Advertisement
  • এই মুহূর্তে দে । শ
  • মে ১২, ২০২৫

অযোধ্যা পাহাড়ে আজ সেঁন্দ্রা পরব। প্রাচীন শিকার উৎসবের ছায়ায় বন সংরক্ষণের নতুন অধ্যায়

আরম্ভ ওয়েব ডেস্ক
অযোধ্যা পাহাড়ে আজ সেঁন্দ্রা পরব। প্রাচীন শিকার উৎসবের ছায়ায় বন সংরক্ষণের নতুন অধ্যায়

আজ বুদ্ধ পূর্ণিমা। পুরুলিয়ার অযোধ্যা পাহাড়ে আদিবাসীদের শতাব্দীপ্রাচীন শিকার উৎসব–সেন্দ্রা পরব। সেঁদ্রা’ শব্দের অর্থ শিকার নয়, সান্তালি ভাষায় এই শব্দের অর্থ অনুসন্ধান। যে উৎসবের এক সময় পর্যন্ত অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল তীর-ধনুক, বল্লম আর রক্তপাত, সেই শিকার উৎসব এখন যেন দাঁড়িয়ে নতুন এক সন্ধিক্ষণে। বনদপ্তরের উদ্যোগ, প্রশাসনের সক্রিয়তা আর জনজাতির ক্রমবর্ধমান সচেতনতায়, ঐতিহ্য আর পরিবেশবোধের এক মেলবন্ধনের সাক্ষী থাকছে জঙ্গলমহল। তবে শুধু মূলনিবাসীদের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সমাজ রেহাই পায় না। বহু বছর ধরেই শহর থেকে আসা ‘দিকু’ তথা অ-মূলনিবাসী শিকারিদের দাপটেই উৎসবের রূপ আরো হিংসাত্মক হয়ে উঠেছিল। রাজ্যের বাইরে থেকেও বহু শিকারি এসে জঙ্গলের প্রাণ লুঠ করেছে। কিছু বছর আগে ঝাড়খণ্ড থেকে ঢুকে পড়া একটি রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারও প্রাণ হারিয়েছিল শিকারীদের হাতে।

প্রাচীনকাল থেকেই বৈশাখী পূর্ণিমার দিন আদিবাসীরা অযোধ্যা পাহাড়ের গহীন অরণ্যে মিলিত হন শিকারের উদ্দেশ্যে। এই শিকার শুধু এক উৎসব নয়, পূর্বপুরুষদের স্মরণে এক রীতিগত অভ্যাস, যেখানে শিকার না করলে অমঙ্গল নেমে আসবে, এমন বিশ্বাস এখনও বেঁচে আছে অনেকের মনে। বুনো শুয়োর, সজারু, বনমোরগ, খরগোশ থেকে শুরু করে চিতল হরিণ; উৎসবে বলি হত বহু বন্যপ্রাণীর। তীর বা বল্লমের আঘাতে রক্তাক্ত হত জঙ্গল। অথচ ১৯৭২ সালের বন্যপ্রাণী সংরক্ষণ আইনে এমন শিকার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবু বাস্তব ছিল অন্য কথা। প্রশাসনও চোখ বন্ধ করেই থাকত বহু বছর। হাইকোর্ট পর্যন্ত গড়িয়েছিল এই বিতর্ক। ২০১৯ সাল থেকে শুরু হয় বনদপ্তরের জোরালো পদক্ষেপ। শিকারে লাগাম টানতে, প্রতি বছর সেন্দ্রা পরবের আগে থেকেই শুরু হয় সচেতনতামূলক প্রচার। এবছরও মার্চ-এপ্রিল জুড়ে দেড়শোরও বেশি সচেতনতা শিবির হয়েছে পুরুলিয়া ও আশপাশের জঙ্গল অধ্যুষিত গ্রামগুলিতে।

পুরুলিয়ার ডিএফও অঞ্জন গুহ জানিয়েছেন, ‘উৎসব হোক আনন্দের, রক্তপাতহীন। আমরা চেষ্টা করছি যাতে বন্যপ্রাণের কোনো ক্ষতি না হয়। গ্রামবাসীরাও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন শিকার থেকে বিরত থাকার।’ ঝালদা রেঞ্জের পক্ষ থেকে এবছর অভিনব প্রচার দেখা গেল। মসিনা গ্রামে আয়োজিত হল ছৌ-নৃত্য সহযোগে পদযাত্রা। শিশুদের হাতে ছিল রঙিন প্ল্যাকার্ড। বার্তা একটাই, ‘বন ও বন্যপ্রাণ রক্ষা করুন, উৎসবে প্রাণ নেবেন না।’ তবে শুধু বন্যপ্রাণ রক্ষা নয়, জঙ্গল যাতে অগ্নিকাণ্ডের কবলে না পড়ে, সেজন্যেও দেওয়া হয়েছে সতর্কতা। রেঞ্জার অপূর্ব মহান্তি বলেন, ‘গ্রীষ্মে জঙ্গলে আগুন লাগার আশঙ্কা থাকে। এই সময় মানুষকে বাড়তি সতর্ক হতে বলছি।’

উৎসব উপলক্ষে অযোধ্যা পাহাড়ে ইতিমধ্যেই পৌঁছেছেন হাজার হাজার অরণ্যসন্তান। রবিবার রাত থেকেই শুরু হয়েছে ধামসা-মাদলের বাদ্যি, নাচ, গান। এদিকে, আইনশৃঙ্খলা ও বন সুরক্ষায় জেলাজুড়ে গড়ে তোলা হয়েছে ৪০টিরও বেশি নাকা পয়েন্ট। পাহাড়ে মোতায়েন থাকছে প্রায় ৩০০ পুলিশ ও সাড়ে তিনশো বনকর্মী। তীব্র গরমে আগতদের সমস্যা এড়াতে তৈরি হয়েছে প্রায় ২০টি ‘ওয়াটার পয়েন্ট’। থাকছে ঠান্ডা জল, ওআরএস ও মেডিক্যাল ক্যাম্প। প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত করা হয়েছে, উৎসব আনন্দময় হোক, কিন্তু তা যেন রক্তহীন হয়। শিকার উৎসব সাঁওতাল জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে বর্তমান প্রজন্মের চোখে উৎসবের অর্থ বদলাচ্ছে। ধীরে ধীরে শিকারের বদলে যেন উঠে আসছে বন এবং বন্যপ্রাণীর সঙ্গে সহাবস্থানের বার্তা। জঙ্গলমহলের মানুষ বুঝতে শিখছেন, অস্ত্র শুধু শিকারের নয়, রক্ষারও। বনদপ্তরও এবার আর শুধু নিয়মের প্রয়োগ নয়, বরং সম্মিলিত চেতনার জোরেই বাঁচাতে চাইছে জঙ্গল ও তার বাসিন্দাদের


  • Tags:
❤ Support Us
error: Content is protected !!