর রায়ের, বিস্ফোরক অভিযোগ তুলে ছাড়লেন দলও

রাজ্যে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার ধাক্কা সামাল দিতে পারেনি তৃণমূল। তার মধ্যেই দিল্লিতে দলের অন্দরে বড়োসড়ো ধাক্কা। রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দিলেন প্রবীণ নেতা সুখেন্দুশেখর রায়। একই সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গেও সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার ঘোষণা করেছেন তিনি। সোমবার সকালে নয়াদিল্লিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান ‘প্রাক্তন’ সাংসদ। দলত্যাগের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে শিক্ষা থেকে স্বাস্থ্য, প্রশাসন থেকে আইনশৃঙ্খলা— একাধিক ক্ষেত্রে দুর্নীতি ও ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন তিনি। আরজি কর-কাণ্ডের প্রসঙ্গ টেনে দলীয় নেতৃত্বের বিরুদ্ধেও সরব হন।

সোমবার সকালে, দিল্লিতে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সুখেন্দুশেখর জানান, উপরাষ্ট্রপতির কাছে ব্যক্তিগত ভাবে গিয়ে তিনি তাঁর পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন। একই সঙ্গে তৃণমূল নেত্রীকে দলত্যাগের চিঠিও পাঠিয়েছেন। তাঁর দাবি, এ সিদ্ধান্ত কোনো আকস্মিক আবেগের ফল নয়। দীর্ঘ দিন ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক হতাশা, নৈতিক আপত্তি এবং দলের বর্তমান চরিত্র সম্পর্কে গভীর উদ্বেগ থেকেই তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ঘটনাচক্রে, যে দিন দিল্লিতে বিজেপি-বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’র গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক বসেছে, বৈঠকে যোগ দিয়েছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, সে দিনই দলের অন্যতম প্রবীণ সাংসদের বিদায় রাজনৈতিক ভাবে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল। বৈঠক শুরু হওয়ার আগেই তৃণমূল শিবিরে যে অস্বস্তির আবহ তৈরি হল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই বলে মত রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের।

পদত্যাগের পর প্রকাশিত লিখিত বিবৃতিতে সুখেন্দুশেখর দাবি করেছেন, গত পনেরো বছরে রাজ্যে এমন এক শাসনব্যবস্থা গড়ে উঠেছিল যেখানে দুর্নীতি ক্রমশ প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প, কর্মসংস্থান, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা— প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই ব্যর্থতার চিহ্ন স্পষ্ট ছিল বলে তাঁর অভিযোগ। সাধারণ মানুষের মধ্যে তৃণমূলের প্রতি ক্ষোভ ও অনাস্থা যে ক্রমাগত বাড়ছিল, তা নেতৃত্ব বুঝতে পারেনি বলেও দাবি করেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, মানুষের ক্ষোভ এতটাই গভীর হয়েছিল যে শেষ পর্যন্ত ভোটবাক্সে তার প্রতিফলন ঘটেছে। বাংলার মানুষ তাঁদের রায়ের মাধ্যমে শাসক দলের বিরুদ্ধে অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কিন্তু নির্বাচনী বিপর্যয়ের পরেও দলের অন্দরে আত্মসমালোচনার কোনও পরিবেশ তৈরি হয়নি। কেন মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিলেন, কোথায় ভুল হল, কোন নীতিগত বিচ্যুতি দলকে এই অবস্থায় এনে দাঁড় করাল; সে বিষয়ে নেতৃত্বরা কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলেই অভিযোগ তাঁর।

সাংবাদিকদের সামনে সুখেন্দুশেখর বলেন, ‘মানুষ সরকারের প্রতি অনাস্থা জানিয়েছে। যখন মানুষ অনাস্থা জানায়, তখন বুঝতে হবে দল জনমন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছে। কিন্তু সেই বার্তা গ্রহণ করার কোনও চেষ্টা আমি দেখিনি।’ দলের বর্তমান নেতৃত্বকে সরাসরি নিশানা করে তাঁর আরও মন্তব্য, ‘যখন কোনও প্রশাসক বা শাসক মানুষের ভাষা বুঝতে অক্ষম হয়ে পড়ে, তখন তার পতন অনিবার্য। রাজনীতিতে এর কোনও ব্যতিক্রম নেই।’ আরজি কর মেডিক্যাল কলেজে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাকে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান বদলের অন্যতম মোড়বদল বলে উল্লেখ করেছেন সুখেন্দুশেখর। তাঁর দাবি, ওই ঘটনার পর থেকেই তিনি তৃণমূল ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিলেন। তবে পরিস্থিতির দিকে নজর রেখে সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলেন। তাঁর দাবি, ‘আরজি কর নিয়ে আমি প্রকাশ্যে মুখ খুলেছিলাম। ধর্নায় বসেছিলাম। আমার অপরাধ ছিল, আমি বলেছিলাম পুলিশ আধিকারিকদের ভূমিকাও তদন্ত করে দেখা হোক। আজও মনে করি, প্রমাণ নষ্ট হওয়ার ঘটনায় কিছু আধিকারিকের ভূমিকা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন ছিল।’’

সুখেন্দুশেখরের অভিযোগ তুলেছেন, ওই ঘটনার পর প্রকৃত দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বদলে তাঁদের রক্ষা করার প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। সে পরিস্থিতি তাঁর কাছে অত্যন্ত উদ্বেগজনক মনে হয়েছিল। তিনি বলেন, ‘আমি তখনই বুঝেছিলাম, এই পথে আর চলতে পারব না। শুধু সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলাম।’ আরজি কর-কাণ্ডের পরে যে অভূতপূর্ব গণআন্দোলন তৈরি হয়েছিল, সেটিকেও তিনি রাজনৈতিক বার্তা হিসেবে দেখেছিলেন। তাঁর দাবি, ২০২৪ সালের নির্বাচনে সাফল্যের মাত্র কয়েক মাস পরেই লক্ষ লক্ষ মানুষ রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ করেছিলেন। ওই জনরোষই ছিল আসন্ন রাজনৈতিক বিপর্যয়ের পূর্বাভাস।

দলের ভিতরে নিজের অবস্থান নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুখেন্দুশেখর। তাঁর দাবি, দীর্ঘ দিন ধরেই তাঁকে পরিকল্পিত ভাবে কোণঠাসা করে রাখা হয়েছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মতামত চাওয়া হত না। বিভিন্ন কমিটি থাকলেও তাদের কার্যকর ভূমিকা ছিল না। দলের সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া ক্রমশ কয়েক জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছিল। তাঁর অভিযোগ, ‘দলে যোগ্য মানুষের অভাব ছিল না। এখনো নেই। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি বোঝেন এমন অনেক নেতাকেই সরিয়ে রাখা হয়েছিল। যাঁরা নেতৃত্বের চারপাশে ঘুরতেন, তাঁদেরই গুরুত্ব বাড়ছিল।’ এ দিন দুর্নীতির প্রশ্নে আরও সরব হন সুখেন্দুশেখর। তাঁর মতে, তৃণমূল ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতির বীজ বপন হয়েছিল। ২০১১ সালের পর ডেলো পাহাড়ে এক চিটফান্ড কর্ণধারের সঙ্গে বিতর্কিত বৈঠকের প্রসঙ্গও টেনে আনেন তিনি। পাশাপাশি মুখ্যমন্ত্রীর আঁকা ছবি উচ্চ মূল্যে বিক্রির ঘটনাও উল্লেখ করেন। সুখেন্দুশেখরের বিষ্ফোরক দাবি, ‘মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছবি ১০-১৫ লক্ষ টাকায় বিক্রি হয়েছে। তাঁকে কেউ কেউ লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির সঙ্গেও তুলনা করেছিলেন। সে ছবি কিনেছেন চিটফান্ড সংস্থার মালিকেরা। ফলে প্রশ্ন তো উঠবেই।’

তাঁর অভিযোগ, তৃণমূলের মূল রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিল বামফ্রন্টকে ক্ষমতা থেকে সরানো। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পরে আদর্শের পরিবর্তে ক্ষমতা ও সম্পদকেন্দ্রিক রাজনীতি ক্রমশ প্রাধান্য পেতে শুরু করে। প্রথম দিকে বিষয়টি সাধারণ মানুষ বা দলের অনেকেই বুঝতে পারেননি। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই দুর্নীতি সাংগঠনিক এবং প্রশাসনিক কাঠামোর ভিতরে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নেয়। জাতীয় স্তরের তৃণমূল নেতাদের সম্পত্তির উৎস নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তিনি। তাঁর বক্তব্য, ‘সব জাতীয় নেতার সম্পত্তির হিসাব খতিয়ে দেখা উচিত। আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ অডিট হওয়া প্রয়োজন।’ একই সঙ্গে হাসপাতাল-সহ বিভিন্ন সরকারি ক্ষেত্রের ফরেন্সিক অডিটের দাবিও জানিয়েছেন তিনি।

পদত্যাগের পরে তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেবেন কি না, সে প্রশ্নও উঠেছে। যদিও এ দিন সে বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেননি সুখেন্দুশেখর। তিনি জানান, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি বিচার করে সিদ্ধান্ত নেবেন। এ দিকে তাঁর পদত্যাগের পর তৃণমূলের সংসদীয় দল নিয়েও জল্পনা তীব্র হয়েছে। রাজনৈতিক মহলের একাংশের ধারণা, বিধানসভার পরে সংসদীয় দলেও মতভেদ প্রকাশ্যে আসতে পারে। ইতিমধ্যেই কয়েক জন অসন্তুষ্ট সাংসদ দিল্লিতে পৌঁছেছেন বলে রাজনৈতিক সূত্রের দাবি। যদিও প্রকাশ্যে কেউ এখনো দলবিরোধী মন্তব্য করেননি। এমনকি রাজ্যসভার সাংসদ কোয়েল মল্লিকের নাম নিয়েও রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন শুরু হয়েছে। তিনি ভবিষ্যতে কী অবস্থান নেবেন, তা নিয়ে জল্পনা থাকলেও এ পর্যন্ত কোনও আনুষ্ঠানিক ঘোষণা করেননি।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!