- এই মুহূর্তে দে । শ
- মার্চ ১৮, ২০২৬
দত্তক মাতৃত্বেও সমান অধিকার, ৩ মাসের শর্তে ‘না’ শীর্ষ আদালতের। সব ক্ষেত্রেই মিলবে ১২ সপ্তাহ ছুটি
মাতৃত্ব কি কেবল জন্মদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ? না কি একটি শিশুকে নিজের জীবনে গ্রহণ করার মধ্যেও তার সমান তাৎপর্য লুকিয়ে রয়েছে? এমন সংবেদনশীল প্রশ্নেরই উত্তর দিল সুপ্রিম কোর্ট। দত্তক নেওয়া সন্তানের ক্ষেত্রে মাতৃত্বকালীন ছুটি পেতে ৩ মাসের বয়সসীমা বেঁধে দেওয়ার যে বিধান এতদিন ছিল, তা খারিজ করে দিয়ে শীর্ষ আদালত জানিয়ে দিল—সন্তানের বয়স নয়, মাতৃত্বের দায়বদ্ধতাই আসল। ফলে, সন্তানের বয়স যাই হোক না কেন, দত্তক নেওয়ার পর সব ক্ষেত্রেই ১২ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি পাবেন মায়েরা।
মঙ্গলবার বিচারপতি জে.বি পার্দিওয়ালা ও আর. মহাদেবনের ডিভিশন বেঞ্চ এই গুরুত্বপূর্ণ রায় ঘোষণা করে। আদালত জানায়, ‘সামাজিক সুরক্ষা বিধি, ২০২০ –এর ৬০(৪) ধারা সংবিধানের ১৪ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের পরিপন্থী। আদালতের রায়ে বলা হয়েছে, ‘মাতৃত্বকালীন সুবিধা পাওয়ার উদ্দেশ্য তো সন্তানের জন্ম হয় না, বরং মাতৃত্ব ও শিশুর পরিচর্যার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তার অধিকার পেতেই এ নিয়ম।’ আদালতের মতে, ৩ মাসের বয়সসীমা সম্পূর্ণরূপে ‘ইচ্ছামতো’ নির্ধারিত এবং এর সঙ্গে মাতৃত্বকালীন ছুটির মূল লক্ষ্য, শিশুর যত্ন ও মায়ের মানসিক-শারীরিক অভিযোজন–এর কোনো যুক্তিসঙ্গত সম্পর্ক নেই।
বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, দত্তক নেওয়ার আইনি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হতে অনেক সময় লেগে যায়। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই শিশুর বয়স ৩ মাস পেরিয়ে যায়। ফলে, বহু দত্তক মা এতদিন মাতৃত্বকালীন ছুটির সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। আদালতের পর্যবেক্ষণ, এ ধরনের বিভাজন একদিকে যেমন কৃত্রিম, তেমনই তা স্পষ্টত বৈষম্যমূলক। রায়ে আরও এক ধাপ এগিয়ে শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, দত্তক গ্রহণ ‘প্রজনন স্বাধীনতা’রই অংশ, যা সংবিধানের ২১ নম্বর অনুচ্ছেদের আওতায় সুরক্ষিত। পরিবার গঠনের অধিকার কেবল জৈবিক সন্তান জন্মদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, দত্তক গ্রহণও তার সমান গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। সে অর্থে দত্তক মাতৃত্বকে জৈবিক মাতৃত্বের সমান মর্যাদা দিয়েছে আদালত।
শিশুর কল্যাণের প্রশ্নেও বিশেষ জোর দিয়েছে বেঞ্চ। দত্তক নেওয়ার পর প্রথম কয়েকটি সপ্তাহ শিশুর জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ— নতুন পরিবেশে মানিয়ে নেওয়া, মানসিক নিরাপত্তা পাওয়া, এবং পরিচর্যার ধারাবাহিকতা বজায় রাখা; সব ক্ষেত্রেই মায়ের উপস্থিতি অপরিহার্য। সে কারণেই পর্যাপ্ত মাতৃত্বকালীন ছুটিকে ‘অত্যাবশ্যক’ বলে উল্লেখ করেছে আদালত। উল্লেখযোগ্য ভাবে, পুরো ধারা বাতিল না করে আদালত সেটিকে ‘রিড ডাউন’ করেছে। অর্থাৎ, আইনটিকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যাতে তা সংবিধানের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। এর ফলে এখন থেকে দত্তক নেওয়ার দিন থেকেই ১২ সপ্তাহের মাতৃত্বকালীন ছুটি প্রযোজ্য হবে, সন্তানের বয়স যাই হোক না কেন।
মূল রায়ের পাশাপাশি একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণও উঠে এসেছে বিচারকদের কাছে। সন্তানের লালন-পালন যে কেবল মায়ের দায়িত্ব নয়, বরং একটি যৌথ প্রক্রিয়া, সে বার্তা দিয়ে কেন্দ্রকে পিতৃত্বকালীন ছুটি চালুর বিষয়টি বিবেচনা করার পরামর্শ দিয়েছে আদালত। বিচারপতিদের মতে, এতে একদিকে যেমন লিঙ্গসমতা বাড়বে, তেমনই পরিবারের উপর চাপও কিছুটা কমবে। আইন বিশেষজ্ঞদের একাংশের মতে, এই রায় দত্তক অভিভাবকদের দীর্ঘদিনের একটি বাস্তব সমস্যার সমাধান করল। একই সঙ্গে, মাতৃত্বের ধারণাকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক করে তোলার পথে এক বড়ো পদক্ষেপ। শীর্ষ আদালতের বার্তা তাই স্পষ্ট, মাতৃত্বের সূচনা জন্মদানে নয়, বরং একটি শিশুকে নিজের জীবনের অংশ করে নেওয়ার মধ্যেই।
❤ Support Us






