Advertisement
  • এই মুহূর্তে বি। দে । শ
  • মে ৯, ২০২৫

ভ্যাটিকানের চিমনিতে সাদা ধোঁয়া ! জনতার উচ্ছ্বসিত স্লোগান আর করতালিতে নির্বাচিত ক্যাথলিক চার্চের নতুন পোপ রবার্ট প্রেভোস্ট

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
ভ্যাটিকানের চিমনিতে সাদা ধোঁয়া ! জনতার উচ্ছ্বসিত স্লোগান আর করতালিতে নির্বাচিত ক্যাথলিক চার্চের নতুন পোপ রবার্ট প্রেভোস্ট

‘লিওন! লিওন!’— জনতার উচ্ছ্বসিত স্লোগান আর করতালিতে মুখরিত ভ্যাটিকান। ঐতিহ্যের ইতিহাসে প্রথম মার্কিন পোপ চতুর্দশ লিও স্বাগত জানাল রোম-সহ দুনিয়ার ধর্মপ্রাণ মানুষেরা। ভ্যাটিকানের প্রথা অনুযায়ী ‘চিমিনি’-তে সাদা ধোঁয়া ছড়িয়ে ঘোষিত হল– নতুন পোপ নির্বাচিত হয়েছেন। পোপ ফ্রান্সিসের উত্তরসূরী কে হবেন, বেছে নিতে ভ্যাটিকানে শুরু হয়েছিল বিশেষ সভা। পরবর্তী পোপ হিসাবে ফিলিপিনোর ‘এশিয়ান ফ্রান্সিস’ খ্যাত কার্ডিনাল লুইস ট্যাগল আর ইতালির কার্ডিনাল পিয়েত্রো প্যারোলিনের নাম উঠেছিল। কনক্লেভে ১৩৩ জন কার্ডিনাল অংশ নেন। দীর্ঘ আলোচনার পর, শেষ পর্যন্ত ক্যাথলিক গির্জার সর্বোচ্চ পদে বসলেন রবার্ট ফ্রান্সিস প্রেভোস্ট।

বৃহস্পতিবার স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৭ মিনিটে সিস্টিন চ্যাপেলের চিমনি থেকে উঠল সেই বহু প্রতীক্ষিত সাদা ধোঁয়া, সঙ্গে সঙ্গেই উত্তাল হয়ে উঠল সেন্ট পিটার্স স্কোয়ার। ‘হাবেমুস পাপাম!’— অর্থাৎ আমরা পেলাম আমাদের নতুন পোপ। তুমুল উল্লাসে ফেটে পড়ল হাজার হাজার মানুষের কণ্ঠ, স্লোগান উঠল ‘লিওন! লিওন! লিওন!’ দীর্ঘ ইতিহাসে এই প্রথমবার, আমেরিকান কোনো ধর্মগুরু নির্বাচিত হলেন পোপ হিসেবে। ৬৯ বছর বয়সি যুক্তরাষ্ট্রের কার্ডিনাল রবার্ট ফ্রান্সিস প্রেভোস্ট নির্বাচিত হলেন ক্যাথলিক চার্চের ২৬৭ তম প্রধান হিসেবে। নতুন নাম গ্রহণ করলেন ‘পোপ চতুর্দশ লিও’। দ্বিতীয় দিনের কনক্লেভ-এর ভোটের তৃতীয় রাউন্ডে নির্বাচিত হলেন লাতিন আমেরিকায় দীর্ঘদিন কাজ করা এই মার্কিন পাদ্রী। নতুন পোপের দেখা পেতে সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে জমায়েত হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ, কেউ প্রার্থনায়, কেউ বা ইতিহাসের সাক্ষী হতে।

নতুন ঐতিহ্যের সূচনা, নতুন দায়িত্ব, নতুন ভাবনা। সেন্ট পিটার্স ব্যাসিলিকার ব্যালকনি থেকে ভক্তদের উদ্দেশে নতুন পোপের পোপের প্রথম বার্তা– ‘সবার উপর শান্তি বর্ষিত হোক।’ প্রাক্তন পোপ ফ্রান্সিসের কথারই যেন পুনরাবৃত্তি; ‘ঈশ্বর আমাদের ভালবাসেন। দুষ্টশক্তি জয়ী হবে না। ঈশ্বরের হাত আমাদের মাথআর উপরে রয়েছে।’ ভ্যাটিকান মুখপাত্র মাত্তেও ব্রুনি জানিয়েছেন, পোপ লিও তাঁর বক্তৃতায় ‘শান্তি’ শব্দটি যেমনভাবে ব্যবহার করেছেন, তা যেন ইস্টার পরবর্তী যীশুর বানীরই প্রতিধ্বনি। নতুন পোপের কণ্ঠে উঠে এল এক আশাবাদী ভবিষ্যতের রূপরেখা। ‘মিশনারি চার্চ’-এর কাজ হবে মানুষের সেতুবন্ধন তৈরি করা, সবার জন্য দরজা খোলা রাখা। তিনি আহ্বান জানালেন, হিংসা আর হানাহানির বিরুদ্ধে শান্তির কথা, ঐক্যের কথা।

পোপ লিও চতুর্দশের শিকড় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে, কিন্তু তার বিস্তার লাতিন আমেরিকার বৈচিত্র্যে। শিকাগোতে জন্ম, দু-দশকের বেশি সময় কাটিয়েছেন পেরুর দরিদ্রতম উত্তরাঞ্চলে। ছিলেন চিকলায়োর বিশপ। ২০২৩ সালে পোপ ফ্রান্সিস তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ ‘ডিকাস্টারি ফর বিশপস’ দফতরের প্রধান হিসেবে ভ্যাটিকানে নিয়ে আসেন। চিলির সাংবাদিক লুসিয়া নিউম্যানের কথায়, ‘তিনি আমেরিকার চেয়েও লাতিন আমেরিকায় জীবনের বেশিরভাগ সময় অতিবাহিত করেছেন। লাতিন বিশ্বের দারিদ্র্য, অ-ব্যবস্থা, বঞ্চনার মুখোমুখি হয়েছেন। যা তাঁর চরিত্র নির্মাণে অবশ্যম্ভাবী, প্রয়োজনীয়।’

‘লিও চতুর্দশ’ এ নাম বেছে নেওয়াটা মোটেই কাকতালীয় নয়। ১৯ শতকের পোপ লিও ত্রয়োদশ ক্যাথলিক সমাজতত্ত্বের জনক হিসেবে পরিচিত। তাঁর সময়েয় শ্রমিকের অধিকার এবং সমাজে অর্থনৈতিক সুবিচারের প্রয়োজনীয়তার কথা, গির্জার তরফ থেকে প্রথম উঠে আসে। ধর্মতত্ত্ববিদ জেমস ব্রেটজকে বলছেন, ‘লিও ত্রয়োদশ, ক্যাথলিক চার্চকে উচ্চবিত্ত থেকে জনমানুষের দিকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন। লিও চতুর্দশ সে ঐতিহ্যকেই আধুনিক বিশ্বে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে চাইছেন।’ এছাড়াও অনেকে মনে করছেন, লিও চতুর্দশ ‘আমেরিকানিজম’— অর্থাৎ জাতীয়তাবাদী ক্যাথলিক ধারণার বিরোধিতারও প্রতীক হতে পারেন। যদিও, তিনি প্রথম সম্ভাষণে তাঁর জন্মভূমির নাম না নিয়েই, ইংরেজির বদলে রোমান ভাষায় ভাষণ দিলেন চতুর্দশ লিও। ভ্যাটিকান পর্যবেক্ষক ফিল পুলেলা মনে করেন, নয়া পোপের বার্তা স্পষ্ট, তিনি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধি নন, বরং ক্যাথলিকের মুখ।

সদ্যপ্রয়াত পোপ ফ্রান্সিস, চার্চে সংস্কার, বৈচিত্র্য ও সমানাধিকারের জন্য বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর ছিলেন। লিও সম্ভবত মধ্যপন্থী আদর্শে ভ্যাটিকান পরিচালনা করবেন। রক্ষণশীলতা ও উদারতা— দুই ভাবনার সমান গ্রহণযোগ্যতার পরিসর তৈরি করতে চাইবেন তিনি। নির্বাচনের পর, প্রথম দর্শনে, একদিকে রক্ষণশীলতার সূক্ষ্ম প্রতীক লাল ক্লোক, অন্যদিকে দরিদ্রের পাশে দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি – দুই বিপরীতমুখী চিহ্নের সংমিশ্রণে পোপ লিও চতুর্দশের যাত্রা শুরু। তাঁর পোপত্ব ইতিহাস কেমনভাবে মনে রাখবে তা সময় বলবে। তবে সেন্ট পিটার্স স্কোয়ারে দাঁড়িয়ে শত সহস্র মানুষের গলা একসঙ্গে বলেছে, নতুন আলোয় ভাসবে দুনিয়া, পোপ দীর্ঘজীবী হোন !


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!