- এই মুহূর্তে বৈষয়িক
- ডিসেম্বর ১৭, ২০২৫
ডলারের তুলনায় টালমাটাল টাকা, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হস্তক্ষেপে সাময়িক স্বস্তি
মার্কিন ডলারের নিরিখে ভারতীয় মুদ্রা টাকার দর ৯১ ছুঁয়ে সর্বকালীন তলানিতে নেমে যাওয়ায় বিষয়টি আর কেবল একটি মুদ্রাবাজারের ওঠানামা নয়, বরং দেশের সামগ্রিক আর্থিক ব্যবস্থার জন্য গভীর উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। টাকার উপর ক্রমাগত চাপ, ঘরোয়া বাজারে নগদের টান এবং বিদেশি পুঁজির বহিঃপ্রবাহ, সব মিলিয়ে বিনিয়োগকারীদের আস্থায় স্পষ্ট ভাঙন ধরেছে।
তবে এই উদ্বেগের মধ্যেই সাম্প্রতিক ট্রেডিং সেশনে টাকা হঠাৎ শক্তিশালী হয়ে ওঠে। একদিনের মধ্যেই প্রায় ১ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে টাকা প্রতি ডলারে ৯০.০৪ টাকায় পৌঁছায়, যা গত সাত মাসের মধ্যে সবচেয়ে বড়ো একদিনের উত্থান।
কেন এতটা দুর্বল হয়েছিল টাকা ?
বাজার বিশেষজ্ঞদের মতে, টাকার অবমূল্যায়নের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে —
- বিদেশি বিনিয়োগকারীদের ধারাবাহিকভাবে ভারত থেকে পুঁজি প্রত্যাহার
- ভারত-মার্কিন বাণিজ্য আলোচনা নিয়ে দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা
- রপ্তানি দুর্বল হওয়া এবং উৎসবের মরশুমে আমদানি বেড়ে যাওয়া
- সোনা ও অপরিশোধিত তেলের আমদানি বৃদ্ধি
- এই সব কারণে ডলারের চাহিদা বেড়েছে এবং টাকার উপর চাপ ক্রমশ তীব্র হয়েছে।
শেয়ারবাজারে উদ্বেগ
প্রথমে মুদ্রা ও বন্ড বাজারে যে চাপ দেখা দিয়েছিল, তা ধীরে ধীরে শেয়ারবাজারেও ছড়িয়ে পড়েছে। বিনিয়োগকারীরা আরও সতর্ক হয়ে পড়ছেন। ব্রোকারেজ সংস্থা Systematix Institutional Equities জানাচ্ছে, চলতি বছরে ডলারের তুলনায় রুপির প্রায় ৬.৬ শতাংশ অবমূল্যায়ন কোনও সাময়িক ঘটনা নয়। বরং ২০১২ সাল থেকে দীর্ঘদিন ধরে চলা ‘ম্যানেজড ডেপ্রিসিয়েশন’-এর ফলেই রুপির প্রকৃত মূল্য বহুটা ক্ষয় হয়েছে।
সংস্থাটির মতে, কাঠামোগত দুর্বলতা এবং সময়মতো RBI-এর সক্রিয় হস্তক্ষেপ কমে যাওয়ার ফলে আগামী দিনে ডলারের তুলনায় রুপির দর আরও ৬-৭ শতাংশ পর্যন্ত দুর্বল হতে পারে। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ১২-২৪ মাসে এক ডলারের দাম ১০০ টাকা অতিক্রমের আশঙ্কা রয়েছে।
রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হস্তক্ষেপ
এই টানাপোড়েনের মধ্যেই সাম্প্রতিক ট্রেডিং সেশনে টাকা আচমকাই শক্তিশালী হয়। বাজার সূত্রে জানা গেছে —
সরকারি মালিকানাধীন ব্যাঙ্কগুলো বাজারে বড়ো অঙ্কে ডলার বিক্রি করেছে
এই ডলার বিক্রির পেছনে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া (RBI)-এর নির্দেশ :
ডলারের জোগান বাড়ায় তার দাম কমে এবং টাকা শক্তিশালী হয় , এর ফলেই দিনের মধ্যেই টাকা ৯১-এর কাছাকাছি স্তর থেকে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায় । পরিস্থিতি সামাল দিতে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং কেন্দ্র সরকার একাধিক পদক্ষেপ নিচ্ছে।
- বাজারে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে ডলার বিক্রি
- অতিরিক্ত অস্থিরতা ঠেকাতে তারল্য ব্যবস্থাপনা
- সুদের হার ও নীতিগত অবস্থান দিয়ে বাজারে আস্থা বজায় রাখার চেষ্টা
- বাণিজ্য ঘাটতি নিয়ন্ত্রণে আমদানি নজরদারি
- রফতানি বাড়াতে প্রণোদনা ও নীতি সহায়তা
- পরিকাঠামো ও উৎপাদন খাতে সরকারি ব্যয় জোরদার করে অর্থনীতিতে গতি আনার চেষ্টা
বিশেষজ্ঞদের মতে, আপাতত সাধারণ মানুষের জন্য বড় কোনও তাৎক্ষণিক সংকট নেই। নভেম্বর মাসে CPI মুদ্রাস্ফীতি ছিল মাত্র ০.৭১ শতাংশ, তাই টাকার দুর্বলতার প্রভাব এখনই নিত্যপণ্যের দামে বড় আকারে পড়ছে না ।
তবে দীর্ঘমেয়াদে টাকা খুব বেশি দুর্বল হলে, আমদানিনির্ভর পণ্য (তেল, গ্যাস, ইলেকট্রনিক্স) দামি হতে পারে, মুদ্রাস্ফীতির চাপ বাড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, তথ্যপ্রযুক্তি, ওষুধ, অটোমোবাইল ও ধাতু শিল্পের লভ্যাংশ বাড়তে পারে, কারণ এদের আয় বড়ো অংশে ডলারনির্ভর।
চাপে পড়তে পারে, ব্যাংক, রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা, তেল ও গ্যাস, শক্তি এবং পরিকাঠামো খাত।
সব মিলিয়ে, ডলারের তুলনায় টাকার দর ৯১ ছুঁয়ে নামা ভারতের আর্থিক বাজারে গভীর উদ্বেগ তৈরি করলেও, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের হস্তক্ষেপে সাময়িক স্বস্তি মিলেছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি কোনও স্থায়ী সমাধান নয়। কাঠামোগত সংস্কার, রফতানি বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিনিয়োগ ফেরানো না গেলে ভবিষ্যতে রুপির উপর চাপ আবারও বাড়তে পারে।
বস্তুত টাকা আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, ডলারের তুলনায় এর ভবিষ্যৎ গতিপথ অনেকটাই নির্ভর করবে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ও কেন্দ্র সরকারের ধারাবাহিক নীতিগত পদক্ষেপের উপর।
❤ Support Us





