- দে । শ
- অক্টোবর ২, ২০২৬
বাম আমলে বিক্ষোভের মুখে ভেস্তে যাওয়া হরিপুরেই ফের পরমাণু প্রকল্প ? ২ লক্ষ কোটি বিনিয়োগের প্রস্তাব রিলায়েন্সের
পূর্ব মেদিনীপুরের হরিপুরে পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র গড়ে তোলার বিরুদ্ধে স্থানীয় মানুষের তীব্র প্রতিরোধ ও দীর্ঘ আন্দোলনের উত্তাল ইতিহাস রয়েছে। ২০০৬ থেকে ২০১১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রামের জমি আন্দোলনের সমসাময়িক সময়েই হরিপুরের আন্দোলন রাজ্য রাজনীতিতে আলোড়ন ফেলেছিল। দীর্ঘ দু-দশক বছর পর, বিজেপি সরকারের আমলে হরিপুরে ফের পরমাণু প্রকল্পের সম্ভাবনা, রিলায়েন্সের তরফে বিপুল বিনিয়োগের প্রস্তাব, স্বাভাবিকভাবেই ইতিহাসের বিতর্কিত অধ্যায়কে সামনে আনছে। আশঙ্কা আর উদ্বেগের সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে জমি অধিগ্রহণ ঘিরে ফের উত্তপ্ত হয়ে উঠবে না তো হরিপুরের মাটি ! তবে, দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, তৎকালীন জমি আন্দোলনের সঙ্গে জূড়ে থাকা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী জমি নিয়ে সংঘাত না চেয়ে, বিকল্প জায়গা খোঁজার চেষ্টা করবেন এ কথা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।
২০০৬ সালে ভারত-আমেরিকা অসামরিক পারমাণবিক চুক্তির প্রেক্ষাপটে কেন্দ্রীয় সংস্থা নিউক্লিয়ার পাওয়ার কর্পোরেশন অফ ইন্ডিয়া লিমিটেড হরিপুরে ১০,০০০ মেগাওয়াট (৬টি ১,৬৫০ মেগাওয়াটের রাশিয়ান ভিভিইআর-১০০০ রিয়্যাক্টর) ক্ষমতার একটি বিশাল পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র বা ‘নিউক্লিয়ার পার্ক’ গড়ার প্রস্তাব দেয়। তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকার এ প্রকল্পে প্রাথমিক সম্মতি দিলে স্থানীয় স্তরে বিক্ষোভ শুরু হয়। স্থানীয় মানুষ ও পরিবেশকর্মীরা মূলত কয়েকটি আশঙ্কার কারণে এ প্রকল্পের বিরুদ্ধে সংঘবদ্ধ হন। প্রথমত, জীবিকা ও উচ্ছেদ: হরিপুর অত্যন্ত উর্বর কৃষিজমি এবং বর্ধিষ্ণু মৎস্যজীবী অঞ্চল। স্থানীয়দের আশঙ্কা ছিল, প্রকল্পের জন্য জমি অধিগ্রহণ করা হলে প্রায় ২৫,০০০ কৃষক ও মৎস্যজীবী সম্পূর্ণ গৃহহীন ও জীবিকাহীন হয়ে পড়বেন। অর্থনৈতিক ক্ষতি: ওই অঞ্চলের সামুদ্রিক মৎস্য চাষ থেকে রাজ্যের মোট মাছ রপ্তানি আয়ের বড়ো অংশ আসে। বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বর্জ্য ও গরম জল সমুদ্রে মিশলে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র ও মৎস্য শিল্প ধ্বংস হবে বলে মৎস্যজীবী সংগঠনগুলি দাবি তোলে। পাশাপাশি ছিল তেজস্ক্রিয়তার আতঙ্ক। ২০১১ সালে জাপানের ফুকুশিমা পরমাণু কেন্দ্রের দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের মনে পারমাণবিক বিকিরণ ও নিরাপত্তার বিষয়টি নিয়ে আতঙ্ক আরও বহুগুণ বেড়ে যায়।
এরপরই, স্থানীয় বাসিন্দা, কৃষক এবং মৎস্যজীবীরা মিলে গড়ে তোলেন প্রতিরোধ কমিটি। আন্দোলনের জেরে পরমাণু শক্তি কমিশনের আধিকারিকদের বছরের পর বছর এলাকায় ঢুকতে বাধা দেওয়া হয়। তৎকালীন প্রধান বিরোধী দল তৃণমূল কংগ্রেস (বিশেষ করে কাঁথির তৎকালীন নেতা শুভেন্দু অধিকারী) এ আন্দোলনের সামনের সারিতে ছিলেন। সে সময় হরিপুরে পরমাণু কেন্দ্র গড়ার তীব্র বিরোধিতা করেছিলেন তিনি। এমনকি বামফ্রন্টের অন্দরেও শরিক দলগুলির একাংশ এ প্রকল্পের নিরাপত্তা ও পুনর্বাসন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল। দীর্ঘ আন্দোলনের পর, ২০১১ সালে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করে যে, ঘনবসতিপূর্ণ এবং মৎস্যজীবীদের জীবন-জীবিকায় আঘাত করে হরিপুরে কোনো পরমাণু বিদ্যুৎ কেন্দ্র করা হবে না। তৎকালীন বিদ্যুৎ মন্ত্রী মণীশ গুপ্ত বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এ প্রকল্প বাতিলের কথা জানান।
পনেরো বছর আগে, হরিপুরে ভেস্তে যাওয়া সেই পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্প কি এ বার ফিরতে চলেছে? মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নেতৃত্বাধীন রাজ্য সরকারের কাছে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের প্রস্তাবে সে সম্ভাবনাই নতুন করে সামনে এসেছে। চলতি সপ্তাহেই নবান্নে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এবং মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়ালের সঙ্গে সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের বৈঠকে বাংলায় একাধিক বড়ো বিনিয়োগের প্রস্তাব উঠে আসে। তার মধ্যে সবচেয়ে বড়ো প্রস্তাবটি পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রের। সরকারের দাবি, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে ছয় থেকে সাত বছরে প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকা বিনিয়োগ হতে পারে। তবে প্রকল্পের জায়গা নিয়েই এখন মূল প্রশ্ন। রিলায়েন্সের পছন্দ সেই হরিপুর। রাজ্যের তরফে অবশ্য বিকল্প হিসাবে হলদিয়ার কাছে নয়াচরের কথাও ভাবা হচ্ছে। কারণ, হরিপুরের নাম উঠতেই ফিরে আসছে প্রায় দুই দশক আগের আন্দোলনের স্মৃতি।
সরকারি সূত্রের দাবি, বাম জমানায় আগে হরিপুরে ‘এনপিসিআইএল’-এর জন্য প্রায় ২,০০০ একর জমি চিহ্নিত হয়েছিল। শুধু জমি চিহ্নিত করাই নয়, পরমাণু প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় একাধিক সমীক্ষাও সেখানে সম্পন্ন হয়েছিল। ভূমিকম্পের সম্ভাবনা, ভূ-প্রযুক্তি, জলবিদ্যা, সমুদ্রবিজ্ঞান, আবহাওয়া, জনসংখ্যা এবং পরিবেশ — বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হয়েছিল সেই সময়। সে কারণেই নতুন করে কোননো পরমাণু প্রকল্প হলে হরিপুরে কাজ শুরু করার ক্ষেত্রে কিছুটা সুবিধা হতে পারে বলে মনে করছে রিল্যায়েন্স গ্রুপ । নতুন কোনো জায়গায় প্রকল্প করলে যে দীর্ঘ সমীক্ষা এবং অনুমোদনের প্রক্রিয়া পেরোতে হয়, হরিপুরে তার একটা বড়ো অংশ আগেই রয়েছে। এক সরকারি আধিকারিকও জানান, ‘আগের প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় বহু সমীক্ষা করা হয়েছিল। ফলে একই জায়গায় নতুন প্রকল্প হলে ছাড়পত্র পাওয়ার ক্ষেত্রে সুবিধা হতে পারে।’ তবে অতীত অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখেই নয়াচরকে বিকল্প হিসাবে রাখা হচ্ছে বলে সূত্রের খবর। কিন্তু রিলায়েন্সের আগ্রহ হরিপুরে। ফলে জায়গা নিয়ে রাজ্য এবং শিল্পগোষ্ঠীর মধ্যে আরও আলোচনা হতে পারে বলে প্রশাসনিক সূত্রের ইঙ্গিত।
রিলায়েন্সের বৈঠকে শুধু পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্র নয়, আরও একাধিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ডেটা সেন্টার এবং এআই ক্লাউড পরিষেবা, আন্তর্জাতিক কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন, কয়লা গ্যাসিফিকেশন, ফুড পার্ক, সড়ক পরিকাঠামো এবং মাল্টি-স্পেশালিটি হাসপাতাল সহ একাধিক ক্ষেত্রগুলির কথাও আলোচনায় এসেছে। রাজ্য সরকারের তরফে জানানো হয়েছে, রাজারহাটের সিলিকন ভ্যালি হাবে রিলায়েন্সের ডেটা সেন্টারের কাজ ইতিমধ্যেই শুরু হয়েছে। সূত্রের দাবি, ৪০ একর জমির মধ্যে ১৫ একর অংশের কাজ আগামী ৩ মাসের মধ্যে এগিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে সংস্থা। পুরো ডেটা সেন্টার প্রকল্পটি আগামী বছরের জুনের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা রাখা হয়েছে। প্রস্তাবিত কেন্দ্রটি এআই-নির্ভর অত্যাধুনিক পরিকাঠামো হবে বলে সংস্থার তরফে জানানো হয়েছে। গুজরাতের জামনগরে রিলায়েন্সের যে ধরনের ডেটা পরিকাঠামো তৈরি হচ্ছে, তার সঙ্গে তুলনীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করার কথা রয়েছে। এ ছাড়াও দিঘায় একটি আন্তর্জাতিক ‘কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন’ তৈরির সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। আন্তর্জাতিক ডেটা যোগাযোগের ক্ষেত্রে এমন পরিকাঠামোর গুরুত্ব রয়েছে। ফলে ডেটা সেন্টার, এআই পরিষেবা এবং কেবল ল্যান্ডিং স্টেশন— তিনটি ক্ষেত্রকে একত্রিতভাবেই তৈরি করতে চাইছে রিলায়েন্স।
রিলায়েন্সের নজর রয়েছে কয়লা গ্যাসিফিকেশনেও। প্রচলিত পদ্ধতিতে যে কয়লা উত্তোলন করা কঠিন বা অর্থনৈতিক ভাবে লাভজনক নয়, ভূগর্ভেই রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সে কয়লাকে গ্যাসে পরিণত করা যায় এই প্রযুক্তিতে। কয়লার স্তরে বাষ্প এবং অক্সিডাইজার প্রবেশ করিয়ে নিয়ন্ত্রিত প্রক্রিয়ায় গ্যাস তৈরি করা হয়। উৎপন্ন গ্যাসের মধ্যে থাকে মিথেন, হাইড্রোজেন, কার্বন মনোক্সাইড এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড। এগুলির ব্যবহার হতে পারে জ্বালানি, সার এবং বিভিন্ন রাসায়নিক শিল্পে। রাজ্য সরকারের এক আমলার বক্তব্য, দেওচা-পাচামি প্রকল্প এলাকায় কয়লা গ্যাসিফিকেশনের সম্ভাবনা আগে থেকেই খতিয়ে দেখা হচ্ছিল। প্রকল্প এলাকার প্রায় ৩০ শতাংশ অংশে এই প্রযুক্তি ব্যবহারের ভাবনা রয়েছে বলে তিনি জানান। শুধু দেওচা-পাচামি নয়, পশ্চিমবঙ্গের পশ্চিমাঞ্চলে ‘ইসিএল’-এর বেশ কিছু পরিত্যক্ত কয়লাক্ষেত্রেও ভবিষ্যতে এ প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি।
পাশপাশি, বাংলার পর্যটন ক্ষেত্রেও বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে রিলায়েন্সের। কলকাতার পাশাপাশি উত্তরবঙ্গের পাহাড় ও সুন্দরবনে উন্নত মানের হোটেল তৈরির প্রস্তাব রয়েছে সংস্থার। প্রশাসনের এক আধিকারিকের বক্তব্য, উত্তরবঙ্গ এবং সুন্দরবনে উচ্চমানের হোটেল হলে নির্দিষ্ট পর্যটনকেন্দ্রিক ভ্রমণের পরিকাঠামো বাড়বে। বিশেষ করে পাহাড় এবং সুন্দরবনের মতো জায়গায় পর্যটনের পরিধি বাড়ানোর ক্ষেত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে বলে মনে করছে রাজ্য। উত্তরবঙ্গে একটি ‘ফুড পার্ক’ করার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পের সঙ্গে কৃষি উৎপাদন এবং সরবরাহ ব্যবস্থাকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের সম্ভাবনা রয়েছে বলে সরকারি সূত্রের দাবি। এসেছে ‘ভান্তাতা’-র শাখা খোলার প্রস্তাবও।
প্রসঙ্গত, রিলায়েন্সের সঙ্গে রাজ্য সরকারের আলোচনার সূত্রপাত অবশ্য বুধবারের বৈঠকে নয়। ২১ সেপ্টেম্বর মুম্বইয়ে রিলায়েন্সের চেয়ারম্যান মুকেশ অম্বানীর সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তার পরেই রাজ্যে সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের সঙ্গে আলোচনার এই পর্ব। বুধবারের বৈঠকে রিলায়েন্সের বিভিন্ন ব্যবসায়িক শাখার সিইও-সহ শীর্ষ আধিকারিকেরা উপস্থিত ছিলেন। রাজ্যের তরফে মুখ্যসচিব মনোজ কুমার আগরওয়ালও অন্য শীর্ষ আধিকারিকেরা ছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর দফতরের তরফেও বৈঠকের কথা জানিয়ে বলা হয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগের সুযোগ, শিল্পের বিকাশ এবং নতুন কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে, সব প্রস্তাবের মধ্যে অবশ্য পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রটিই সবচেয়ে বৃহৎ। প্রায় ২ লক্ষ কোটি টাকার সম্ভাব্য বিনিয়োগের কথা সামনে আসায় প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে তার প্রভাব শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। শিল্প, পরিকাঠামো, কর্মসংস্থান এবং সংশ্লিষ্ট আনুষঙ্গিক ক্ষেত্রেও তার প্রভাব পড়তে পারে।
তবে এখনই প্রকল্পের চূড়ান্ত রূপরেখা তৈরি হয়নি। জায়গা নির্বাচন, প্রকল্পের ক্ষমতা, প্রযুক্তি, কেন্দ্রীয় অনুমোদন, পরিবেশগত ছাড়পত্র এবং স্থানীয় মানুষের সঙ্গে আলোচনা — একাধিক ধাপ পেরোতে হবে। আর সে কারণেই হরিপুরের নাম সামনে আসতেই পুরনো প্রশ্নটিও ফিরছে, দু-দশক বছর আগে যে জমিতে আন্দোলনের চাপে পরমাণু প্রকল্প থমকে গিয়েছিল, সেখানে কি এ বার নতুন শিল্পগোষ্ঠীর হাত ধরে নতুন অধ্যায়ের শুরু হবে? না কি শেষ পর্যন্ত জায়গা বদলে প্রকল্পের ঠিকানা হবে নয়াচর ?
❤ Support Us





