- দে । শ প্রচ্ছদ রচনা
- মার্চ ১১, ২০২৬
তুমুল হট্টগোলের মধ্যে স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা খারিজ লোকসভায়, ধ্বনিভোটে পরাজয় বিরোধীদের
তীব্র বাকযুদ্ধ, স্লোগান আর উত্তপ্ত বিতর্কের আবহে শেষ পর্যন্ত লোকসভায় স্পিকার ওম বিড়লাকে অপসারণের দাবিতে বিরোধীদের আনা অনাস্থা প্রস্তাব খারিজ হয়ে গেল। বুধবার দীর্ঘ আলোচনার পর ধ্বনিভোটে প্রস্তাবটি নাকচ হয়ে যায়। ভোটের আগে ও পরে সংসদে একাধিকবার উত্তেজনা ছড়ালেও শেষ পর্যন্ত সংখ্যার জোরে সরকারপক্ষের অবস্থানই প্রাধান্য পেল। অধিবেশন শেষে দিনের জন্য সভা মুলতবি করা হয়।
স্পিকারের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের অভিযোগ তুলে গত ১০ ফেব্রুয়ারি অনাস্থা নোটিস জমা দিয়েছিল বিরোধী দলগুলি। সেই নোটিস গৃহীত হওয়ার পর সংসদীয় রীতি মেনে গত কয়েক দিন অধিবেশন পরিচালনা থেকে বিরত ছিলেন স্পিকার ওম বিড়লা। বুধবার লোকসভার কার্যক্রম পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন উত্তরপ্রদেশের বিজেপি সাংসদ জগদম্বিকা পাল। বিতর্কের শেষে বিরোধীরা ভোটাভুটির দাবি তুললেও তা খারিজ করে তিনি ধ্বনিভোটে সিদ্ধান্ত নেওয়ার নির্দেশ দেন। সে মুহূর্তে কিছু সময়ের জন্য উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে লোকসভায়।
বিতর্কে অংশ নিয়ে বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী স্পিকারের আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে বিরোধীদের বক্তব্য রাখার সুযোগ ক্রমশ সীমিত হয়ে পড়ছে। উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘যখনই আমরা দাঁড়িয়ে কথা বলতে যাই, আমাদের থামিয়ে দেওয়া হয়।’ রাহুলের এই মন্তব্যের তীব্র সমালোচনা করেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। তিনি পাল্টা দাবি করেন, বিরোধী দলনেতা সংসদে কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন না—এমন অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই। শাহের বক্তব্য, ‘রাহুল অভিযোগ করেন, তাঁকে নাকি বলতে দেওয়া হয় না। কিন্তু বাস্তবে তিনি বলতেই চান না।’
এর পরেই রাহুলের উপস্থিতি সংক্রান্ত পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সপ্তদশ লোকসভায় রাহুল গান্ধীর উপস্থিতি ছিল মাত্র ৫১ শতাংশ। সেখানে সংসদ সদস্যদের গড় উপস্থিতির হার ছিল ৬৬ শতাংশ। আবার ষোড়শ লোকসভায় তাঁর উপস্থিতি ছিল ৫২ শতাংশ, যেখানে সাংসদদের গড় হাজিরা ছিল প্রায় ৮০ শতাংশ। এই তথ্য তুলে ধরে শাহের দাবি, সংসদে সক্রিয় অংশগ্রহণের প্রশ্নে বিরোধী দলনেতারই দায় বেশি। শাহ আরও বলেন, সংসদের কার্যক্রম কোনো রাজনৈতিক দলের ইচ্ছায় নয়, সংসদীয় বিধি মেনেই পরিচালিত হয়। তাঁর হুঁশিয়ারি, ‘সংসদ চলবে সংসদীয় নিয়মে। কোনো দলের নিয়মে নয়।’ স্পিকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা আনার পদক্ষেপকে তিনি সংসদীয় গণতন্ত্রের মর্যাদার প্রতি প্রশ্ন তোলার সমান বলে উল্লেখ করেন। বিরোধীদের এ উদ্যোগকে তিনি ‘অগণতান্ত্রিক’ এবং ‘অসৎ’ বলেও অভিহিত করেন।
বিতর্ক চলাকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যের কিছু অংশ নিয়ে আপত্তি তোলে বিরোধী শিবির। কংগ্রেস, তৃণমূল কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি এবং ডিএমকে-সহ একাধিক দলের সাংসদ শাহের বক্তব্যের জন্য তাঁর ক্ষমাপ্রার্থনা দাবি করেন। তবে সে দাবি আমল দেননি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বরং, পাল্টা তিনি বলেন, তাঁর বক্তব্যের কোনো অংশ যদি সংসদীয় রীতির পরিপন্থী বলে মনে হয়, তা হলে স্পিকার তা নথি থেকে বাদ দিতে পারেন। বিতর্কের সময় বিরোধী সাংসদেরাও সরকার ও স্পিকারের ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন। তৃণমূল কংগ্রেসের সাংসদ সায়নী ঘোষ অভিযোগ করেন, সংসদের ভিতরে বিরোধীদের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে এবং এর ফলে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ক্রমশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর অভিযোগ, ‘সংসদে এখন প্রায় কোনো গণতন্ত্র অবশিষ্ট নেই। বিরোধী সদস্যদের কণ্ঠরোধ করা হয়েছে। আমরা যদি নিজেদের অধিকার রক্ষার জন্যই লড়াই করতে বাধ্য হই, তা হলে জনগণের হয়ে কী ভাবে লড়ব?’ সরকারপক্ষকে উদ্দেশ করে যাদবপুরের সাংসদ আরও বলেন, সংসদকে যেন কোনো রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে পরিণত না করা হয়। তাঁর মন্তব্য, ‘সংসদকে পার্টি অফিস বানিয়ে ফেলবেন না।’
সায়নী তাঁর বক্তব্যে নাম করে অভিযোগ তোলেন, বিরোধী নেতাদের বক্তব্য রাখতে বাধা দেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, রাহুল গান্ধী, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় বা সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব সংসদে বই উদ্ধৃত করার মতো সাধারণ সুযোগও অনেক সময় পাচ্ছেন না। অথচ সরকারপক্ষের কিছু সাংসদের ক্ষেত্রে সেই নিয়ম প্রয়োগ করা হচ্ছে না বলেও দাবি করেন তিনি। এ অভিযোগের জবাব দিতে গিয়ে শাহ পুনরায় বলেন, সংসদের কাজকর্ম পরিচালিত হয় বিধি ও প্রক্রিয়ার ভিত্তিতে। কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্বের ভিত্তিতে নয়।
উল্লেখ্য, লোকসভায় সংখ্যার অঙ্কে শুরু থেকেই বিরোধীদের অবস্থান দুর্বল ছিল। বিরোধী শিবিরের মোট সাংসদ সংখ্যা প্রায় ২৩৮। তার মধ্যে কংগ্রেসের ৯৯ জন, বাকিরা সমাজবাদী পার্টি, তৃণমূল কংগ্রেস, ডিএমকে-সহ বিভিন্ন দলের। অন্যদিকে সরকারপক্ষের সমর্থনে রয়েছে প্রায় ২৯৩ জন সাংসদ—যার মধ্যে বিজেপির ২৪০, জেডিইউ-র ১৬, টিডিপির ১২ এবং এনডিএ-র অন্যান্য শরিক দল। ফলে অনাস্থা প্রস্তাবের ফলাফল নিয়ে খুব একটা সংশয় ছিল না বলেই সংসদীয় মহলের মত। শেষ পর্যন্ত ধ্বনিভোটে প্রস্তাব খারিজ হয়ে গেলে বিরোধী সদস্যদের একাংশ প্রতিবাদ জানাতে থাকেন। কিছু সময় ধরে স্লোগান চলার পর দিনের জন্য অধিবেশন মুলতবি ঘোষণা করা হয়। সংসদ সূত্রে খবর, পরবর্তী অধিবেশনে স্পিকার ওম বিড়লা সংসদের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি এবং বিরোধী সদস্যদের আচরণ নিয়ে একটি বিবৃতি দিতে পারেন।
❤ Support Us





