Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • অক্টোবর ১৭, ২০২৫

পেনশন ব্যবস্থার বিশ্ব সূচকে ডি গ্রেড ভারতের, নতুন ইপিএফও নিয়ম ঘিরে দেশজুড়ে ক্ষোভ

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
পেনশন ব্যবস্থার বিশ্ব সূচকে ডি গ্রেড ভারতের, নতুন ইপিএফও নিয়ম ঘিরে দেশজুড়ে ক্ষোভ

বিশ্বের অন্যতম দুর্বল পেনশন কাঠামোর তালিকায় ভারতের নাম। সদ্য প্রকাশিত ‘মার্সার সিএফএ ইনস্টিটিউট গ্লোবাল পেনশন সূচক ২০২৫’-এ ভারতের জায়গা একেবারে নীচের সারিতে। ওই সূচকে ভারতকে দেওয়া হয়েছে ‘ডি গ্রেড’। রিপোর্টে বলা হয়েছে, এই গ্রেডপ্রাপ্ত দেশগুলির পেনশন ব্যবস্থায় কিছু ইতিবাচক দিক থাকলেও মূল কাঠামোয় গুরুতর ত্রুটি রয়েছে, যা অবিলম্বে সংস্কার করা প্রয়োজন। ভারতের সঙ্গে এই পর্যায়ে রয়েছে তুরস্ক, আর্জেন্টিনা এবং ফিলিপাইনস।

সূচক তৈরি হয়েছে ৩টি নির্দিষ্ট মাপকাঠি — পর্যাপ্ততা, স্থিতিশীলতা এবং সততার ভিত্তিতে। এর মধ্যে পর্যাপ্ততার ওজন সবচেয়ে বেশি, ৪০ শতাংশ; এরপর রয়েছে স্থিতিশীলতা ৩৫ শতাংশ এবং সততা ২৫ শতাংশ। ৩ বিভাগে ভারতের প্রাপ্ত গ্রেড যথাক্রমে ‘ই’, ‘ডি’ এবং ‘সি’। অর্থাৎ পর্যাপ্ততার দিক থেকে ভারতের অবস্থা অত্যন্ত দুর্বল। ২০২৪ সালে ভারতের সূচক মান ছিল ৪৪, যা এবার আরো কমে হয়েছে ৪৩.৮। বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের পেনশন ব্যবস্থার সবচেয়ে কঠিন সীমাবদ্ধতা হলো যে, দেশের এক বিশাল অংশের শ্রমজীবী জনগণ এখনো এর আওতাভুক্ত নন। বিশেষ করে অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শ্রমিকদের কোনও স্থায়ী পেনশন নিরাপত্তা নেই। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আর্থিক সম্পদের ঘাটতি। ২০২৪-২৫ সালের কেন্দ্রীয় অর্থনৈতিক সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের মোট পেনশন তহবিল দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) মাত্র ২১ শতাংশ। তুলনায় উন্নত দেশগুলিতে এই অনুপাত অনেক বেশি— উদাহরণস্বরূপ, অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থা (ওইসিডি)-ভুক্ত দেশগুলিতে পেনশন সম্পদের পরিমাণ জিডিপির ৮০ শতাংশেরও বেশি। রিপোর্টে আরো উল্লেখ করা হয়েছে, ভারত যদি পেনশন সূচকে উন্নতি করতে চায়, তবে ৩টি বিষয় অত্যন্ত জরুরি— প্রথমত, দেশের সবচেয়ে দরিদ্র প্রবীণ নাগরিকদের জন্য ন্যূনতম আয়ের নিশ্চয়তা চালু করা। দ্বিতীয়ত, অপ্রাতিষ্ঠানিক ক্ষেত্রের কর্মীদের পেনশনের আওতায় আনা প্রয়োজন। তৃতীয়ত, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পেনশন তহবিল বৃদ্ধি করার দিকে নজর দিতে হবে।

এই পরিস্থিতিতে যখন আন্তর্জাতিক স্তরে ভারতের পেনশন কাঠামো নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে, তখনই দেশজুড়ে নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে ইপিএফও (কর্মচারী ভবিষ্যনিধি সংস্থা)-র নতুন নিয়ম। কেন্দ্রীয় শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য-র নেতৃত্বে ইপিএফও-র কেন্দ্রীয় ট্রাস্টি বোর্ড ১৩ অক্টোবর ঘোষণা করে, ভবিষ্যনিধি তহবিল থেকে আংশিক টাকা তোলার জটিলতা দূর করতে পুরনো ১৩টি বিধি সরল করে ৩টি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়েছে। এই ৩টি শ্রেণী হলো—জরুরি প্রয়োজন (অসুস্থতা, শিক্ষা ও বিবাহ), গৃহনির্মাণ সংক্রান্ত প্রয়োজন, ও বিশেষ পরিস্থিতি। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, শিক্ষা ও বিবাহের খাতে আংশিক টাকা তোলার সুযোগ আগের চেয়ে অনেকটা বাড়ানো হয়েছে। শিক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ১০ বার এবং বিবাহের জন্য সর্বোচ্চ ৫ বার পর্যন্ত টাকা তোলা যাবে। উল্লেখ্য, পূর্বে এই দুই খাতে মিলিয়ে মোট ৩ বারের বেশি টাকা তোলার অনুমতি ছিল না।

বিতর্ক শুরু হয়েছে সম্পূর্ণ টাকা তোলার সময়সীমা ঘিরে। পূর্বে অবসর গ্রহণ বা চাকরি ছাড়ার পরে মাত্র ২ মাসের মধ্যেই কেউ তাঁর ইপিএফ এবং পেনশন তহবিল থেকে পুরো টাকা তুলে নিতে পারতেন। কিন্তু নতুন নিয়মে এই সময়সীমা বাড়িয়ে ইপিএফ তোলার ক্ষেত্রে ১২ মাস, এবং পেনশন তোলার জন্য ৩৬ মাস নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাৎ একজন ব্যক্তি অবসর নেওয়ার পর তাঁর নিজের পেনশনের টাকা তুলতে তিন বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে। এহেন সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনায় প্রতিবাদে নেমেছে বিরোধীরা। তাঁদের মতে, এই নিয়ম কার্যত অবসরের পরপরই অর্থনৈতিক নিরাপত্তার পথ বন্ধ করে দিচ্ছে। একজন সাধারণ চাকরিজীবী মাসিক আয়ের উপর নির্ভরশীল, ফলে অবসরের পর তিন বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করে চলা অনেকের পক্ষেই সম্ভব নয়।

এক্ষেত্রে আরো একটি বিতর্কিত সিদ্ধান্ত অবসরের আগপর্যন্ত ইপিএফ অ্যাকাউন্টে ন্যূনতম ২৫ শতাংশ টাকা ‘বাধ্যতামূলকভাবে’ রাখবার নিয়ম। সরকারের যুক্তি, এতে সে টাকায় উচ্চ হারে সুদ (বর্তমানে ৮.২৫%) জমে ভবিষ্যতে বড়ো সঞ্চয় তৈরি হবে। কিন্তু বাস্তবে এই ২৫ শতাংশ অর্থ তোলা যাবে কেবলমাত্র নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে— যেমন কেউ স্থায়ীভাবে বিদেশে চলে গেলে, ৫৫ বছর বয়সে অবসর নিলে, কেউ স্থায়ীভাবে অক্ষম হয়ে গেলে অথবা কেউ টানা ১২ মাস বেকার থাকলে। অর্থাৎ চাকরি হারালে প্রাথমিকভাবে ৭৫ শতাংশ অর্থ তোলা গেলেও, বাকি ২৫ শতাংশ তুলতে হলে এক বছরের অপেক্ষা অবশ্যম্ভাবী। সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী, এই পদক্ষেপগুলি সঞ্চয় বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে করা হলেও, সমালোচকদের মতে এই সিদ্ধান্ত ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের সামিল। তাঁদের বক্তব্য, ইপিএফে জমা অর্থ ব্যক্তির একান্ত নিজস্ব সঞ্চয়। সে ক্ষেত্রে, কত টাকা ও কখন তোলা হবে, সেই সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারও তাঁর থাকা উচিত।

নয়া নিয়ম ঘিরে যখন দেশজুড়ে ক্ষোভের ঢেউ, তখন সরকারের পক্ষ থেকে প্রেস ইনফরমেশন ব্যুরো একটি বিবৃতিতে জানিয়েছে যে, অনলাইনে ইপিএফও-র নতুন নিয়ম সম্পর্কে ভুল ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। তবে তাদের ব্যাখ্যাও অনেকের মনে সন্দেহ আরও বাড়িয়েছে। পিআইবি বলেছে, ২৫ শতাংশ ‘ন্যূনতম ব্যালান্স’ অংশ সীমিত পরিস্থিতিতে ছাড়া তোলা যাবে না, যা কার্যত সরকারি অবস্থানকেই স্বীকার করে নেয়।এই প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে আশঙ্কাজনক দিক, ইপিএফ-এর ন্যূনতম মাসিক পেনশন নিয়েও এবারও কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বর্তমানে ইপিএফ সদস্যরা মাসে মাত্র ১,০০০ টাকা করে পেনশন পান, যা দীর্ঘদিন ধরেই সমালোচনার বিষয়। সোমবার দিল্লিতে ইপিএফও-র অছি পরিষদের বৈঠকে বিষয়টি আলোচ্যসূচিতে থাকলেও, সাম্প্রতিক বৈঠকে কোনো আলোচনা হয়নি। সরকারের যুক্তি, বিহারে বিধানসভা নির্বাচনের কারণে নির্বাচনী আচরণবিধি চালু হয়ে গিয়েছে এবং এখন এ নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত ঘোষণা করলে তা নির্বাচনী বিধিভঙ্গ হিসেবে বিবেচিত হবে। তাই এই বিষয়ে সিদ্ধান্ত ভোটের পরে নেওয়া হবে।

তবে এদিনের বৈঠকে কেন্দ্রীয় শ্রমমন্ত্রী মনসুখ মাণ্ডব্য বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছেন। কমিটি সিদ্ধান্ত হয়েছে, ইপিএফ কন্ট্রিবিউশন অর্থাৎ কর্মী এবং নিয়োগকর্তা মিলিয়ে জমা পড়া টাকার ২৫ শতাংশ ইপিএফ অ্যাকাউন্টে বাধ্যতামূলকভাবে রাখতে হবে। বাকি টাকা প্রয়োজন অনুযায়ী ৩টি বিভাগের অধীনে তোলা যাবে— ‘জরুরি প্রয়োজন’, ‘গৃহনির্মাণ প্রয়োজন’ এবং ‘বিশেষ পরিস্থিতি’। উল্লেখযোগ্যভাবে, এখন থেকে ‘বিশেষ পরিস্থিতি’র জন্য টাকা তুলতে কোনো কারণ দেখাতে হবে না। আগে এই বিভাগে টাকা তুলতে নির্দিষ্ট কারণ দর্শানো বাধ্যতামূলক ছিল। এছাড়াও, নতুন নিয়মে বলা হয়েছে, চাকরি হারানোর পর ইপিএফ সদস্য এক মাসের মধ্যে ৭৫ শতাংশ অর্থ তুলতে পারবেন, এবং দুই মাসেও কাজ না পেলে বাকি ২৫ শতাংশ তুলতে পারবেন। এ নিয়ম আগে থেকেই ছিল, কিন্তু এবার তা আরো নির্দিষ্টভাবে স্পষ্ট করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয়, এদিনের বৈঠকে ইপিএফ সংযুক্ত এটিএম কার্ড বা ইউপিআই পরিষেবা নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি। বহু দিন ধরেই গ্রাহকরা এমন পরিষেবার দাবি জানিয়ে আসছেন।


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!